default-image

ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অভিবাসন নিয়ে কাজ শুরু করেছেন নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। প্রথম দিনেই অভিবাসন সম্পর্কিত কয়েকটি নির্বাহী আদেশে সই করেন বাইডেন। সদ্য সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গৃহীত অভিবাসনবিরোধী পদক্ষেপগুলোকে উল্টে দিতে এবং মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তৈরির জন্য আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিতের জন্য আরোপ করা জাতীয় জরুরি অবস্থার সমাপ্তি টানতে এসব নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া অভিবাসনবিরোধী অবস্থানের বিপরীতে বাইডেন এক নতুন অভিবাসীবান্ধব নীতি গ্রহণের পথে হাঁটছেন। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে নতুন অভিবাসন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি, যেখানে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা অনিবন্ধিত অভিবাসীদের কয়েকটি ধাপের মধ্য দিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের জন্য নতুন আইন ও ত্রাণ তৎপরতা চালাতে নতুন প্রকল্প গ্রহণের কথাও বলেছেন তিনি।

ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম সপ্তাহে কয়েকটি নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে অভিবাসন নীতি সংস্কারের কাজ শুরু করলেও এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আনতে সময় লাগবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওভাল অফিস থেকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ২০ জানুয়ারি বাইডেন বলেন, ‘অনেক পথ যেতে হবে। এগুলো শুধু নির্বাহী পদক্ষেপ। কিন্তু এগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে আমাদের আইন প্রণয়নের পথে হাঁটতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন জানায়, এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিধান রেখে অভিবাসন আইন প্রণয়ন, অভিবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সীমান্ত সুরক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহারে বিনিয়োগ, অভিবাসী স্রোত কমাতে মধ্য আমেরিকার দেশগুলোতে সহায়তা বৃদ্ধির মতো বিষয়।

একই সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে তরুণ অভিবাসীদের জন্য নেওয়া এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় স্থবির হয়ে পড়া ডিফারড অ্যাকশন ফর চাইল্ডহুড অ্যারাইভালস (ডাকা) প্রকল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং এর পরিসর বাড়ানো। এরই মধ্য কর্মসূচিটি চালুর জন্য প্রথম দিনই হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সেক্রেটারিকে অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে একটি স্মারকে সই করেছেন বাইডেন।

বাইডেনের অভিবাসন ক্ষেত্র নিয়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে মেক্সিকো সীমান্তে চলমান দেয়াল নির্মাণকাজ বন্ধ করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দেয়াল নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এবং জাতীয় জরুরি অবস্থা জারির মাধ্যমে এ খাতে বিশেষ তহবিল আনার মাধ্যমে। এই পুরো প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ ব্যয় হলেও, ট্রাম্প একে নিজের অন্যতম কৃতিত্ব হিসেবে বরাবরই জাহির করেছেন। এরই মধ্যে ওই সীমান্তে প্রায় ৭৩৮ মাইল দীর্ঘ দেয়াল তুলতে দেড় হাজার কোটি ডলারের মতো ব্যয় হয়েছে। এর একটি কানাকড়িও মেক্সিকো থেকে আসেনি। যদিও ট্রাম্প বারবার এর অর্থ মেক্সিকো থেকে আদায় করার কথা বলেছেন। এই পাগলাটে কাজ বন্ধে ট্রাম্প ঘোষিত জাতীয় জরুরি অবস্থার অবসান ঘটানোর পদক্ষেপ এরই মধ্যে নিয়েছেন বাইডেন।

চার বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রেসিডেন্সি শুরু করেছিলেন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে নির্বাহী আদেশে সইয়ের মাধ্যমে। আর বাইডেন তাঁর প্রেসিডেন্সি শুরু করলেন সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার আদেশ দিয়ে। তিনি একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া দেশগুলোতে ভিসা প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেবেন এবং জাতীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে কঠোর যাচাই-বাছাই শুরু করেছিল, তার ধরন জানতে পদক্ষেপ নেবেন বলে জানা গেছে।

এ ক্ষেত্রে বলা প্রয়োজন, বাইডেন যে অভিবাসন নীতি গ্রহণ করতে যাচ্ছেন, তাতে এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে সীমিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আদমশুমারিতে অনিবন্ধিত অভিবাসীদের গণনা না করার নির্দেশ দিয়ে যে স্মারকে গত বছর ট্রাম্প সই করেছিলেন, তাও খারিজ করার পদক্ষেপ নিচ্ছেন বাইডেন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সহিংসতার কারণে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেওয়া অভিবাসীদের সহায়তায় নেওয়া ডিফারড এনফোর্সড ডিপার্চার (ডিইপি) প্রকল্পের পরিসর আগামী ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়াতে এক স্মারকে সই করেছেন বাইডেন। তবে এসব পদক্ষেপ করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গৃহীত ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না বলে জানিয়েছে ডিএইচএস।

অভিবাসন আইন প্রণয়নের জন্য বাইডেন যে অভিবাসন পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন, তাতে ডাকা কর্মসূচির সুবিধাভোগী ও সাময়িক সুরক্ষা পাওয়া অভিবাসীদের দ্রুততার সঙ্গে নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে এমন এক ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, যাতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা এবং নিয়মিত কর দেওয়া এবং কোনো অপরাধে যুক্ত না থাকা অনিবন্ধিত অভিবাসীরা গ্রিনকার্ডের আবেদন করতে পারে। একই সঙ্গে ভিসা প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জট খুলতে, অভিবাসন আদালতকে উন্নত করতে, সীমান্তে প্রযুক্তির ব্যবহার উন্নত করতে এবং এল সালভাদর, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাস মতো মধ্য আমেরিকান দেশগুলোর জন্য আরও ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে এতে।

বিজ্ঞাপন

এই বিল কংগ্রেসে পাস হলে অভিবাসন ক্ষেত্রে অনেক বড় অগ্রগতি হবে। এরই মধ্যে বিলটি কংগ্রেসে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাট সদস্য লিন্ডা সানচেজ। তবে সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেহেতু ভাইস প্রেসিডেন্সির জোরে, সেহেতু এই বিলের ভবিষ্যতে কী আছে, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। সিনেটে বিলটি উত্থাপন করবেন সিনেটর বব মেনেন্ডেজ। এই বিল পাস হওয়া-না হওয়ার ওপর ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের চেহারাটি কেমন হবে, তা নির্ভর করছে অনেকাংশেই।

২০১৬ সালে নির্বাচনী প্রচারে অবৈধ অভিবাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে জয় পেয়েছিলেন বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বাইডেনের এই নির্বাহী আদেশ সম্পর্কে ব্রিফ করা জাতীয় অভিবাসন আইন কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক মেরিলেনা হিনকাপি বলেন, এটি ট্রাম্পের অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডার বিপরীতে সত্যিই এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন।

যদি কংগ্রেসে আইনটি পাস হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৪০তম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ১৯৮৬ সালে প্রায় ৩০ লাখ অভিবাসীকে সাধারণ ক্ষমার আদেশ দেওয়ার পর এ আইন হবে দেশটিতে অবৈধভাবে বাস করা নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন