default-image

আমরা প্রতিটা মানুষই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কখনো কখনো অসহায়ত্ব বোধ করি। এটিই স্বাভাবিক। তবে, সেটি যদি বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখনই সমস্যা। অচেতন মনে আমরা অনেক সময় অন্যদের কাছে নিজেদের নিরাপদ মনে করতে ব্যর্থ হই। অন্যদের তুলনায় নিজেদের কম আকর্ষণীয়, বুদ্ধিমান ভেবে থাকি।

সমসাময়িক ‌অবস্থানে নিজেদের সঠিক মনে করতে পারি না। চারপাশের মানুষের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করে হেয় বা খারাপ ভেবে থাকি। আবার কখনো অন্যের চেয়ে নিজেকে উন্নত বা ভালো প্রমাণ করতে ক্রমাগত অন্যদের সাফল্য ও কৃতিত্বগুলো নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করি, নির্দিষ্ট মানুষগুলোকে অন্যদের কাছে হেয় করারও চেষ্টা চালাই।

মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলার, যিনি ‘ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স’ (জটিল হীনমন্যতা) শব্দটি সৃষ্টি করেছিলেন, তিনি এই প্রবণতাটিকে ‘শ্রেষ্ঠত্বের প্রচেষ্টা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর অর্থ হলো, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে আপনি নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার চেষ্টায় আশপাশের লোকদের অনুভূতিতে হস্তক্ষেপ করছেন।

নিজেকে আরও উচ্চপদে তোলার একমাত্র উপায় হিসেবে আপনি অন্যদের ছোট করার চেষ্টা করছেন। এটিকে বলা হয়, ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স (জটিল হীনমন্যতা)। পরীক্ষাগতভাবে যদিও এটি এখনো মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত হয়নি, তবে অবশ্যই এটি অস্বাস্থ্যকর একটি মানসিক ‌সংকট।

ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স শব্দটি বিশ শতকের শুরুতে অস্ট্রেলিয়ান মনোবিজ্ঞানী আলফ্রেড অ্যাডলারের তৈরি। কেন কিছু মানুষ নিজ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় প্রেরণার অভাব বোধ করেন, হীনমন্যতায় ভোগেন এবং তারা কি জন্মগতভাবে এমন হয়ে জন্মান নাকি এর সঙ্গে শৈশব-পারিপার্শ্বিকতার অবস্থা জড়িত?—এসব বিষয় জানতে অ্যাডলার গবেষণা করেন। তবে আধুনিক মনস্তত্ত্ববিদ, বিশেষ করে জেমস ই ম্যাডডাক্স ইনফিরিওরিটি শব্দটি থেকে অনেকাংশেই দূরে সরে আছেন। ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সকে এখন ক্লিনিক্যাল স্বসম্মানের ঘাটতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মনোবিজ্ঞানীরা আজ বিশ্বাস করেন, পূর্ণমাত্রায় ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সগুলো কেবল শৈশব অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয় না। বরং এর সঙ্গে শৈশব অভিজ্ঞতা, প্রাপ্ত বয়সের অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য ও সাংস্কৃতিক ধারণাও জড়িত।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) এটিকে, ‘অপ্রাপ্তি ও নিরাপত্তাহীনতার প্রাথমিক অনুভূতি, প্রকৃত বা কল্পনাযুক্ত শারীরিক বা মানসিক ঘাটতি থেকে প্রাপ্ত’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে। মূলত ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সকে ‘শ্রেষ্ঠত্বের জটিলতা’–এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, যেখানে একজন ব্যক্তির দক্ষতা এবং সাফল্যের বিষয়ে অতিরঞ্জিত মতামত থাকে।

যখন ইনফিরিওরিটি অর্থাৎ হীনমন্যতা এবং শ্রেষ্ঠত্বের অনুভূতির বিষয়টি আসে, তখন এটি কিছুটা ‘চিকেন অ্যান্ড এগ’ পরিস্থিতি দাঁড়ায়, যেখানে বুঝতে সমস্যা হয় যে, আসলে কোনটি থেকে কোনটির জন্ম। তবে বড় বড় জটিলতা সাধারণত হীনমন্যতার অনুভূতির প্রতিক্রিয়াতেই তৈরি হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করে থাকেন।

সাধারণত, ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স শৈশবের কোনো অপ্রতুল-অবৈধ অভিজ্ঞতার কারণে বা এমন কোনো পরিবারে বেড়ে ওঠাকে বোঝায়, যেখানে নিকৃষ্ট জটিলতা (হেয় করা, প্রশংসা না পাওয়া, নিচু করা, উৎসাহ না পাওয়া) বিকশিত হওয়ার ফলে কোনো শিশুর মধ্যে ভালো বোধ গড়ে উঠে না। তবে আরও বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে।

সুতরাং, আপনি কীভাবে জানবেন, আপনি ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছেন কিনা? প্রাথমিকভাবে যখন আপনি নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মান কমতে দেখবেন, তখনই ধরে নেওয়া যায় যে, আপনি ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছেন। তবে কখনো কখনো লক্ষণগুলো এতটা স্পষ্ট হয় না।

জর্জ ম্যাসন ইউনিভার্সিটির কলেজ অফ এডুকেশন অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্টের সিনিয়র সহযোগী ডিনমার্টিনই ফোর্ড স্পষ্ট করে বলেছেন, আপনি কীভাবে হীনমন্যতার অনুভূতির প্রতি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন, তাই ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সের স্বীকৃতি দেয়।

হীনম্মন্যতায় আপনার অনুভূতি কি আপনাকে উত্তেজিত করে? এটি কি আপনাকে বদনাম দেয়? বা এগুলো কি হিংসুকের অনুভূতি সৃষ্টি করে আপনার মধ্যে? কিংবা নিজের সম্পর্কে আরও ভালো প্রচার বা ভালো বোধ জন্মাতে অন্যকে নিচে নামাতে আপনাকে প্ররোচিত করে?

যদি এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াগুলো নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়, তখনই বুঝবেন আপনি ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে ভুগছেন।

এই সমস্যাটি নির্ণয় করতে আরও কিছু লক্ষণ দেখা যায়। যেমন, নিরাপত্তাহীনতা এবং নিম্ন স্বসম্মান, লক্ষ্যে পৌঁছতে অক্ষমতা, কোনো কিছুতে আটকে গিয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া, অন্যকে সবচেয়ে খারাপ অনুমান করা, সামাজিক পরিস্থিতি প্রত্যাহারের প্রয়োজন অনুভব করা, প্রায়শই নিজেকে নিচু অনুভব করা, উদ্বেগ ও হতাশা, সমালোচনা মানতে না পারা, গুরুত্ব সহকারে প্রশংসা গ্রহণ না করা ইত্যাদি ইত্যাদি।

ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সের আরও কিছু লক্ষণ রয়েছে, যাকে প্রায়শই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী ভেবে ভুল করা হয়। যেমন, অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক ধারা, মাত্রাতিরিক্ত নিখুঁত, মনোযোগ আকর্ষণে তৎপরতা, সমালোচনার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীলতা, অন্যের মধ্যে ক্রমাগত ত্রুটির সন্ধান করা, ভুল স্বীকার করতে না পারা, ‌অন্যের চেয়ে ভালো কিছু করে খুব বেশি তৃপ্তি পাওয়া...ইত্যাদি।

ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স কেবল আপনারই ক্ষতি করে না, বরং আপনার চারপাশের সবাইকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই সমস্যার বিকাশ মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধি, যেমন উদ্বেগ ও হতাশার দিকে আপনাকে পরিচালিত করতে পারে। তাই যদি আপনি মনে করেন, আপনি ইনফিরিওরিটির সঙ্গে লড়াই করছেন, তবে চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি, মেডিটেশন, ইতিবাচক মানুষের সঙ্গে চলা, নিজেকে ভালোবাসা ইত্যাদি জিনিসগুলো কার্যকরী হতে পারে।

সাইকোথেরাপিস্ট আপনার বিধ্বস্ত অতীত, শৈশব, জটিল ঘটনা, নিম্ন স্বসম্মান ও নেতিবাচক আত্মচিত্রকে গাইড করতে পারবে। সাইকোথেরাপিস্ট খুব যত্ন ও নিরাপত্তার সঙ্গে বন্ধুর মতো আপনাকে মূল্যায়ন করবে। আপনার আত্মবিশ্বাসকে পুনর্নির্মাণের জন্য চেষ্টা করবে। মনে রাখতে হবে, সাইকোথেরাপি নেওয়া মানেই আপনি মানসিকভাবে অসুস্থ নন, বরং এটি আপনার আত্মবিশ্বাসকে পুনর্নির্মাণের জন্য একটি পথ মাত্র।

থেরাপি ছাড়াও মেডিটেশন এ অবস্থায় আপনার সহায়ক হতে পারে। এ দুটোই আপনার চিন্তার ধরনগুলো বদলাতে, আপনার নিকৃষ্ট অনুভূতির উৎস বুঝতে সহায়ক হবে এবং আপনাকে একটি স্বাস্থ্যকর নিশ্চিত মানসিক শক্তি উপহার দিতে কাজ করবে। স্কুল সাইকোলজিস্ট ব্রুটোর মতে, এ জটিলতায় মেডিটেশন খুবই উপকারী। মেডিটেশন আমাদের নেতিবাচক চিন্তাশক্তির পুনরুদ্ধার করে। আত্মভালোবাসা বৃদ্ধি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী।

পেশাদার পরামর্শদাতা নিকিয়া লোয়ার এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক শব্দের মাধ্যমে নিজের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর মতে, নেতিবাচক অনুভূতি আমাদের ডুবিয়ে দিতে পারে। ইতিবাচক কথাবার্তা আমাদের হতাশা থেকে উত্তোরণে সহায়তা করে।

স্কুল সাইকোলজিস্ট জোয়ানা ব্যাকলের মতে, ইতিবাচক ও উন্নত মননশীলতার ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব বিরাট পরিবর্তন আনতে পারে। নেতিবাচক বা বিষাক্ত সম্পর্কগুলো আমাদের মাঝে ব্যর্থতা সৃষ্টি করে।

আমাদের প্রত্যেকেরই শক্তি ও দুর্বলতা দুটিই রয়েছে। কখনো আমরা সফল, কখনো ব্যর্থ। এতে করে নিজেকে অন্যের চেয়ে ছোট বা নিজ আত্মবিশ্বাসকে অবমূল্যায়ন করার কোনো কারণ নেই। ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স এমন একটি জিনিস, যা থেকে আপনি চাইলেই মুক্ত হতে পারেন এবং একটি স্বাস্থ্যকর আত্মসম্মান পাওয়ার যোগ্য সুখী ও সুন্দর জীবনযাপন করতে পারেন।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন