পরিবার

সন্তানকে কী শিক্ষা দিচ্ছেন?

বিজ্ঞাপন

উচ্চশিক্ষিত এবং দেশেও ভালো জীবন ছিল—এমন প্রবাসী মা-বাবাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় কেন প্রবাস জীবন বেছে নিয়েছেন, তাহলে উত্তরে অনেকেই বলবেন—সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য। তাদের নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য, শিক্ষার কথা ভেবে দেশের মায়া কাটিয়ে, আত্মীয়স্বজন ফেলে এই পরবাসে পড়ে আছেন তাঁরা। কিন্তু দুঃখজনক হলো এই শিক্ষা বলতে তাঁরা খালি পুথিগত বিদ্যা, ভালো ফলাফল, ভালো ইউনিভার্সিটি ও সর্বশেষে ভালো বেতনের উচ্চপদের চাকরিকেই বিবেচনা করেন। এর বাইরে কিছু নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামাজিক ব্যবস্থায় পুথিগত শিক্ষা থাকলেও মানুষ হওয়ার অনেক শিক্ষাই অনুপস্থিত। এই প্রবাসে এসেও সেই দৃষ্টিভঙ্গি ও অশিক্ষা থেকে বের হতে পারি না আমরা। ছোটবেলায় স্কুলজীবনে আমি দেখেছি সহপাঠীদের মধ্যে কী ভীষণ অস্বাস্থ্যকর ও রুদ্ধশ্বাস প্রতিযোগিতা। এই মানসিকতা শিশুদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেন অভিভাবকেরা। তাঁরা ছেলেমেয়েদের মিথ্যা বলতে শেখায়, অনেক তথ্য লুকাতে শেখায়। কে কোন নোট পেল, কোথা থেকে পেল, কোন স্যারের বাসায় পড়ছে—এগুলো যেন বন্ধুদের না বলে, সে কথা বাচ্চাদের বারবার করে শেখানো হয়। মিথ্যা বলা যে একটা অন্যায়, এই বোধটাই তাদের হয় না। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ায় তারা তখন আর বিশ্বাস করে না। এসব অভিভাবকদের ঈর্ষাকাতর মন কখনো ভাবতে পারে না যে, সন্তানের সঙ্গে তার বন্ধুটিও ভালো কোথাও সুযোগ পাক। তাদের মনজুড়ে থাকে শুধু নিজের সন্তানের ভালোটা। অন্য কেউ ভালো না করুক—এই চাওয়া তাদের মনকে সব সময় বিষিয়ে রাখে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমার এক বন্ধু, যার সঙ্গে আমার তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, সে প্রায়ই পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আমাকে ভুল উত্তর বলত। প্রশ্নপত্র মেলানোর সময় যখন উত্তর মিলত না, আমি ভীষণ হতাশাগ্রস্ত হয়ে যেতাম। পরের পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে পারতাম না। বছরের পর বছর আমি এই মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছি। আজ সে কোথায়, আর আমি কোথায়। এই বিশাল পৃথিবীতে দুজনেরই জায়গা হয়েছে এবং হতো। তার জন্য এই ক্ষুদ্রতার বা এমন আচরণের কোনো দরকার ছিল না। আজও আমি মাঝেমধ্যে সেই দুঃস্বপ্ন দেখি। দুঃখজনক হলো এ ধরনের আচরণ আমি প্রবাসী বাংলাদেশি ও ভারতীয় অভিভাবক ও তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও দেখি। বন্ধুদের মধ্যে এরা প্রয়োজনীয় তথ্য লুকায়।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রবাসে শিক্ষা ব্যবস্থার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে এখানে ছোট ক্লাসে কোনো ফার্স্ট-সেকেন্ড র‍্যাঙ্কিং দেওয়া হয় না। বাচ্চাদের শেখানো হয় নিজের নিজের উন্নতি করতে। তাই তাদের মধ্যে এই নিন্দনীয়, সংকীর্ণ প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব অনুপস্থিত। কিন্তু বাঙালি, ভারতীয়, চাইনিজ মা-বাবারা জোরপূর্বক বাড়িতে বাচ্চাদের মনে শিশুকাল থেকেই এই জিনিস ঢুকিয়ে দেয়। অন্যদের ফল কেমন—এই ব্যাপারে তাদের উৎসাহের শেষ নেই। বাধ্য হয়ে মা-বাবার চাপে অনেক বাচ্চাও স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের বিরক্ত করে তাদের ফল জানতে, যাকে এখানে রীতিমতো অশোভন আচরণ বলে ভাবা হয়। অভিভাবকেরা বাচ্চাদের শেখায় ভলান্টিয়ার কাজ করতে হয়, যেন বিশ্ববিদ্যালয় আবেদনে ভালো দেখায়। মানুষের সেবার জন্য যে এই কাজ, মানবতার এই দিক নিয়ে এদের কোনো মাথা ব্যথা নেই।

মানবতার কথা আর কী-ই-বা বলব? এক অটিস্টিক বাচ্চার মায়ের আক্ষেপ শুনে মন খারাপ হয়ে গেল সেদিন। বাংলাদেশে আমরা দেখেছি বা এখনো দেখি একটু অটিস্টিক হলেই সেই বাচ্চাকে সবাই এড়িয়ে চলে। একে তো বাচ্চাকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় মা-বাবা থাকে অস্থির, তার সঙ্গে আত্মীয়স্বজনের সমালোচনা তো রয়েছে। তার ওপর যদি বাচ্চাটা একটা বন্ধু না পায়, একাকিত্বে ভোগে, তবে সেই মা-বাবা ও বাচ্চার কেমন লাগবে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিদেশে ছোট থেকেই বাচ্চাদের স্কুলে যেকোনো ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে মন উন্মুক্ত করতে শেখানো হয়। এখানে শিক্ষা ব্যবস্থার বিরাট একটা অংশ হচ্ছে মানবতা, মনের উদারতা—এসব। অথচ অভিভাবকেরা বাসায় দেন অন্য শিক্ষা। মা-বাবাকে যখন বাচ্চারা দেখে অন্যের আড়ালে সমালোচনা করতে, অন্যকে নিয়ে হাসাহাসি করতে, তখন বাচ্চাও শেখে তা। এ ঘটনাই ঘটেছে ওই শিশুটির সঙ্গে। অটিস্টিক সেই শিশুটিকে কোনো বাঙালি বাচ্চা স্কুলে কখনো সম্ভাষণ করে না। তার বন্ধু হওয়া তো দূরের কথা, তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এই ষোড়শী কিশোরীও অন্য আর দশটা কিশোরীর মতো বন্ধু চায়। একাকিত্বের কারণে সে কাঁদে মায়ের কাছে এসে।

এত উদার পরিবেশে বড় হওয়া বাচ্চারা কেন এই বিভেদের দেয়াল তুলবে? এই সব ছোট ছোট সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে যদি উঠতে না পারে, তাহলে উচ্চতর ডিগ্রি, ভালো ফলাফল, ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা পেয়ে কী লাভ? আমরা আসলে কোন শিক্ষায় শিক্ষিত করছি আমাদের সন্তানদের?

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন