default-image

চার বছর আগে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় শিরোনাম হয়েছিল, ‘অবিশ্বাস্য, কিন্তু সত্যি’। চার বছর পর আমেরিকার ৪৬তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন জো বাইডেন। এতে অবিশ্বাসের কিছু নেই, বিস্ময়েরও কিছু নেই। শুধু আছে গভীর প্রশান্তি। মনে হচ্ছে বুকের ওপর থেকে বড় একটি বোঝা নেমে গেল।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছর শুধু আমেরিকা নয়, বিশ্বের অনেকের কাছে একটি দুঃস্বপ্ন। যে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির তিনি মুখপাত্র হয়ে ওঠেন, তার প্রভাবে বিশ্বের অনেক দেশে একই ধাঁচের অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক নেতা গজিয়ে ওঠে। দেশের ভেতরে ও বাইরে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার মূল অস্ত্র ছিল বহিরাগত ও অশ্বেতকায়দের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ। কখনো বর্ণ, কখনো ধর্মকে ব্যবহার করে একই রকম বিভেদাত্মক রাজনীতির প্রকাশ দেখা গেছে ভারত থেকে হাঙ্গেরিতে, ফিলিপাইন থেকে ব্রাজিলে। ট্রাম্পের প্রস্থানের পর সে রাজনীতিরও অবসান হলো এ কথা বলা অত্যুক্তি, কিন্তু এই নব্য জাতীয়তাবাদীরা তাদের সবচেয়ে সরব কণ্ঠস্বরটি হারাল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প এখনো তাঁর পরাজয় মেনে নেননি। নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে, এই অভিযোগে তিনি সম্ভাব্য সব আইনি পথ অনুসরণ করবেন বলে জানিয়েছেন। শনিবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প জানিয়েছেন, সোমবার থেকেই তাঁর আইনজীবীরা নির্বাচনে সঠিক বিজয়ী কে তা নির্ধারণে আদালতে শরণাপন্ন হবেন। তিনি চান শুধু বৈধ ব্যালট গণনা করা হোক, কোনো অবৈধ ব্যালটের সাহায্যে যেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হয়, তিনি তা নিশ্চিত করার পক্ষে।

উল্লেখযোগ্য, ভোট কারচুপির যে অভিযোগ ট্রাম্প তুলেছেন তার পক্ষে কোনো অর্থপূর্ণ প্রমাণ তাঁর আইনজীবীরা উপস্থিত করতে পারেননি। রাজ্যপর্যায়ের আদালত ইতিমধ্যেই তাদের দায়ের করা একাধিক মামলা বাতিল করে দিয়েছে। ভোটের হিসাবে পরাস্ত হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট তাঁর পক্ষে হস্তক্ষেপ করবে, এ কথা ভাবারও কোনো কারণ নেই।

সম্মানজনক প্রস্থান

ট্রাম্পের পরিবার ও অতি অনুগত মিত্র ছাড়া রিপাবলিকান দলের ভেতরে অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা প্রকাশ্যে বলে আসছিলেন, বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সামনে এগোনো ট্রাম্পের জন্য অধিক সম্মানের হবে। পলিটিকো ট্রাম্পের প্রচারশিবিরের এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, ‘আমরা হেরে গেছি, সামনে যে বিপুল বাধা তা অতিক্রমের কোনো পথ অবশিষ্ট নেই।’ বাইডেনের জয় ঘোষণার আগে অবশ্য সিএনএন জানিয়েছে, হোয়াইট হাউসের অনেক কর্মকর্তা নতুন চাকরি খোঁজা শুরু করেছেন।

ট্রাম্পের একসময়ের নিকট মিত্র নিউ জার্সির সাবেক গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া সবচেয়ে সম্মানজনক পথ। কোনো প্রমাণ ছাড়া ট্রাম্প যে ভোট কারচুপির অভিযোগ করে যাচ্ছেন, তাতে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি বলেন, অভিযোগ তিনি করতেই পারেন, কিন্তু সে কথায় বিশ্বাস অর্জন করতে হলে তো তাঁকে প্রমাণ দাখিল করতে হবে। এসব ভিত্তিহীন অভিযোগের ফলে উত্তেজনা বাড়ে মাত্র।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিবৃতিটি এসেছে সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের কাছ থেকে। সাউথ ক্যারোলাইনার পুনর্নির্বাচিত এই সিনেটর মাত্র এক দিন আগে আইনি লড়াইয়ে সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রচার শিবিরকে পাঁচ লাখ ডলার চাঁদা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। গত শুক্রবার সুর পরিবর্তন করে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাইডেনের সঙ্গে একযোগে কাজ করতে তিনি প্রস্তুত। ভবিষ্যৎ বাইডেন মন্ত্রিপরিষদে কাদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, কাকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়, এ বিষয়ে পরামর্শ দিতেও তিনি প্রস্তুত। গ্রাহাম বলেন, ‘সাধারণ ঐকমত্য অর্জনে আমি কাজ করে যাব।’ উল্লেখ্য, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়োগ নিশ্চিত করতে মার্কিন সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপন

বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ

কে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট, নির্বাচনের চার দিন পরও পরিষ্কার না হওয়ায় বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ ও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এ বিলম্ব আমেরিকার গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মাত্র। টিভির পর্দায় প্রতিটি ভোট গণনার হিসাব দেওয়া হচ্ছে, এমনকি যে কক্ষে ভোট গণনা হচ্ছে, ওয়েবসাইটে তার সরাসরি সার্বক্ষণিক সম্প্রচার হচ্ছে। ট্রাম্পের আইনজীবীরা যখনই কোনো অভিযোগ নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হচ্ছেন, প্রায় তাৎক্ষণিক তার রায় পেয়ে যাচ্ছেন। ধীরগতির চলচ্চিত্রের মতো এ দেশের মানুষ হাতে-কলমে গণতন্ত্রের পাঠ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে। ট্রাম্প যতই কারচুপির অভিযোগ তুলুন না কেন, চোখের সামনে ভোট গণনার চিত্র দেখার ফলে এ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে সন্দেহ কমবে।

জনপ্রিয় ভাষ্যকার ক্রিস সিলিজার মতে, এতে প্রমাণিত হয় আমেরিকার গণতন্ত্র সঠিক পথেই এগোচ্ছে। ভোট গণনা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সব অধিকার ট্রাম্পের আছে। বাইডেনের সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান অতি সামান্য হলে ভোট পুনর্গণনার দাবিও সম্পূর্ণ আইনসম্মত। সিলিজা লিখেছেন, ‘এ বিলম্ব তাই শুধু প্রত্যাশিত নয়, এটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক।’

মন্তব্য পড়ুন 0