default-image

সময়ের ব্যবধানে একসময় অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। এ হারানোয় বেদনার সুর আছে। সুর শাশ্বত, চিরকালীন। এমনিভাবে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় এক সময়ের অপরিহার্য বিষয় ও ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। বিলুপ্ত হয়। তেমনি একটি বিষয় হলো কলের গান। আধুনিক সিডি ও মেমোরির আয়োজনে চাপা পড়েছে গ্রামোফোন বা কলের গান। ষাটের দশকের প্রথম দিকে বিলেতপ্রবাসী আমার এক চাচাতো ভাই অনেক দিন প্রবাসে কাটিয়ে দেশে এলেন। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন একটা কলের গান। সুন্দর একটি কাঠের বাক্স গাঢ় নিল রেক্সিনের কাপড় দিয়ে মোড়ানো। যখন এটি বাজানো হতো পাড়ার আবালবৃদ্ধ সবাই একসঙ্গে হুমড়ি খেয়ে পড়ত। এর আগে এই যন্ত্রটিকে কেউ দেখিনি কি না, তাই। আজব এই বাক্স যার মধ্যে গোলাকার একটি বস্তুর ওপর মাটির তৈরি চাকতির মধ্যে পিনযুক্ত একটি সর্পিল আকারে রোলার বসালেই গান বাজতে শুরু করত।

তবে বাক্সটির এক পাশে একটি হ্যান্ডেল ঘোরালে ভেতরে একটা স্প্রিংয়ে দম দিতে হতো। অনেকটা প্রাচীন ঘড়ির চাবির মতো। কলের গানটা যখন কার্যক্রম বন্ধ হতো, তখন আমরা কৌতূহলী কিশোর মিলে বাক্সটির আনাচকানাচে খুঁজে দেখতাম, এত সুন্দর গানের সুর কীভাবে বেরিয়ে আসে।

বর্ষাকালে বাড়ির পাশের খালে ছইওয়ালা নৌকায় কলের গান বসিয়ে বড়দের সঙ্গে ভ্রমণে বের হতাম। কলের গানে রেকর্ড বাজতো আব্বাস উদ্দিনের ভাওয়াইয়া, নিনা হামিদের পল্লিগীতি কিংবা আবদুল আলিমের গান। পুরো গ্রাম প্রদক্ষিণ শেষে বাড়ি ফিরতাম। কিশোর যুবক, তরুণীরা যার যার বাড়ির আঙিনায় ভিড় জমাতো গান শুনতে। গৃহস্থ বাড়িতে কোনো আচার–অনুষ্ঠানে ডাক পড়ত কলের গানের মালিকের।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে কলের গানের সঙ্গে মাইকের সংযোগ ঘটিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে কিংবা পূজার প্যান্ডেলে বিনোদনের ব্যবস্থা করা হতো। তখন এই কলের গানের কদর হয়ে গেল ব্যবসার মাধ্যম হিসেবে। সংস্কৃতির ধারাও পরিবর্তন হতে লাগল। প্রচলন হলো ভারতীয় চটুল হিন্দি গানের। সেই সঙ্গে বাংলা বিচ্ছেদ গানও যোগ হলো। যেমন বিয়ের কনে বিদায়ে গান বাজতো, বাপের বাড়ি ছাইরা কন্যা শ্বশুর বাড়ি যায়, বারে বারে ঘুরে কন্যা পেছন ফিরে চায়। এ সব গানে কন্যা পক্ষের বিরহ দ্বিগুণ বেড়ে যেত।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি কলের গান মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকের ঘরেই শোভা পেত। তখন এ যন্ত্র কিছুটা মোডিফাই করে বাক্সের ভেতরে জুড়ে দেওয়া হতো। ষাটের দশকে বেতারে গান প্রচারের সময় ঘোষক বলতেন, এখন গ্রামোফোন রেকর্ডের গান প্রচারিত হবে। এতেই বোঝা যায়, কলের গানে কতটুকু দখল করেছিল মানুষের মন। আমার বড় ভাই বিলেত প্রবাসী যখন দেশে এলেন, নিয়ে এলেন একটি গ্রামোফোন বা কলের গান। তখন এই যন্ত্রটি বেশ উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে আকর্ষণীয় ছিল। ব্যাটারির সাহায্যে যন্ত্রটিতে রেকর্ডের গতি নির্ধারিত ছিল। এরপরেই হ্যান্ডেল দিয়ে ঘোরানোর যুগের সমাপ্তি ঘটল। ৭৮ আরপিএম ঘূর্ণন গতি থেকে ৩৩ আরপিএম ঘূর্ণন গতি সেট করা হয়। ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের একটি ভাইনাল রেকর্ড ছিল। ছয়টি ছয়টি করে বারোটি গান ছিল ওই রেকর্ডে। বাকিগুলো ছিল ছোট রেকর্ড। দুটি করে উভয় পৃষ্ঠায় চারটি গান ছিল। পিন বদলানোর ঝামেলা ছিল না। সোনামুখী পিনে চলতো অনেক দিন। খুবই রিলাক্স করে যন্ত্রটি ব্যবহার করা যেত।

শব্দ সংরক্ষণের জনক টমাস আলভা এডিসন। তিনি ১৮৭৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি কাঠের বাক্সের ওপর চোঙা লাগানো এমন এক জিনিস আবিষ্কার করলেন। যার মধ্যে গোলাকৃতি এক বস্তুর ওপর পিন ঘোরালে শব্দ উৎপন্ন হয়। টমাস তার প্রিয় কবিতা, ‘মেরি হ্যাড আ লিটল ল্যাম্প’ পাঠ করে উদ্বোধন করেছিলেন এক যন্ত্রের। নাম দিয়েছিলেন, ফনোগ্রাফ। তার বছর দশেক পর জার্মানির বিজ্ঞানী বার্নিলার টিনফয়েল আধুনিক মোমের রেকর্ড বানিয়ে নাম দেন গ্রামোফোন। তারপর মাটির রেকর্ড থেকে প্লাস্টিকের সুতায় ঘূর্ণন রেকর্ড।

এডিসনের প্রিয় কুকুরকে চোঙার সামনে বসিয়ে মনোগ্রাম করে নাম দেওয়া হয় হিজ মাস্টার্স ভয়েস। সংক্ষেপে এইচএমভি। ১৮৯৮ সালে জার্মানিতে বিশ্বের প্রথম গড়ে উঠে গ্রামোফোন কোম্পানি।

১৯০২ সালে গেইসবার্গ প্রথম একজন ভারতীয় শিল্পীর গান গ্রামোফোনে রেকর্ড তৈরি করেন। এবং তিনি হচ্ছেন কলকাতার বাঙালি গওহর জান। এ রেকর্ডই তাঁকে অল্প দিনের মধ্যেই খ্যাতি এনে দেয়। এভাবেই ভারতে গ্রামোফোন রেকর্ডের এক বিশাল বাজার গড়ে উঠে। বিশ শতকের প্রথম দিকে কলকাতায় বেশ কয়েকটি গ্রামোফোন কোম্পানি গড়ে উঠে, যেমন হিজ মাস্টার্স ভয়েস (ইংল্যান্ড) কলম্বিয়া (আমেরিকা) ও পরে (ফ্রান্স)।

কলকাতা হয়ে এই যন্ত্রটি এক সময় বাংলাদেশে চলে আসে। কে প্রথম কলের গান বাংলাদেশে নিয়ে আসেন, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে ১৮৯৫ সালে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে একটি কলের গান উপহার পান।

সত্তরের দশকের প্রথমেও রেকর্ড ছিল। ছোট রেকর্ড থেকে তৈরি হতো লং প্লে রেকর্ড। গ্রামোফোনের বদলে এল ৪৫ এমপিএলের ছোট রেকর্ড প্লেয়ার। তারপর অটো রেকর্ড প্লেয়ার বা টেপ রেকর্ডার। তা ছিল ব্যাটারি ও বিদ্যুৎচালিত। আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের শেষ পর্যন্ত ছোট ফিতায় ছিল ক্যাসেট রেকর্ডার। গান শোনার ক্যাসেটের সঙ্গে চলে এল ভিডিও রেকর্ডার। তারপর শব্দ বিজ্ঞানের পালা বদল ঘটতে থাকে সুপারসনিক গতিতে। একবিংশ শতকের প্রথম দিকেও ছিল ক্যাসেট প্লেয়ার। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এল ডিজিটাল ভিডিও ডিক্স (ডিভিডি)। গান স্থির ছবি, চলমান ভিডিও ছবি সবই ডিক্সে রাখার ব্যবস্থা। বিবর্তনের পালায় এই ছোট্ট জিনিসটাও বোঝা হয়ে গেল। এখন বিজ্ঞান সবকিছু ঢুকিয়ে দিল সেল ফোনের (মোবাইল) ভেতরে। বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়।

ছবি তোলা আর ছবি দেখা এ তো এখন নস্যি। এত কিছু দৃশ্যমান বিজ্ঞানের কারুকার্যে কলের গান কি একটা যন্ত্র হলো! কিন্তু একটা কথা না বললেই নয়। কলের গানের যুগে রেকর্ড ডুপ্লিকেট হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। শিল্পীরা তাদের রয়্যালটি পাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু এখন ডিজিটাল যুগে ডুপ্লিকেট করা নস্যি। একটা থেকে দুটি, দুটি থেকে চারটি, এভাবে গাণিতিক হারে ঢালাওভাবে রেকর্ডগুলো ডুপ্লিকেট হচ্ছে। সেটা হচ্ছে একমাত্র প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে। গ্রামোফোন বা কলের গান ৮০ বছরের ইতিহাসে এক মহাগৌরব ও অসামান্য সাফল্য অর্জন করে। কলের গান আবিষ্কারের প্রথম দিকে কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর কবিতা ও গান স্বকণ্ঠে রেকর্ড করেন। ১৯২৬ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কবি কাজী নজরুল ইসলামই ছিলেন কলের গানের প্রধান গীত রচয়িতা, সুর স্রষ্টা ও সংগীতের প্রশিক্ষক।

এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনাই ছিল একমাত্র বিনোদনের সেরা মাধ্যম। সমাজের শিক্ষিতজনেরা গ্রামোফোন বলে আখ্যায়িত করলেও আমজনতা কলের গানেই ঋদ্ধ হতেন। এখন শুধু স্মৃতির বেদনা হয়ে আছে কলের গান। নতুন প্রজন্ম গ্রামোফোন বা কলের গান আর চিনবে না। বাংলার ঘরে ঘরে কলের গান আর কখনো বাজবে না। গ্রামোফোন বা কলের গান হারিয়ে গেল বিস্তৃতির অতল গহ্বরে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0