default-image

পৃথিবী আজ কোভিড-১৯ এর ছোবলে ন্যুব্জ। অথচ এ রকমই একটি ভাইরাস প্রায় ১০০ বছরে আগে পৃথিবীকে একই রকম বিপর্যয়ে ফেলেছিল। তার নাম স্প্যানিশ ফ্লু। পৃথিবীর মানুষের কাছে সেই ভাইরাস কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছিল তার উদাহরণ থাকলেও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় কীভাবে ব্যর্থ হলো তা ভাবতে অবাক লাগে। ১০০ বছর আগে পত্রিকাগুলো ঘাঁটলে দেখা যায়, তখনো স্কুল, কলেজ, উপাসনালয়, ব্যবসা, অফিস সব বন্ধ করা হয়েছিল। মাস্ক পরতে বলা হয়েছিল। হাত ধোয়ারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

১৯১৮ সালের বসন্তে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মানবসৃষ্ট ভয়াবহতা চলছিল। ঠিক সেই সময় প্রকৃতিতে মারাত্মক এই ইনফ্লুয়েঞ্জার ধরনটি দেখা দিয়েছিল। পরের ১৮ মাসে বিশ্বব্যাপী এই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ। এর মধ্যে আনুমানিক ২ থেকে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল। মহামারির গ্রাসটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে গ্রিনল্যান্ড এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্তদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন ছিলেন। তিনি ১৯১৯ সালের শুরুর দিকে ভার্সাই চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ফ্রান্স গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টও আক্রান্ত হয়েছিলেন। আক্রান্ত হয়েছিলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ। আর কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারা বলিভিয়া, গুয়াতেমালা ও হন্ডুরাসের প্রেসিডেন্ট এবং আর্মেনিয়া ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীও কোভিড পজিটিভ হয়েছিলেন।

যদিও স্প্যানিশ ফ্লু ভাইরাসটির উৎস জানা যায়নি, তবে এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেনা চলাচল এবং সামরিক শিবিরে বসবাসের পরিবেশের কারণে ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছিল। সামরিক দুর্বলতা হিসেবে দেখা হতে পারে—এই ভাবনায় সরকারগুলো এই ফ্লুর তীব্রতার বিষয়ে রিপোর্ট করতে ধীরে চলা নীতি গ্রহণ করেছিল।

বিজ্ঞাপন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় স্পেন ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরপেক্ষ ছিল। তখন মিত্র ও কেন্দ্রীয় শক্তি দেশগুলোতে যুদ্ধকালীন সেন্সর থাকায় সৈন্যদের মনোবলকে প্রভাবিত করতে পারে এই আশঙ্কায় ফ্লুর সংবাদ চাপা দিয়েছিল। একমাত্র স্প্যানিশ মিডিয়া এই বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন করেছিল। যেহেতু মিডিয়া ব্ল্যাক-আউটের মধ্য দিয়ে যাওয়া দেশগুলো কেবল স্প্যানিশ সংবাদ উৎস থেকে মহামারির সংবাদ পাচ্ছিল, এ কারণেই ভাইরাসটি ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

স্প্যানিশ ফ্লু স্পেনে উদ্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা কম হলেও বিজ্ঞানীরা এখনো এর উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত নন। ফ্রান্স, চীন এবং ব্রিটেনকেই ভাইরাসটির সম্ভাব্য জন্মস্থান হিসেবে মনে করা হয়। ভাইরাসটির কথা যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের একটি সামরিক ঘাঁটিতে প্রথম জানা যায় ১৯১৮ সালের ১১ মার্চ।

পৃথিবীতে মহামারি স্প্যানিশ ফ্লুর চারটি ঢেউ এসেছিল। হালকাভাবে প্রথমটি এসেছিল ১৯১৮-এর বসন্তে। এ সময় লক্ষণগুলোর মধ্যে ঠান্ডা, জ্বর ও ক্লান্তি। তবে আক্রান্তরা তুলনামূলকভাবে দ্রুত সেরে উঠেছিল। এরপর ভাইরাসটি নাটকীয় মোড় নেয়। ভয়ংকর হয়ে আসে দ্বিতীয় ঢেউ। বিশেষত ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সী যারা এবার এই ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের ফুসফুস তরল দিয়ে ভরে যায়। লক্ষণ প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে আক্রান্তদের মৃত্যু হয়েছে। তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানে শীতে। ১৯১৯ সালের বসন্তের মধ্যে ভাইরাসটি একইভাবে বিস্তার লাভ করে। ১৯২০ সালের বসন্তে চতুর্থ ঢেউ নিউইয়র্ক সিটি, সুইজারল্যান্ড, স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং কিছু দক্ষিণ আমেরিকান দ্বীপপুঞ্জসহ বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে দেখা দেয়।

নিউইয়র্ক নগরীতে ১৯১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯২০ সালের মধ্য এপ্রিলের মধ্যে ৩ হাজার ৭৪৮ জনের মৃত্যু হয়। ১৯১৮ সালেও সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়া রোধে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করার ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও এগুলোতে সাধারণত ইনফ্লুয়েঞ্জা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ কারণে এই ফ্লুর জন্য ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়ে যায়। আইসল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকান সামোয়া দ্বীপগুলোতে সামুদ্রিক কোয়ারেন্টিন ঘোষিত হয়েছিল, এতে অনেকের জীবন বাঁচানো গিয়েছিল। সামাজিক দূরত্বের মেনে চলার নিয়মও চালু করা হয়েছিল। উদাহরণ হিসেবে স্কুল, থিয়েটার এবং উপাসনালয় বন্ধ করা, গণপরিবহন সীমাবদ্ধ করা এবং জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়।

নিউইয়র্ক নগরীর স্বাস্থ্য কমিশনার সাবওয়েতে জনাকীর্ণতা এড়াতে ব্যবসাগুলো বিভিন্ন শিফটে খুলতে এবং অনেকগুলো বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। জাপানের মতো কিছু জায়গায় মুখে মাস্ক পরার বিধান করা হয়েছিল। যদিও এর কার্যকারিতা নিয়ে সে সময় বিতর্ক ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে কোভিড-১৯ এ মাস্ক পরা নিয়ে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তখনো সেই বিতর্ক ছিল। উদাহরণ হিসেবে সান ফ্রান্সিসকো অ্যান্টি-মাস্ক লিগের কথা বলা যায়। পরে টিকা আবিষ্কার হয়। তবে টিকা ব্যাকটেরিয়ার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ায় তা ভাইরাস রোধে অতটা কার্যকরী নয়। এগুলো কেবল গৌণ সংক্রমণ রোধে সহায়তা করে। পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, যথাসময়ে জনসমাগম নিষিদ্ধ করা এবং মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে পারলে মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হতো।

সে সময় যুদ্ধ শেষে সৈন্যরা দেশে ফিরে আসছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁরা অনেক দিন পর প্রিয়জনদের কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে চুম্বন করছিলেন। এ কারণে নিউইয়র্ক নগরীর স্বাস্থ্য বিভাগ স্প্যানিশ ফ্লু ঠেকাতে রুমালের ওপর দিয়ে চুম্বন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন