default-image

আব্রাহাম লিঙ্কন; অজপাড়া গাঁয়ের ছেলে। কেনটাকিতে জন্ম হয় লিঙ্কনের। বেড়ে ওঠেন এক দরিদ্র মার্কিন পরিবারে। ওই গ্রামের গভীর জঙ্গলের মধ্যে ছিল তাঁর বাড়ি। লিঙ্কনের বাবার একটি মুদি দোকান ছিল। বাবার সঙ্গে বসে লিঙ্কন দোকানে তেল, নুন বিক্রি করতেন। বাবা চাইতেন না লিঙ্কন পড়ালেখা করুক। ১২ বছর পর্যন্ত লিঙ্কন ছিলেন নিরক্ষর। তাঁর নিজের মাও তাঁকে পড়ালেখায় সাহায্য করতেন না। বয়স যখন নয় বছর, তখন তাঁর মা মারা গেলেন। বাবা আবার বিয়ে করেন। বিমাতা এসে বালক লিঙ্কনকে আদর করতে শুরু করলেন। তিনি তাঁকে ‘এ-বি-সি-ডি’ বর্ণমালা শেখালেন। প্রাইমারি স্কুলে ভর্তিও করে দিলেন।

আব্রাহাম লিঙ্কনের পরিবার এতটাই গরিব ছিল যে, তাদের থাকার ঘর ও জমি ছিল না। আব্রাহাম লিঙ্কনের বাবার কাছে তাঁকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর বা বই কিনে দেওয়ার টাকা ছিল না। অন্যদের কাছ থেকে পুরোনো বই ধার করে তাঁকে পড়তে হতো। এভাবে বেশি দিন চলেনি। কিছুদিন পরই তাঁকে পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল।

‘তুমি যদি হার না মানো, তাহলে তোমার চেষ্টা বিফলে যাবে না।’ চেষ্টা করতে থাকা ব্যক্তিরা কখনো হারে না। আব্রাহাম লিঙ্কন পুরো দুনিয়ার কাছে ব্যর্থতা, প্রচেষ্টা ও সফলতার উজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। স্বশিক্ষিত হয়ে তিনি ইলিনয়ের আইনজীবী হন।

আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনের সব থেকে বড় সম্বল ছিল তাঁর ‘হার না মানা’ মনের জোর। আমরা যারা অল্পতেই জীবনের কাজ ও লক্ষ্য হারিয়ে ফেলি, ভাবি—‘আমাকে দিয়ে হবে না, আমি এটার জন্য না’, তাদের উচিত আব্রাহাম লিঙ্কনের জীবনী পড়া।

ছোটবেলা থেকেই লিঙ্কনের মনে দাসপ্রথার জন্য কষ্ট হতো। দাস প্রথার বিরুদ্ধে লিঙ্কনের অনেক চেষ্টা বিফল হয়েছে। এ জন্য তিনি প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে ছিলেন। আব্রাহাম বলেছেন, তিনি ছুরি ও চাকু থেকে দূরে থাকতেন। কারণ, তিনি নিজেকে শেষ করে দেবেন—এমন ভয় ছিল তাঁর মনে।

অথচ আমাদের দেশে দারিদ্র্য অনেককেই তোষামোদ করে, ভুল পথে চাকু-বন্দুক হাতে ওপরে ওঠার সিঁড়ির সন্ধান করতে শেখায়। আজকাল অনেক তরুণ লেখাপড়া করার চেয়ে অন্য সহজ পথে বড় হতে ভালোবাসে। ‘বড়লোক’ মানে বড় মাপের মানুষ না। সবাই শুধু অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ে বড়লোক হতে আগ্রহী। এখন আর কেউ বিশ্বাস করে না—

‘লেখা পড়া করে যে

গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।’

বরং এই বিশ্বাস এখন প্রবল—

‘ছুরি বন্দুক আছে যার

সকলেই বশ তার।’

এই বিশ্বাস নিয়ে সংসদ সদস্য বা চেয়ারম্যানের তাঁবেদার যারা, যাদের বডিবিল্ডিং সার্টিফিকেট আছে, এলাকার মাস্তান, তাদের হাতেই গাড়ি, আর কাড়ি কাড়ি টাকা আসছে। ফ্রিজ-টিভি কিনে রাতারাতি গ্রাম থেকে শহরের ফ্ল্যাটে এনে তোলে বাবা-মাকে। আজকাল বাবা-মায়েরা জানতেও চান না, এত টাকা তাঁদের সন্তান হঠাৎ কীভাবে পেল? অথচ আমাদের ভাইয়েরা বাজার করে আনার পর টাকার আনা আনা হিসাব দিতে হতো। সময় বদলে গেছে। অনেক কিছু বদলেছে। এটা স্বাভাবিকও। তবে নীতি নৈতিকতার শিক্ষা বদলানো উচিত না।

বিজ্ঞাপন

মানুষের জন্ম হয়। মানুষ বড় হয়। কেউ কেউ রয়ে যায় পরিবারের। কেউ হয়ে যায় সমাজের। কেউ হয় রাষ্ট্রের। কেউ নিজেকে বৈশ্বিক পরিসরে বিকশিত করে। কারও মানবজনম সফলতা পায়। কেউ মনে করে যে দেশে জন্ম, দেশের জন্য কাজ করতে করতে দেশেই মরব। বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকম ভাবনা। তবে শুরুটা যেমনই থাক না কেন, আশা ও স্বপ্ন মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সফল মানুষের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মা-বাবা কিংবা শিক্ষকের প্রেরণা তাদের জীবনকে প্রণোদনা জুগিয়েছে। আব্রাহাম লিঙ্কনের সৎ-মা তাঁকে সহায়তা করেছিলেন। আর জোসেফ বাইডেন ছিলেন ছোটকালে তোতলা। যে কারণে বুলিংয়ের শিকার হয়েছেন তিনি শৈশব-কৈশোরে। তবে তাঁর মা তাঁকে সব সময় সাহস জুগিয়েছেন।

১৯৪২ সালের ২০ নভেম্বর জো বাইডেনের জন্ম। বাবা জোসেফ রবিনেট বাইডেন সিনিয়র ও মা ক্যাথরিন ইউজেনিয়া ফিনেগান। মা আইরিশ বংশোদ্ভূত। উত্তর-পূর্ব পেনসিলভানিয়ার স্ক্র্যানটনে বেড়ে ওঠেন তিনি। বাবা বাইডেন সিনিয়র ছিলেন ফারনেস ক্লিনার। পরে পুরোনো গাড়ির সেলসম্যান হিসেবে জীবনের বড় একটি সময় কাটে তাঁর। ছোটবেলা থেকে প্রবল দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হয়েছেন মার্কিন এই রাজনীতিক। নিজের মানসিকতা দৃঢ় করতে বাবা-মায়ের অবদান ও দারিদ্র্যকে অসংখ্যবার ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি। এই দারিদ্র্য ও কঠিন জীবনযাত্রা তাঁকে একজন পোক্ত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করেছে বলে অনেক সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন বাইডেন।

স্ক্র্যানটনে সেন্ট পলস এলিমেন্টারি স্কুলে পড়াশোনা করেন বাইডেন। তেরো বছর বয়সে পরিবারসহ ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যে আসেন তিনি। ছোটবেলা থেকে কথা বলায় সমস্যা ছিল বাইডেনের। তোতলামির জন্য স্কুলে সহপাঠীরা প্রায়ই তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করত। এ জন্য কান্নাকাটি করতেন। তাঁর মা তাঁকে প্রচুর সাহস দিতেন। সেন্ট হেলেনা স্কুল, বার্চমেরে অ্যাকাডেমির শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষকদের নজর কাড়েন রোগাটে ও ছিপছিপে কিশোর বাইডেন। ছোটবেলায় কথা বলতে গিয়ে আটকে যাওয়া শিশু বাইডেন আজ মার্কিন রাজনীতির অন্যতম আইকন।

ডেলাওয়্যার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাঠ চোকান বাইডেন। ছোটবেলা থেকে ফুটবল খেলার প্রতি ছিল অন্য রকম এক টান। জন এফ কেনেডির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম ভক্ত ছিলেন তিনি। ১৯৬১ সালের দিকে ধীরে ধীরে রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন। রাজনীতির মাঠে নামার পর নেইলিয়া হান্টারের সঙ্গে পরিচয় হয়। সেই পরিচয় শেষ পর্যন্ত পরিণয়ে রূপ নেয় ১৯৬৬ সালে। তাঁদের ঘরে রয়েছে তিন সন্তান জোসেফ, হান্টার ও নাওমি।

জো বাইডেন ১৯৬৮ সালে একটি ল ফার্মে কর্মরত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি হিসেবে নিযুক্ত হন জো বাইডেন। ১৯৭০ সালে নিউ ক্যাসল কান্ট্রি কাউন্সিলে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এর পর নিজস্ব ল ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭২ সালের নভেম্বরে রিপাবলিকান সিনেটর স্যালেব বগসের বিপক্ষে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী মনোনীত হন তিনি। এর পর মার্কিন ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখে ফেলেন নিজের নাম। ২৯ বছরের বাইডেন মার্কিন ইতিহাসে পঞ্চম সর্বকনিষ্ঠ সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৩ সালে প্রথমবার সিনেটে যান তিনি। ১৯৭২ সালে বড় দিনের উৎসবের জন্য ক্রিসমাস ট্রি কিনতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান প্রথম স্ত্রী নেইলিয়া। বিয়ের পর স্ত্রীকে নিজের স্বপ্নের কথা শুনিয়েছিলেন বাইডেন। বলেছিলেন, তিনি স্বপ্ন দেখেন ৩০ বছর বয়স হওয়ার আগে একবার সিনেটর নির্বাচিত হতে চান। এর পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার স্বপ্ন রয়েছে বলেও স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। স্ত্রীকে বলা সেই স্বপ্ন এখন বাস্তব।

প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৯৭৭ সালে ফের বিয়ে করেন বাইডেন। দ্বিতীয় স্ত্রী জিলের ঘর আলো করে কন্যা সন্তান অ্যাশলে জন্মান ১৯৮১ সালে। ১৯৭৮, ১৯৮৪, ১৯৯০, ১৯৯৬, ২০০২ ও ২০০৮ সালে সিনেটর হিসেবে টানা নির্বাচিত হন জো বাইডেন। সিনেটর হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ইরাক নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। ১৯৮৭ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেনশিয়াল প্রাইমারিতে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। তবে অসুস্থতার কারণে পরের বছর এই লড়াইয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।

২০০৭ সালের কথা। আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল প্রাইমারিতে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেন। ওই সময় বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটনের বিপক্ষে নিজের অবস্থান তৈরি করে নিতে ব্যর্থ হন। হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতে পারেননি তিনি। পরে ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার টেলিফোন পান। বাইডেনকে রানিংমেট হিসেবে বেছে নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন ওবামা। ২০০৯ সালের ২০ জানুয়ারি বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। ২০১৭ সাল পর্যন্ত একই পদে ছিলেন তিনি। ২০২০ সালে এসে তাঁর সেই পুরোনো স্বপ্ন ইতিহাসে পরিণত।

এটা সত্যি যে, মানুষ হওয়াটা একটা চর্চার ব্যাপার। মানুষ হয়ে জন্ম নিলেই মানুষ হওয়া যায় না। গরু-ছাগল বা অন্য পশু জন্মের পরপরই উঠে দাঁড়াতে শেখে, দৌড়াতে পারে। মানুষের সময় লাগে এক বছর। আর নিজের স্বপ্ন ও আদর্শের ভিতের ওপর দাঁড়াতে লাগে শ্রম ও একনিষ্ঠ চেষ্টা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন বা জো বাইডেনের মতো মানুষের মধ্যে এমন দৃঢ়তা দেখা যায়। জীবন বড় বিচিত্র। আজ জীবন করোনাভাইরাসের কবলে বন্দী। মানুষ এই বন্দী জীবন চায় না। লকডাউন ভেঙে বারবার বের হয়ে এসেছে মানুষ। মানুষ বড় হয়; নিজেকে কর্ষণ করে; অর্জন করে। চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়েই একদিন মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0