default-image

মায়েদের গল্পগুলো সব সময় অন্য রকম হয়। তাদের গল্পের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে সন্তানের জন্য অপরিসীম সুখ, মায়া-মমতা, বিসর্জন, নিখুঁত ভালোবাসা। সঙ্গে থাকে ক্ষয়ে যাওয়ার ভয়। আমরা সাধারণ মানুষযে দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখি, মায়েরা দেখেন আরও কোমল হৃদয়ে। এটিই মা।

এমনই একজন মা শাহিনা জামান। বিশ্ব অটিজম সচেতনতার মাসে ছেলেকে নিয়ে বিশেষ কোনো আয়োজন নেই তাঁর। তিনি মনে করেন, বছরের প্রতিটি দিন তাঁর সন্তানের জন্য বিশেষ দিন। বছরের নির্দিষ্ট কোনো একটা দিন বা মাসে তিনি সন্তানকে আলাদাভাবে দেখতে চান না। তিনি মনে করেন, অটিজম শিশুরা ব্যতিক্রম, তবে আলাদা নয়।

শাহিনা জামান নিউইয়র্ক সিটির স্পেশাল এডুকেশন শিক্ষা বিভাগে জড়িত প্রায় ১৬ বছর। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন ২৮ বছর ধরে। তাঁর একমাত্র সন্তান সোহান জামান (২৪) অটিজমযুক্ত।

অন্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের চেয়ে সোহানের বুদ্ধিবৃত্তি ব্যতিক্রম, তবে কম নয়। বিগত ১৪ বছর ধরে কর্মক্ষেত্রের সুবাদে শাহিনা জামানের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আমার। সোহানকে খুব কাছ থেকে দেখেছি, জেনেছি। অত্যন্ত সচেতন ও দায়িত্বশীল সন্তান সোহান।

পরিপাটি-দায়িত্বশীলতায় খুব কঠোর সোহান কখনোই ঘরের জিনিসপত্র উলটপালট দেখতে পছন্দ করে না। ফেলে রাখা চায়ের কাপ, রান্না ঘরের সিঙ্কে পড়ে থাকা থালা-বাসন, সোফার পিলো-কেইসটি খুব যত্নের সঙ্গে ধুয়ে–মুছে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতেই হবে তাকে। ঘরের দরজার পাশে রাখা জুতো জোড়া সামান্য উলট–পালট হতেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে সোহান। নিজেই নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখে। বাড়িতে মেহমান এলে সে কি আনন্দ তার! নিজ বাড়ির উঠোনের সামারের ফুল বাগানটি তার খুব পছন্দ।

সোহানের কিছু নির্দিষ্ট রুটিন ও ব্যতিক্রমী পছন্দ আছে। তার মধ্যে একটি হলো, মায়ের সঙ্গে ড্রাইভে ও রেস্টুরেন্টে যাওয়া। প্রতিদিন সন্ধ্যায় পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড়, জুতো পরে মায়ের অপেক্ষায় থাকবে, কখন মা তাকে বাইরে নিয়ে যাবে। এটা তার প্রতিদিনের সুখময় একটা সময়।

শাহিনা জামান সন্তানের পরিচর্চায় ন্যূনতম খুঁত রাখেন না। সোহানকে ভালোবাসা দিতে যেমন কার্পণ্য নেই তার, তেমনি বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার সব উপকরণ জোগান দেন তিনি। সন্তানের নীতি-নিয়ম, শৃঙ্খলায় বদ্ধপরিপক্ক তিনি।

শাহিনা জামানকে কখনো দেখিনি তার ছেলেকে নিয়ে আতঙ্কিত হতে। সব সময় ইতিবাচক মানুষটি সন্তানকে নিয়ে সুখময় সময় কাটান। এমনকি, অটিস্টিক বাচ্চাদের প্রতি তার এই মায়া-মমতা, সহনশীলতা তার কর্মক্ষেত্রেও লক্ষণীয়। স্কুলের শিক্ষক, প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে সবাই তার প্রশংসা করেন।

একজন অটিস্টিক সন্তানের মা হয়ে শাহিনা জামান নিজেকে স্রষ্টার আশীর্বাদ মনে করেন। তিনি বলেন,‘সোহান খুব যত্নশীল ও দায়িত্বশীল একটা সন্তান আমার। আমাকে খুব সাহায্য করে ঘরোয়া কাজে। যখন ডাকি, ফোন, চায়ের কাপ, ল্যাপটপ—প্রয়োজনীয় সবকিছু হাতের কাছে এনে দেয়। এমনকি আমি ঘুমাতে গেলে ছেলেটা ঘরে এসে উঁকি দিয়ে আমাকে দেখে। তারপর গায়ের ওপর কম্বলটা ছড়িয়ে দেয়। কিছুক্ষণ আমার দিকে উপুড় হয়ে তাকিয়ে থাকে, তারপর শব্দ না করে চলে যায়।’

বিজ্ঞাপন

শাহিনা আরও বলেন, ‘সোহান আমার বুকের ভেতর থাকে সারাক্ষণ। কাজ থেকে ফিরতেই রোজ দেখি ছেলেটা জানালায় উঁকি দিয়ে আছে, কখন মা আসবে সে অপেক্ষায়। সে যে কি তাড়া! কাজ শেষে উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকি কখন বাড়ি ফিরব। ভাবি, ছেলেটা জানালায় আমার জন্য অপেক্ষায়।’

অটিজম একটি স্নায়বিক বিকাশ সংক্রান্ত রোগ যাতে সাধারণত শিশুর সামাজিক বিকলতা, কথা বলার প্রতিবন্ধকতা, এবং সীমাবদ্ধ, পুনরাবৃত্তিমূলক এবং একই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করা যায়। এটি কোনো ভয়ংকর বা জীবননাশক রোগ নয়, বরং সচেতনতার সঙ্গে সহজভাবেই আমরা এটিকে গ্রহণ করতে পারি। অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ব্যক্তিদের চেয়েও সাফল্য অর্জন করে থাকেন। তাদের অনেকেই শিক্ষার ক্ষেত্রে দুর্বল হলেও ছবি আঁকায়, গানে, গণিতে বাক্‌কম্পিউটারে খুবই দক্ষ থাকে। আচরণগত সমস্যাগুলো অটিস্টিক বাচ্চার সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে ব্যালেন্স করা যায়।

অটিজমযুক্ত শিশুর পরিচর্যায় শাহিনা জামান মনে করেন, তাদের রুটিনে রাখা ও শিক্ষার বিষয়ে বিষয়বস্তুর পুনরাবৃত্তি করা খুব জরুরি। নয়তো তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘অটিজম অক্ষমতা নয়, বরং এক ধরনের সক্ষমতা।’

অটিজম শিশুদের আলাদাভাবে বিবেচনার বিষয়ে শাহিনা জামান দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘অটিজম শিশুদের বাড়তি যত্নের প্রয়োজন আছে। তবে তাদের পরিবার-সমাজে কোনোভাবেই পৃথক করাতে আমি বিশ্বাস করি না। প্রতিটি সাধারণ শিশুর মতোই তাদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। যেখানে অটিজম শিশুর আচরণগত সমস্যার কারণে আমাদের আতঙ্কিত হতে হবে, সে পরিবেশ ও অবস্থান আমাদের পরিহার করে চলা দরকার।’

প্রতি বছরের এপ্রিল মাস হলো অটিজম সচেতনতার মাস। এই মাসে অটিজমে আক্রান্ত শিশু ও ব্যক্তিদের বুঝতে ও বিশ্বজুড়ে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধিতে পুরো মাসে নানা ইভেন্ট ও শিক্ষামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পুরো মাসে চলে অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়াস।

শাহিনা জামান বলেন, ‘আসুন, আমরা সবাই মিলে বিশ্বব্যাপী অটিজম সচেতনতা বৃদ্ধি করি। কারণ, এতে সবার জন্য একজন শিশু বা ব্যক্তির অটিজম সংযুক্ত সমস্যা বুঝতে সুবিধা হবে এবং এই অটিজমকে মেনে নিতে কেউ ভীত হবেন না।’

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন