default-image

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এবার সুস্পষ্ট ফেবারিট জো বাইডেন। গেলবারের হিলারি ক্লিনটনের মতো এবারও ডেমোক্রেটিক দলের মনোনীত প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। প্রায় সব পূর্বাভাসেই বাইডেনের জয় সময়ের ব্যাপার বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। আর এ কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। ইতিহাস ও চলমান নানা ঘটনার কারণে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই আশঙ্কা প্রবল যে, শেষ মুহূর্তের ভেলকিতে ট্রাম্প জয় ছিনিয়ে নিতে পারেন বাইডেন থেকে।

এই যে শঙ্কা, এটা একেবারে অমূলক নয়। যাবতীয় পূর্বাভাসকে উল্টে ফেলার যে শঙ্কা, তার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এখন পর্যন্ত হওয়া বিভিন্ন জরিপে পিছিয়ে আছেন ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের জনবিন্যাস প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, যা ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের জন্য সুবিধাজনক নয়। এর মধ্যে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে পুরো যুক্তরাষ্ট্র শুধু মৃত্যুর মিছিলই দেখেনি, দেখেছে চরম অর্থনৈতিক দুর্দশাও। আর এ সবকিছুর মধ্যে ট্রাম্পের ভাষ্য ও আচরণে কোনো সমবেদনার লেশমাত্র ছিল না। উল্টো বিদ্বেষ উসকে দিয়েছেন তিনি, বিশেষত নারী ও প্রান্তিক ভোটারদের মধ্যে।

এত সব যখন ঘটছে, তখন বাইডেন ও তাঁর প্রচার দল এগুলোকে সেভাবে কাজে লাগাতে পারেননি। এবারও ডেমোক্রেটিক দল ভুল করেছে। ফলে এবারও সব জনমত জরিপের ফল ও পূর্বাভাস ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। কথা হলো এই ত্রুটির মাত্রা ঠিক কতটা হবে। বাইডেন ও তাঁর প্রচার দল কোন মাত্রার ত্রুটি পর্যন্ত নিরাপদ?

বিজ্ঞাপন
সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বেশ ভালো যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়েছেন, যার মধ্যে এমনকি তুলনামূলক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারও রয়েছেন। এই ভোটাররা ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ালে জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, মিশিগান ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যগুলো ডেমোক্র্যাটদের হারাতে হতে পারে

মার্কিন অর্থনীতি এখন দিক পরিবর্তন করছে, যা ট্রাম্পের শক্তি বাড়াচ্ছে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বেশ ভালো যোগাযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়েছেন, যার মধ্যে এমনকি তুলনামূলক উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারও রয়েছেন। এই ভোটাররা ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ালে জর্জিয়া, ফ্লোরিডা, ওহাইও, পেনসিলভানিয়া, মিশিগান ও নর্থ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যগুলো ডেমোক্র্যাটদের হারাতে হতে পারে। কারণ না বললেও চলে যে, বাইডেন নন, ট্রাম্পই আদতে কর্মসংস্থানকে সামনে রেখে প্রচার চালাচ্ছেন।

ভাবুন। হিলারি ক্লিনটন উইসকনসিনে একবারও না গিয়ে নিউইয়র্কের চাপাকুয়ায় নিজ বাড়ির আশপাশের বনবিথিতলে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এদিকে বাইডেন এই শেষ মুহূর্তে এসে কিছু অঞ্চলে যাচ্ছেন। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ গবেষণা। আধুনিক সময়ে প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সম্ভাব্য সর্বোচ্চ মাত্রায় সশরীরে প্রচার চালিয়েছেন এবং এর চেয়ে অনেক বেশি ছুটে বেড়িয়েছেন। ভোটারদের সঙ্গে দেখা করা ও দায়িত্বের সঙ্গে কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাইডেন এ ক্ষেত্রে যা করছেন, তা অনেকটা আয়েশি ভঙ্গিতে খাবার খাওয়ার মতো।

প্রচার মানে শুধু ভোটারদের কাছে পৌঁছানোই নয়। এর মধ্যে পরিশ্রম, তেজ ও সামাজিকীকরণের মতো বিষয় থাকতে হয়, যা মানুষ নেতার মাঝে দেখতে চায়। আমি মনে করি না, ট্রাম্পের উচিত ঝাঁকে ঝাঁকে মাস্কবিহীন সমর্থকদের জড়ো করা, যাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে। কিন্তু তাঁর সমাবেশগুলো এমন একটা প্রতীতির জন্ম দেয় যে, সামনেই সুসময়, যা অধিকাংশ বিজয়ী প্রেসিডেনশিয়াল প্রচারের ভিত্তিমূলে রয়েছে।

সুখের দিনগুলো আবার ফিরে আসছে—এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেখা গেছে গত বৃহস্পতিবার। ওই দিন মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তথ্য প্রকাশ করে, যেখানে প্রায় ৩৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। এই তথ্য অর্থনীতি বাঁচাতে তাঁর অবস্থানই সবচেয়ে দৃঢ়—ট্রাম্পের এই দাবিকে জোরালো করে।

দ্বিতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে বাইডেন জ্বালানি তেল শিল্প বন্ধ করে দেবেন বলে নিজের যে ক্ষতি করেছেন, তাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই

নিজের কাজেও লাগতে পারে—এমন বিবেচনাকে পাশ কাটিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প শুরু থেকেই অবিরত ডাকযোগে ভোট নিয়ে অভিযোগ তুলে আসছেন। রিপাবলিকানদের চেয়ে অনেক বেশি ডেমোক্র্যাট ডাকযোগে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এই ব্যালটগুলোর একটি বড় অংশই সঠিকভাবে পূরণ না করায় বা দেরিতে পাঠানোয় বা স্রেফ হারিয়ে যাওয়ার কারণে গণনায় আসবে না।

যখন যুক্তরাষ্ট্র আবার কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ছে, তখন ভাবার কোনো কারণ নেই যে, এটি বাইডেনের জন্য সহায়ক হবে। ট্রাম্প বারবার বলছেন, ভাইরাসের বিস্তার নিয়ে অতিরিক্ত ভয় না পেয়ে অর্থনীতি খুলে দেওয়ার সময় এসেছে। মহামারি নিয়ে মানুষ এখন ক্লান্ত ও অবসাদগ্রস্ত। তারা চায় এমনকি নিজের ও অন্যদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও কোভিড-জমানার আগের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে।

এদিকে শুধু বাইডেন নিজেই ঘরে থাকছেন না, তাঁর প্রচারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক দলও অনেকটা ঘরবন্দী হয়ে আছেন। ভোটারদের দরজায় যাওয়ার বদলে তাঁরা ওয়াইফাইয়ের ওপর নির্ভর করছেন। বাইডেনের প্রচার দল অতি সম্প্রতি মাঠে নেমেছে। অথচ ট্রাম্প ও তাঁর প্রচার দল ভোটারদের দরজায় যাওয়ার কাজটি কয়েক মাস ধরে করছেন। আগে থেকেই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ভোটারদের জড়ো করার বিষয়টি শুধু খারিজ করার মাধ্যমে বাইডেন সম্ভবত আধুনিক সময়ের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারের ধরনকে অস্বীকার করে আরেকটি দুর্ভাগ্যজনক পরীক্ষা চালালেন।

দ্বিতীয় প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে বাইডেন জ্বালানি তেল শিল্প বন্ধ করে দেবেন বলে নিজের যে ক্ষতি করেছেন, তাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বিতর্কের সঞ্চালক ক্রিস্টেন ওয়াকার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি কি তেল শিল্প বন্ধ করে দেবেন? এর উত্তরে বাইডেন বলেন, হ্যাঁ, তিনি এই জ্বালানি খাতের রূপান্তর ঘটাবেন। যখন ওয়াকার প্রশ্ন করলেন—কেন? তখন বাইডেনের উত্তর ছিল, কারণ তেল শিল্পের কারণে উল্লেখযোগ্য হারে দূষণ হয়।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতির চাকা এখন ঊর্ধ্বমুখী হলেও মানুষ এখনো দুর্দশাগ্রস্ত। তাই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাইডেনের এই অবস্থান হঠকারী। বাইডেন পরে বিষয়টি ঢাকতে চেয়েছেন। বলেছেন, ‘আমরা জীবাশ্ম জ্বালানি খাত আরও অনেক দিন চালিয়ে যাব।’ কিন্তু তাঁর অবস্থান আগেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে তাঁকে অন্তত পেনসিলভানিয়া হারাতে হতে পারে, যেখানে ফ্র্যাকিং শিল্প লাখো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

আসা যাক জনমত জরিপের বিষয়ে। জরিপকারী সংস্থাগুলো জোর দিয়ে বলছে, ট্রাম্প সমর্থক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ২০১৬ সালের জরিপে হওয়া ত্রুটি শুধরে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা হয়তো নতুন কোনো ত্রুটির শিকার হয়েছে। এবারও তারা ট্রাম্প ও বাইডেন সমর্থকদের মধ্যে উদ্দীপনায় যে পার্থক্য রয়েছে, তা নিরূপণ করতে পারেনি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ‘লাজুক’ সমর্থকদের কাছেও তারা পৌঁছাতে পারেনি। বহু মানুষ ট্রাম্পের প্রতি তাঁদের সমর্থনের বিষয়টি প্রকাশে কুণ্ঠিত, যার সংখ্যা সম্ভবত এবারই বেশি।

গা-ছাড়াভাবে কাউকে ফোন করে তিনি কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা জানতে চাওয়া হয়েছে এবারও। ধরুন, আপনি একজন বার্নি স্যান্ডার্স বা কংগ্রেসওম্যান আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ বা অন্তত টেইলর সুইফটের ভক্ত বা অন্য কেউ। আর আপনাকে ফোনে প্রশ্ন করা হলো—আপনি কি বর্ণবাদী, নারীবিদ্বেষী, উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী ট্রাম্পকে সমর্থন করেন? আপনি কী উত্তর দেবেন? নিঃসন্দেহে বলবেন, ‘বাইডেন’। তারপর হয়তো বলবেন, ‘গ্রিন নিউ ডিল! একা থাকতে দাও, গুডবাই।’

গতবারের চেয়ে এবার ট্রাম্পের গোপন সমর্থকের সংখ্যা বেশি বলেই মনে হচ্ছে। হিলারি ক্লিনটনকে ভোট না দেওয়ার ব্যাখ্যা সহজে দেওয়া যেতে পারে। তিনি অনেকের কাছেই অজনপ্রিয় ছিলেন। তেমন জোরালো আকর্ষণ সৃষ্টি করতে না পারলেও বাইডেনকে এত সহজে খারিজ করা যায় না

গতবারের চেয়ে এবার ট্রাম্পের গোপন সমর্থকের সংখ্যা বেশি বলেই মনে হচ্ছে। হিলারি ক্লিনটনকে ভোট না দেওয়ার ব্যাখ্যা সহজে দেওয়া যেতে পারে। তিনি অনেকের কাছেই অজনপ্রিয় ছিলেন। তেমন জোরালো আকর্ষণ সৃষ্টি করতে না পারলেও বাইডেনকে এত সহজে খারিজ করা যায় না। উপরন্তু গত চার বছর ধরে ট্রাম্প এত বেশি সমালোচিত হয়েছেন যে, প্রকাশ্যে তাঁকে সমর্থন জানানোটা ভোটারদের পক্ষে অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে।

এই কথা বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিন ভোটারদের ক্ষেত্রে সত্য, যাদের পক্ষে প্রকাশ্যে বিরোধিতা করা একজনকে খোলাখুলি সমর্থন জানানোটা অসম্ভব প্রায়। কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের, বিশেষত কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্পের অবস্থান ২০১৬ সালের চেয়ে দৃঢ়। মহামারির আগে কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বেকারত্বের হার রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত আইন সংস্কারে ট্রাম্প বড় উদ্যোগ নিয়েছেন এবং এতে স্বাক্ষরও করেছেন। এতে হাজারো কয়েদি মুক্তি পেয়েছে, যার একটি বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ।

ট্রাম্পের অবস্থা যত করুণই মনে হোক, ভোটের মাঠ ততটা বিরুদ্ধে নয় তাঁর। এই মুহূর্তে নির্বাচনের ঠিক আগে আগে ব্যাটলগ্রাউন্ড অঙ্গরাজ্যগুলোতে বাইডেন থেকে ট্রাম্প গড়ে ঠিক ততটাই পিছিয়ে আছেন, যতটা তিনি ২০১৬ সালে হিলারি থেকে পিছিয়ে ছিলেন। এই অঙ্গরাজ্যগুলোর বেশ কয়েকটিতে তিনি আবারও জয় পাবেন। আর ২০১৬ সালের মতোই ইলেকটোরাল কলেজ ও প্রেসিডেন্সি একই পথে হাঁটবে।

*এনবিসি নিউজে প্রকাশিত এই মন্তব্য প্রতিবেদনটি লিখেছেন ওয়াশিংটন এক্সামিনারের সিনিয়র এডিটর কিথ কফম্যান

মন্তব্য পড়ুন 0