বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ এশিয়ার নারী আন্দোলনের এই অন্যতম পুরোধা লেখক ও কবি কমলা ভাসিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। গত ২৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সময় বেলা পৌনে তিনটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুতে তেমন সাড়া পড়েনি ভারতীয় এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রীয় কিংবা বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে কিংবা গণমাধ্যমের অন্যান্য শাখায়। মৃত্যুতে শোক বার্তা পাঠাননি ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক দলের কর্ণধারেরা। তবে কমলা ভাসিনের জন্য নীরবে চোখের জল ফেলেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লাখো মানবাধিকার ও নারী অধিকার কর্মীরা।

ভারতের রাজস্থান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করে পশ্চিম জার্মানির মুনস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন কমলা ভাসিন। জার্মানির ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট ওরিয়েন্টেশন কেন্দ্রে বেশ কিছুদিন কাজ করে কমলা ভাসিন নিজ দেশে ফিরে আসেন। বাকি জীবনটা তিনি কাটান দেশের প্রান্তিক নারীদের অধিকারের কথা বলে। গত শতাব্দীর ৭০-এর দশক থেকে ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সোচ্চার ছিলেন কমলা ভাসিন।

দক্ষিণ এশিয়ার নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় লড়াইরত একাধিক সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন কমলা ভাসিন। এসব সংগঠনের অন্যতম হচ্ছে সাউথ এশিয়া নেটওয়ার্ক অব জেন্ডার অ্যাকটিভিস্ট অ্যান্ড ট্রেনার্স বা সংক্ষেপে ‘সংগত’। এটি এখন দক্ষিণ এশিয়ায় নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রভাবে ভূমিকা পালন করছে। ২০০২ সালে নারীবাদী নেটওয়ার্ক ‘‘সংগত’’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা গ্রামীণ এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সুবিধাবঞ্চিত নারীদের সঙ্গে কাজ করে।

কমলা ভাসিনের সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন আন্দোলনে যুক্ত নেতৃস্থানীয় সংগঠন ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। কমলা ভাসিন প্রথম বাংলাদেশ আসেন ১৯৭৬ সালে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আমন্ত্রণে। তিনি গণস্বাস্থ্যের সঙ্গে ১৯৭৬ সালে গ্রামীণ জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করেন। কমলা ভাসিনের চিন্তা, দর্শন এবং কর্মে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর উন্নয়ন দর্শনের ব্যাপক প্রভাব ছিল। এ ছাড়া সত্তরের দশক থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব স্যার ফজলে হাসান আবেদ ও ব্র্যাকের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি বৃহৎ উন্নয়ন সংগঠনের কর্মীদের সঙ্গে তাঁর গভীর ও আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।

বাংলাদেশের নারী অধিকার আন্দোলনে কমলা ভাসিনের সবচেয়ে বড় অবদান কী ছিল? তিনি সারা বাংলাদেশে হাজারো উন্নয়নকর্মীর মনের ভেতরে নারী-পুরুষ সম-অধিকারের প্রদীপ জ্বালিয়ে দেওয়ার কাজটি সফলভাবে করতে পেরেছিলেন। তাঁর কর্মের প্রভাব যুগপৎ দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য। বাংলাদেশের উন্নয়ন কর্মীরা সর্বপ্রথম জেন্ডার বিষয়টি যে সমাজের চাপিয়ে দেওয়া নারী-পুরুষের বিভেদ, এ কথাটি স্পষ্টভাবে শুনতে পান তাঁর মুখ থেকে। নারী-পুরুষের গঠনের পার্থক্য যে নিতান্ত প্রাকৃতিক এবং গঠনগত পার্থক্য যে নারীর সম্ভাবনা ও অবদানে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না—এ কথাটি তিনি সব পর্যায়ের কর্মীদের বুঝিয়ে বলতেন। আশির দশকের ঘোর অন্ধকার সময়ে কমলা ভাসিন সমাজের পশ্চাৎপদ চিন্তার জট খুলে দিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। সারা বিশ্বে নারী-পুরুষের ওপর সমাজের চাপিয়ে দেওয়া বিভেদ নিয়ে জেন্ডার সেনসেটাইজিংয়ের আলোচনাকে উসকে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে গেছেন কমলা ভাসিন আমৃত্যু।

কমলা ভাসিন চমৎকার করে ব্যাখ্যার মাধ্যমে সেক্স আর জেন্ডারের পার্থক্য তুলে ধরতেন। সেক্স বা প্রাকৃতিক লিঙ্গ নির্ধারিত থাকে, এটি শারীরবৃত্তীয়। আমরা জন্মের সময়েই এই তফাৎ নিয়ে জন্মাই। এই তফাৎ কোনো বিভেদ নয়, এটি প্রকৃতির বৈচিত্র্য। কিন্তু জেন্ডার বা সমাজ নির্ধারিত লৈঙ্গিক ধারণা সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে। নারী সন্তান ধারণ করবে, সন্তানকে দুধ খাওয়াবে, এ ছাড়া নারী-পুরুষের সৃষ্টিতে আর কোনো তফাৎ করা হয়নি। নবজাতকের ভেজা কাঁথা ধোয়া হোক আর উড়োজাহাজ চালনাই হোক, নারী-পুরুষ উভয়েই সব করতে সক্ষম। সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা নিয়ে জন্মানো শরীরটা নারীর, এ তাঁর প্রাকৃতিক লিঙ্গ। আর তাঁর জামার ওপর ছড়িয়ে রাখা ওড়নাটা হলো জেন্ডার। যে ওড়নাটা সমাজ তার গায়ে বসিয়ে দিয়েছে। গায়ে বসিয়েই সমাজ ক্ষান্ত হয়নি, তাকে অন্ধকার ঘরে বন্দী করতে সমাজ সর্বক্ষণ উদ্ধত।

কমলা ভাসিন ব্যক্তিগত আলোচনা, ঘরোয়া আড্ডা, কর্মশালা অথবা বক্তৃতা সভায় সবার ভুল ভাঙিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দিতেন, নারীবাদের লড়াইটা কোথায়। তাঁর সুস্পষ্ট মতামত, পুরুষতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে নারীতন্ত্রের সূচনা করা নারীবাদের লড়াইয়ের মূল কথা নয়; বরং মূল কথাটা হলো সমতার, সমতাভিত্তিক সমাজের। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সমাজ সমানভাবে দেখবে আর সমান সুযোগ দেবে—এমন সমতার পৃথিবীই চায় নারীবাদ। অর্থাৎ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পালটে ফেলে নারী-পুরুষের সমান সুযোগ সৃষ্টি করে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই নারীবাদ। অন্য অর্থে নারীকে মানুষ ভেবে মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই হলো নারীবাদী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

নারী আন্দোলনের সাম্প্রতিক বাস্তবতায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কমলা ভাসিন ২০১৬ সালে নারীর প্রতি সহিংসতাকে ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এই অবস্থার পরিবর্তনে, ভয় থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের বদলে ফেলার আহ্বান জানিয়ে ছিলেন নারীদের। তাঁর এই আহ্বান সমগ্র বিশ্বের সচেতন মানুষের নজর কাড়ে।

কমলা ভাসিন বিশ্বাস করতেন, ‘তোমার-আমার ব্যক্তিগত জীবন না বদলালে পিতৃতন্ত্র চলে যাবে না। সুতরাং আমি নিজের দিকে আঙুল রাখছি, তোমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিজের দিকে আঙুল রাখো।’ এসব কথা তিনি তাঁর লেখায়, বক্তৃতায় বারবার বলেছেন।

১৯৯৫ সালে তিনি একটি সম্মেলনে জনপ্রিয় কবিতা আজাদীর (স্বাধীনতা) একটি পরিমার্জিত, নারীবাদী সংস্করণ আবৃত্তি করেন। তিনি ওয়ান বিলিয়ন রাইজিংয়ের দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের ইতিহাস উন্মোচনে তিনি ছিলেন সরব। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়ায় নারীর বিঘ্ন ও বিপদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর অবস্থান ছিল অগ্রণী। তিনি স্বপ্ন দেখতেন নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যহীন ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ কাঠামোর। কমলা ভাসিন জেন্ডারতত্ত্ব, নারীবাদ ও পিতৃতন্ত্র নিয়ে বেশ কিছু বই লিখে গেছেন। এসব বই ৩০ টিরও বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি তাঁর লেখা বইয়ে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেন।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করা এবং সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের মূল কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর। শুধু দক্ষিণ এশিয়াতেই নয়, সমগ্র বিশ্বের পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো প্রথা, ধর্ম, ইত্যাদির নামে শোষণের প্রক্রিয়াকে চলমান রাখার জন্য পিতৃতন্ত্রকে লালন করে যাচ্ছে।

কমলা ভাসিন আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কিন্তু তাঁর জ্বালানো প্রদীপ, কিন্তু উজ্জ্বলতর হচ্ছে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অগণিত দেশে। নারীর প্রতি সহিংসতা বৈষম্য যত দিন থাকবে কমলা ভাসিনের কাজ ও আদর্শ নারী অধিকার কর্মী, মানবাধিকার কর্মীরা বহন করে নেবেন। তাঁর জ্বেলে দেওয়া প্রদীপের আলোয় আমরা এক নতুন সাম্যের সমাজ বিনির্মাণ করব। এই সমাজের ভেতরে প্রেরণা হিসেবে অগণন দিন চেতনার বহ্নিশিখা হিসেবে বেঁচে থাকবেন কমলা ভাসিন।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন