ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেনছবি: রয়টার্স

যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যেই তরুণেরা ফল নির্ধারণী হয়ে উঠবেন বলে মনে করা হচ্ছে। মোটাদাগে এই তরুণদের একটা বড় অংশ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী। কিন্তু এই ট্রাম্পবিরোধী অংশের সবাইকে আবার বাইডেন-সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। আবার আসন্ন নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়েও এই তরুণদের অনেকেই ঠিকঠাক জানেন না। ফলে নির্বাচনে এদের ভূমিকা ঠিক কী হবে, তা আগে থেকে বলে দেওয়া যাচ্ছে না। তারা ভোট দেবে কিনা, সে বিষয়েও রয়েছে সংশয়।

ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী জো বাইডেন ভালো করেই জানেন, মার্কিন তরুণদের মধ্যে ভারমন্ট সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের প্রভাব কতটা। পরিবর্তনকামী এই তরুণেরাই ছিলেন স্যান্ডার্সের শক্তির মূল উৎস। জানেন বলেই দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর বাইডেন এই তরুণদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের দেখেছি, শুনেছি আপনাদের কথা।’

কিন্তু জো বাইডেনের এই আশ্বাস স্যান্ডার্স অনুসারী সব তরুণকে আশ্বস্ত করতে পারেনি এখনো। মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকো ও তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মর্নিং কনসাল্ট সম্প্রতি এ সম্পর্কিত একটি জরিপ চালিয়েছে। একই সঙ্গে তারা দুই ডজন বিশেষজ্ঞ ও তৃণমূলের সংগঠকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। এতে দেখা গেছে, তরুণতম মার্কিন ভোটারেরা পরিবর্তন চান। তাদের অধিকাংশই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোর বিরোধী। কিন্তু এদের সবাই আবার বাইডেনের প্রচারে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছে না। ভোট নিয়ে তাদের উদ্বেগও কম নয়।

বিজ্ঞাপন
জরিপে ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সী ১ হাজার সম্ভাব্য ভোটারের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৫১ শতাংশের বাইডেনকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিপরীতে ট্রাম্পকে ভোট দিতে পারেন এমন তরুণ রয়েছে ২৫ শতাংশ

জরিপে ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সী ১ হাজার সম্ভাব্য ভোটারের মতামত নেওয়া হয়। এতে দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের ৫১ শতাংশের বাইডেনকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিপরীতে ট্রাম্পকে ভোট দিতে পারেন এমন তরুণ রয়েছে ২৫ শতাংশ। যদিও নিবন্ধিত মোটা ভোটারের মধ্যে বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যকার এই ব্যবধান ৬ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটারদের দুই-তৃতীয়াংশই ট্রাম্পের কাজকে সমর্থন করেন না। এ ক্ষেত্রে তাঁরা কারণ হিসেবে ট্রাম্পের মহামারি মোকাবিলা ও ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের কথা উল্লেখ করেছেন। বাইডেনের দিকে ঝুঁকে পড়ার কারণ হিসেবেও মুখ্যত এ দুটি বিষয়ই সামনে এসেছে।

মুশকিল হচ্ছে, এই তরুণদের বাইডেনের নিবেদিত সমর্থক বলা যাবে না। পলিটিকোর জরিপে বাইডেনকে ভোট দেবেন বলে জানানো তরুণদের ৪৫ শতাংশই জানিয়েছেন, তাঁরা মূলত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিচ্ছেন। নিবন্ধিত মোট ভোটারের মধ্যে এমন মনোভাব পাওয়া গেছে ২৬ শতাংশের মধ্যে।

জরিপের এই ফলকে সঠিক বলছেন তৃণমূলের সংগঠক ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রচলিত ধারার ওপর অনেকেরই আস্থা নেই। এ বিষয়ে কমিউনিটি সংগঠন এজেড পডার-এর সংগঠক ইয়াজমিন স্যাগাস্টিউম পলিটিকোকে বলেন, ‘আমি লোকেদের ভোট দিতে বলছি। আমাকে তাদের বোঝাতে হচ্ছে যে, ভোট দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, বাইডেন যা বলছেন তার সবকিছুকে মেনে নিতে হবে। তাদের আমি বলছি, এই নির্বাচনকেই নিজেদের শেষ চেষ্টা হিসেবে ভাবার প্রয়োজন নেই। আমাদের চাপ প্রয়োগ করে যেতে হবে।’

এ বছর মোট ভোটারের ১০ শতাংশই তরুণ ভোট। কিন্তু মাত্র ৪ শতাংশ ভোট দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মার্কিন তরুণেরা রাজনৈতিকভাবে উদার মনোভাবাপন্ন। জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যপূর্ণ এই অংশ অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভীষণ সক্রিয়। মর্নিং কনসাল্টের তথ্যমতে, এ বছর মোট ভোটারের ১০ শতাংশই তরুণ ভোট। কিন্তু মাত্র ৪ শতাংশ ভোট দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অনুমিত এই হার থেকে বেশি তরুণ যদি ভোট দেন, তবে তারা নির্বাচনী ফল নির্ধারণী হয়ে উঠবেন নিঃসন্দেহে। এমনকি অনুমিত হারে ভোট দিলে সুইং স্টেট নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোয় তারা ফল নির্ধারক হয়ে উঠবে বলে মত দিয়েছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে বাইডেন-সমর্থক হিসেবে সাধারণীকরণ করা না গেলেও এই তরুণদের দেখে উদ্দীপ্ত হতে পারেন জো বাইডেন ও তাঁর প্রচার দল। পলিটিকো বলছে, অন্য বছরের তুলনায় এ বছর তরুণেরা ভোট বেশি দেবে। তরুণদের নিয়ে কাজ করা ‘রক দ্য ভোট’ ও ‘নেক্সটজেন আমেরিকা’ নামের সংগঠনগুলো জানাচ্ছে, এরই মধ্যে ভোটের দিন (৩ নভেম্বর) কেন্দ্র গিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য রেকর্ডসংখ্যক তরুণ নিবন্ধন করেছেন। অন্তত ২০টি অঙ্গরাজ্যে গত নির্বাচনের তুলনায় এবার বেশিসংখ্যক তরুণ ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছেন।

কিন্তু তারপরও প্রশ্ন থাকে। পলিটিকো/মর্নিং কনসাল্ট পরিচালিত জরিপ ও অন্যান্য প্রবণতা বলছে, তরুণদের এই শক্তিকে বাইডেন ও তাঁর দল শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে নিতে পারবে কিনা, তা এখনো নিশ্চিত নয়। মহামারির কারণে তাদের মধ্যে প্রচারকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে। এ ছাড়া যারা প্রথমবার ভোট দেবেন, তাঁরা ভোট দেওয়ার পদ্ধতি নিয়ে এখনো সংশয়ে রয়েছেন। এর আগেও এমনটা হয়েছে। ২০১৮ সালেও তরুণদের অবস্থান একই ছিল। কিন্তু একে ভোটে অনূদিত করা যায়নি।

জরিপে দেখা গেছে, তরুণতম ভোটারদের মাত্র অর্ধেক ভোট দেওয়ার বিষয়ে মনস্থির করেছে। নৈরাশ্যের আরও চিহ্ন রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া তরুণদের এক-তৃতীয়াংশই মনে করেন, তাঁদের ভোট কোনো প্রভাব ফেলবে না। আর এক-চতুর্থাংশ জানিয়েছেন, দুই প্রার্থীর কাউকেই তাঁরা পছন্দ করেন না।

বিজ্ঞাপন
এই তরুণদের দলে ভেড়াতে হলে আরও বামঘেঁষা নীতি নিতে হবে। এই তরুণ ভোটারেরা অনেক কারণেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তারা বুঝে গেছে যে, সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ট্রাম্পকে অপসারণ করলে আদতে কোনো লাভ হবে না
অধ্যাপক মেলিসা ডেকম্যান, ওয়াশিংটন কলেজ

পলিটিকোর বিশ্লেষণে বলা হয়, এই যে সংশয়—এটা এমনি এমনি আসেনি। প্রথম ভোটার হওয়ার পথে তারা দেখেছে দেশের নেতৃত্ব প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হাত থেকে এক কট্টর শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে যেতে। তারা দেখেছে, পুরো রিপাবলিকান দলকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলছেন। তাঁরা দেখেছেন, গোটা যুক্তরাষ্ট্রের নারীদের আন্দোলনে নামতে। দেখেছেন ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের ছড়িয়ে পড়া। আর তাদের রাজনৈতিক মত গড়ে ওঠার সময়কালটি যুক্তরাষ্ট্রে ‘সর্বব্যাপী অসমতা’ নিয়ে আলোচনার সময়কাল হিসেবেও চিহ্নিত। এই একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছে বিভাজনের রাজনীতি। পরিবর্তনকামী এই প্রজন্ম উভয় দল নিয়েই অসন্তুষ্ট।

পলিটিকোর জরিপে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটারদের ৪২ শতাংশই নিজেদের নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। ডেমোক্র্যাট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন ৩৯ শতাংশ তরুণ। আর ২০ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা রিপাবলিকান দলের সমর্থক। মোট নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে নিরপেক্ষ ভোটারের হার অনেক কম। মোট নিবন্ধিত ভোটারের ২৬ শতাংশ নিজেদের নিরপেক্ষ বলে পরিচয় দিয়েছেন। আর ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান বলে পরিচয় দিয়েছেন যথাক্রমে ৪০ ও ৩৬ শতাংশ ভোটার।

উদারপন্থী ডেমোক্র্যাট বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেন নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে যাওয়ার পর ডেমোক্রেটিক দল এই নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা তরুণদের দলে টানার চেষ্টা করেছে। কিন্তু নির্বাচনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে এসে এখনো এতসংখ্যক তরুণের কোনো অবস্থান না নেওয়াটা বলে, সে চেষ্টা খুব একটা সফল হয়নি।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মেলিসা ডেকম্যান পলিটিকোকে বলেন, ‘এই তরুণদের দলে ভেড়াতে হলে আরও বামঘেঁষা নীতি নিতে হবে। এই তরুণ ভোটারেরা অনেক কারণেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে। তারা বুঝে গেছে যে, সিনেট রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রেখে ট্রাম্পকে অপসারণ করলে আদতে কোনো লাভ হবে না। (ডেমোক্রেটিক) দলে মাঝারি মানের বদল এনে তাদের তুষ্ট করা যাবে না।’

মন্তব্য পড়ুন 0