default-image

বারী সিদ্দিকী। হাওর-নদী বেষ্টিত মফস্বল শহর নেত্রকোনায় জন্ম নেওয়া সংগীত আর শিল্পের বিস্ময়। বাবা মহরম আলী আর মা জিয়া-উন-নিসার মোট চার সন্তানের মধ্যে সবার ছোট বারী সিদ্দিকী। ছোট বেলা মায়ের মুখে গান শুনতেন ‘শাশুড়ির কইও গিয়া। নিজে সুরে করে গাইলে মা আদর করে বুকে টেনে নিতেন। বড় ভাইয়ের গানের দল ছিল। নানা বাজাতেন সরোদ। বড় ভাইয়ের বাঁশিতে সুর তোলা দেখে নিজের আগ্রহ জাগে। মায়ের মুখে শোনা বাঁশি নিয়ে গানের শুরুর লাইন ‘আষ্ট আঙুল বাঁশের বাঁশি মধ্যে মধ্যে ছ্যাদা/নাম ধরিয়া ডাকে বাঁশি/কলঙ্কিনী রাধা। কিশোর বেলায় সংগীতে হাতে খড়ি নেন দেশের প্রখ্যাত ওস্তাদ শ্রী গোপাল দত্তের কাছে। এ ছাড়া গানের দলের দুই বড় ভাই এবং হজরত আলী, বিপুল চৌধুরী, দুলাল দত্তনবীসের কাছ থেকেও সংগীত শিক্ষায় প্রচুর সহযোগিতা পান। দুটি সাধনার মধ্যে বাঁশির প্রতি আগ্রহ ছিল তুলনামূলক বেশি।

মায়ের আগ্রহ ছিল তিনি যেন উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখেন এবং তা বাঁশিতে রূপান্তর করেন। ১৯৮০ সালে ঢাকা আসেন বড় আশা নিয়ে। বাঁশির তালিম নেন পেশায় পাইলট ও ওস্তাদ আমিনুর রহমানের কাছে। তিনি ছিলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বংশীবাদক ওস্তাদ পান্না লাল ঘোষের শিষ্য। বাংলাদেশের এক সময়ের সেরা বংশীবাদক ও ওস্তাদ আমিনুর রহমানের বাসায় থাকা অবস্থায় সান্নিধ্য পান ওস্তাদ আয়েফ আলী খান মিনকারী, ওস্তাদ ভাগল ব্রাদার্সসহ আরও অনেক গুণীদের।

বিজ্ঞাপন

বাঁশিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে বারী সিদ্দিকী ভারতের পুনে যান। সেখানে পণ্ডিত ভিজি কার্নার্ডের কাছে তালিম নেন। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত দেশব্যাপী যন্ত্র সংগীত শিল্পীদের এক প্রতিযোগিতায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে সংগীত বোদ্ধাদের নজরে আসেন। এরপর অনেক সফলতা ক্রমে আসতে থাকে তাঁর ঝুলিতে। ঘটনাক্রমে সাক্ষাৎ হয় বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হ‌ুমায়ূন আহমেদের (১৩ নভেম্বর, ১৯৪৮ —১৯ জুলাই, ২০১২) সঙ্গে। বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম তিনি। তাঁকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শ্রেষ্ঠ লেখক বলে গণ্য করা হয়। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। বলা হয়, আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের তিনি পথিকৃৎ। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসাবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দুই শতাধিক। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক।

গল্পকারের এক জন্মদিনে আমন্ত্রণ জানানো হলো বাঁশি বাজানোর জন্য। তাঁর অনুরোধে আবার গাইলেন গান। শুরু হলো আরেক অধ্যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যাকে আমরা বিটিভি হিসেবে চিনি, তাতে সৃজন নামের এক অনুষ্ঠানে বাঁশি বাজান বারী সিদ্দিকী। পরে ১৯৯৫ সালে বিটিভির রঙের বাড়ই অনুষ্ঠানে গাইলেন গান। তারপরই হুমায়ূন আহমদের ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে গান গাইলেন। ছবির গানটি প্রচুর জনপ্রিয়তা পায়। এর পরপরই বাজারে এল দুটো জনপ্রিয় অ্যালবাম। সব মিলিয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে তখন শিল্পী বারী সিদ্দিকী। বিশাল এ প্রাপ্তির জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানালেন লেখক ও পরিচালক হুমায়ূন আহমদকে।

একজন বংশীবাদক হিসাবে বারী সিদ্দিকী প্রথম বিদেশ গেলেন ১৯৯৯ সালে, গন্তব্য ফ্রান্সে। সেখানে সারা বিশ্বের নামীদামি বংশীবাদকদের উপস্থিতিতে বাঁশি বাজিয়ে যেমন নাম করলেন, তেমনি দেশের জন্য সুনামও বয়ে আনলেন। শিল্পী দুটি সিনেমায় অভিনয়ও করেন, যার একটি ‘মাটির পিঞ্জিরা’, অন্যটি ফেরারি অমিতের নির্দেশনায় ‘পাগলা ঘোড়া’। দুটি সিনেমায় অভিনয় ছিল নিতান্ত শখের বশে।

১৯৮৬ সালে বিয়ে করেন ফরিদা ইয়াসমিনকে। বারী সিদ্দিকীর সংগীত জীবনের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসাবে কয়েক দশক পর লোক বাংলার আরেক মরমি শিল্পী ও বাউল উকিল মুনশির বিখ্যাত সব কয়টি গান গাইলেন অসম্ভব দরদ দিয়ে। গানটি গাইবার আগে সব জায়গায় বলতেন বিখ্যাত সে গান রচিত হওয়ার পটভূমি।

শিল্পীর ভাষায় প্রতিটি গানের জন্ম হয় প্রাকৃতিক পোশাকে আবৃত হয়ে। প্রথম পোশাক পরিয়ে দেন সুরকার। সব শেষে একজন শিল্পী তার সব মেধা আর কণ্ঠের জাদু ঢেলে গানটিকে কোটি শ্রোতার হৃদয়ে স্থায়ী আসন দেন। উদাহরণ হিসাবে বাউল উকিল মুনশির গান রচনার গল্প বলতেন। গায়ক উকিল মুনশির রচিত সেরা বিচ্ছেদ গান—‘সুয়া চাঁন পাখি’! যা আজও লাখো শ্রোতার চোখের জল ঝরায় বিরতিহীন।

বিজ্ঞাপন

বারী সিদ্দিকীর এটা একটা মহৎ গুন ছিল, তার প্রিয় গীতিকারদের তিনি অসম্ভব সম্মান করতেন। মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতেন। যার স্নেহধন্য ছোঁয়া আমি ভাগ্য গুনে পেয়েছি। আমার রচিত গান নিয়ে প্রথম অ্যালবাম ‘মায়ার স্বপন’ অ্যালবাম আত্মপ্রকাশ হলো ২০১৬ সালে। তারও অনেক বছর আগে শিল্পীর সঙ্গে একবার দেখা হয় সিলেটে। এরপর আলাপ হতো নিয়মিত। আমার লেখা ‘ভবের জগৎ’ শিরোনামের গানটি গাইতে অনুরোধ করলাম। শরীর ভালো যাচ্ছে না সে সময় শিল্পীর। এরপরও হাসতে হাসতে বলেন, আমার হাওরের পাড়ের ভাইরে না করি কেমনে! গাইমু আমি!

শরীর কেমন জানতে ফোন করতাম নিউইয়র্ক থেকে। ফোন ধরে বলতেন, হাওরের পাড়ের ভাই, বিদেশ কি খরো? ডলার কামাও? এসব বাদ দিয়ে দেশে আসো। হাওরের পাড়ে ঘর বানিয়ে তোমার ভেতরের কান্দনকে গানের সুরে বের করো। তোমার বুকে স্থায়ী একটা কান্দন আছে। আমি টের পাইছি।

তুমি কাঁদবে আর আমি গাইব! অপেক্ষায় হাডসনের পাড়ে বসে আজও কাঁদি গুরু! তুমি গাইবে না? কবে গাইবে?

মন্তব্য পড়ুন 0