default-image

গ্রীষ্মকাল এসে যাচ্ছে। তাই কয়েক দিন আগে নার্সারিতে কিছু গাছ কিনতে গেছি। হঠাৎ চোখে পড়ল একটা পরিবার। মা-বাবার সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের পিঠাপিঠি চার শিশু সন্তান। হয়তো সবচেয়ে বড়জনের বয়স আট বা নয়। এরা একেকটা গাছ দেখে আর ছুটোছুটি করে বাবা, মাকে এনে দেখায়। বুঝলাম, পারিবারিকভাবে গাছ বাছাই চলছে। ওদের বাবা, মা একেকটা বাচ্চাকে একেকটা গাছের মালিক করে দেবে। সামারের দীর্ঘ ছুটিতে এই মহামারির দুর্যোগে বাচ্চারা যেন ঘরে বন্দী হয়ে বিরক্ত না হয়ে যায়, তাই এই ব্যবস্থা। ওরা গভীর আগ্রহ নিয়ে গাছের পরিচর্যা করবে। প্রতিদিন একটু একটু করে গাছের বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য এগুলো দেখবে। ফুল আসলে উত্তেজিত হবে। পাতা মরে গেলে মন খারাপ করবে। এই সব কিছু মিলিয়ে ওরা বেশ প্রাণবন্ত একটা জীবন কাটাবে। সেই সঙ্গে কোন প্রাণের যত্ন নিতে হয় কীভাবে, কোন কাজ নিয়মিত রুটিনে করতে হয় কীভাবে, দায়িত্ববোধ এগুলোও শিখবে। বাবা-মা ওদের কাজ দেখিয়ে দেবে। এতে বাবা-মায়ের সঙ্গেও ওদের সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হবে। আমি আমার ছেলে-মেয়ের স্কুলে দেখেছি ওদের ক্লাসের পাশে এক চিলতে বাগান থাকত। পুরো ক্লাস সেই বাগানে কাজ করত। পরে আমার ক্যাডেট কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী স্বামীর কাছেও শুনেছি, ওদেরও নাকি এমন থাকত।

আমাদের সন্তানেরা কোনো পশু, পাখি, প্রাণী পুষতে চাইলে বেশির ভাগ বাবা-মা খুব বিরক্ত হই। কারণ এটা একটা বাড়তি ঝামেলা। কিন্তু আপনার শিশুর মানসিক গঠনে, বিকাশে এবং আপনার সঙ্গে বাচ্চার বন্ধন তৈরিতে এগুলোর ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় আমাদের বাসায় মাছ পুষতাম আমরা তিন ভাই-বোন। পড়ালেখার চাপ থেকে মানসিক মুক্তির এটা একটা উৎকৃষ্ট পথ। খেয়াল রাখতে হবে যে, পোষা প্রাণীর দেখাশোনা করার, অর্থাৎ নিয়মিত খাওয়া দেওয়া-পরিষ্কার করার দায়িত্বটা যেন বাচ্চাদের ওপর থাকে। তার বয়স এবং ক্ষমতা বুঝে সেই দায়িত্ব দিতে হবে এবং ধীরে ধীরে বাড়াতে হবে।

এই মাছগুলো যখন বড় হতো কী যে আনন্দ লাগত। ওদের পরিচর্যার জন্য আমরা তিন ভাই-বোন টিম ওয়ার্ক করতাম। তবে আসল কথা হলো, বাচ্চাদের এসব কাজে ব্যস্ত করতে হলে, নিজেদেরও আগ্রহ দেখাতে হবে। শুধু টাকা খরচ করে জিনিস কিনে দিয়ে ছেড়ে দিলেই হবে না। আরও ভালো হয় কোনো প্রাণী যেমন পাখি, বিড়াল, কুকুর পুষলে। এরা অনেক ইন্টারেকটিভ হয়, অনেকটা নিজের পরিবারের নতুন শিশুর মতো। পারিবারিক বন্ধন তৈরি করতে এদের তুলনা নেই। বেশির ভাগ শিশু, এমনকি বড় বাচ্চারাও ওদের পেলে রুমের মধ্যে গ্যাজেট নিয়ে বসে না থেকে দেখা যায় ,বাসার সবাই মিলে ওদেরকে আদর করছে, খেলছে।

বিজ্ঞাপন

আমি এ দেশে দেখেছি খুব ছোটবেলা থেকে মা-বাবা বাচ্চাদের নিয়ে একসঙ্গে সাইকেল চালায়, সাঁতার কাটে, কিছু না হলেও মাঠে খেলে। এ ক্ষেত্রে দুটি ব্যাপার ঘটে। এক বাচ্চারা খুব ছোটবেলা থেকে স্বাস্থ্য সচেতন হয়। আমাদের মতো ৪০ বছর বয়সে সুগার কোলস্টেরল বাড়লে দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় না। ছোট থেকেই এই চর্চা করার কারণে ওদের স্ট্যামিনা অনেক বেশি থাকে। বাবা-মায়েরও ছেলে মেয়ের সঙ্গে শরীর চর্চা হয়, সম্পর্ক ভালো হয়। এখানে মোটামুটি একটু বড় হলেই বাচ্চাকে জিমে নিয়ে যায়। কিশোর বয়সে এটা গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। এই বয়সে হরমনের কারণে মন অস্থির হয়। বাবা-মায়ের সঙ্গে হঠাৎ দূরত্ব তৈরি হয়। শরীর চর্চা করলে এনার্জি রিলিজ হয়, মন স্থির হয়।

যেসব বাচ্চারা খেতে ভালোবাসে, বাবা-মা তাদের নিয়ে নিত্য নতুন রান্না করতে পারেন। এক সঙ্গে নতুন রেসিপি দেখে লিস্ট করা, বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না পর্যন্ত। বাজার করার সময় যদি বাজেট ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেন, সেটা জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এক সঙ্গে করা রান্নাটা সবাই মিলে উপভোগ করলে সেটা এক বিমল আনন্দ। রান্না শেখাটাও কিন্তু জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

আমার এক বোনের কথা মনে পড়ছে। তাঁর একমাত্র ছেলেকে এই বিদেশে খুব ভালোভাবে মানুষ করেছেন। আমার ছেলে যখন সদ্য কিশোর তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা অনেকেই বাইরের পরিবেশকে ভয় পাই, নিজের মতো করে বাচ্চা গড়তে হলে তাকে নিজের ঘরেই আনন্দের কিছু দিতে হবে। জোরাজুরিতে কাজ হবে না।’ তাঁর ছেলে খেলা দেখতে খুব ভালোবাসত। পরে তাঁরা এই খেলা দেখাটাকেই এক বিরাট পারিবারিক আনন্দ বানিয়ে ফেলেছিলেন। তাঁদের বন্ধুত্ব ঈর্ষা করার মতো।

আমি নিজে এই জিনিসগুলো চারপাশ থেকে দেখে দেখে শিখেছি। অনেক কিছুই অনেক দেরি করে শিখেছি, কাজে লাগাতে পারিনি। শুধু মনে হয়, কেউ এই কথাগুলো যদি আগে বলত। তবে যতটুকু পেরেছি কাজে লাগিয়েছি। বিশেষ করে এই করোনা মহামারিতে পরিবারের সবার মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং একই সঙ্গে সময়টাকে কাজে লাগানো খুব কঠিন। এ ধরনের কিছু আইডিয়া চেষ্টা করে দেখতে পারেন। তবে মূল কথা সন্তানকে সময় দিতে হবে এবং সেটা পরিকল্পিতভাবে।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন