default-image

প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষের মনে সজোরে আঘাত হানে যে শব্দটি, তা হলো ‘ধর্ষণ’। নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত করার সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও বর্বরতম প্রকাশ হলো ধর্ষণ। সাধারণভাবে ধর্ষণ সংজ্ঞায়িত হয়, কোনো নারীর সম্মতিহীন বলপূর্বক যৌন সঙ্গমে লিপ্ত হওয়ার প্রক্রিয়াকে। ধর্ষণ ঘটনার পশ্চাতে নারীকে দেহজ ভোগের সত্তা রূপে বিবেচনা করে বিকৃত লালসা চরিতার্থ করা ও বিকারগ্রস্ত তাড়না আবৃত মানসিকতা কাজ করে। তবে শুধু যেকোনো বয়সের নারী নন, কন্যা শিশু ও ছেলে শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের বিকৃত আচরণের ও বিভিন্ন যৌন বিকৃতির মুখে পড়তে হয়। একক বা গণধর্ষণের শিকার নারী ও শিশু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের ফলে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। নির্যাতিতা আর ধর্ষিতা নারীর পক্ষে অপেক্ষাকৃত দ্রুত কঠোর বিচার প্রক্রিয়া শুরু লক্ষ্য করা যায়।

তবে তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপমহাদেশে ও বাংলাদেশে একজন ধর্ষিতা নারীর দুঃখজনক বাস্তবতা হলো তাৎক্ষণিক ও কঠোর দৃষ্টান্তমূলক বিচারহীনতার সংস্কৃতির আড়ালে ধীরে ধীরে বিষয়টি স্তিমিত হয়ে যায়। বিচারহীনতার ভঙ্গুর সংস্কৃতিতে সঠিক প্রমাণের অভাবের ফাঁপা অজুহাতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি আড়ালে আইনের ফাঁক দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে পরিত্রাণ পেয়ে যায় বর্বর ধর্ষক, ফলস্বরূপ ধর্ষিতা নারী অথবা শিশুরা অনেকেই সঠিক বিচার পান না। এই পর্যায়ের একজন ধর্ষক মনোসামাজিক কীভাবে গড়ে উঠে, সে দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি দিকের আলোকপাত করছি।

বিজ্ঞাপন

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাংলাদেশের ধর্ষণের প্রেক্ষাপট কীভাবে সৃষ্টি হয়? কয়েকটি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে এই দিকটি সহজেই অনুমেয় হবে।

পরিবার থেকেই নেতিবাচক পুরুষকেন্দ্রিক আধিপত্যবাদের শিক্ষা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ধর্ষণের প্রেক্ষাপটের বীজ বপন করে ছেলে সন্তানটিকে অধিক প্রাধান্য আর কন্যা সন্তানকে যথেষ্ট মেধাসম্পন্ন হলেও সন্তানকে মৌখিক, শারীরিক নানা রকম হেনস্তা শিকার হতে হয়। বেড়ে ওঠার প্রতিটি স্তরে পুরুষটি অবধারিতভাবে একপেশে আধিপত্যবাদ দ্বারা পরিপুষ্ট হয়। নারী-কন্যা-শিশুর অবস্থান ও অবদান অধিকাংশ পরিবারেই অনুচ্চারিত থেকে যায়। কোমলমতি নিষ্পাপ শিশুকে জানানো হয়, ছেলে বংশের বাতি, ছেলে সন্তান নিরাপত্তার বাহক ইত্যাদি। প্রতিনিয়ত এই চর্চা অজান্তেই বৈষম্যের শিক্ষা লালিত করে। একটি ছেলে গৃহঅভ্যন্তরে দেখে, তাঁর মা নিত্য কটূক্তি বা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন তার বাবা, শ্বশুর, প্রতিবেশী বা বাড়ি সদস্যদের কাছে ও কর্মক্ষেত্রে। পাশাপাশি তাঁর বোনটি বিবাহ-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী জীবনে প্রতিদিন বৈষম্যের শিকার হয়ে বেড়ে উঠছে। নীরবতার সংস্কৃতির বলয়ে নারীকে শেখানো হয় ‘ভালো মেয়ে’ হওয়ার পূর্বশর্ত হলো, মুখ বুজে নিপীড়ন-অনাচার সহ্য করা। অধিকাংশ পরিবারেই শুধু পুরুষ সদস্য নয়, নারী-পুরুষ উভয়েই পরিবারের মেয়েটির প্রতি পরোক্ষভাবে দুর্বল, হীন আচরণ ধারণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

ক্রমান্বয়ে এই আচরণগুলো নারীর জন্য আত্মমর্যাদাহীন নড়বড়ে এক মনোসামাজিক প্রেক্ষাপট তৈরি করে। নারী একজন স্বতন্ত্র বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ। দার্শনিক ও চিন্তাবিদ সিমোন ডি বোভোয়ারের মতে, ‘Man is defined as a human being and woman as a female-whenever she behaves as a human being she is said to imitate the male. ‘নারীকে কেবল নারী রূপে আর পুরুষকে পরিপূর্ণ একজন মানুষ রূপে বিশ্বাস করা হয়। নারী কেবল একক নারী সত্তার আলোকে উপস্থাপিত হন আর তাঁর পূর্ণ মানবিক বিকাশের যেকোনো প্রয়াসে পুরুষকে অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়।’

তবে উন্নয়নশীল সমাজে নারীর প্রতি অমানবিক বৈরী পরিবেশ সত্ত্বেও স্বল্পসংখ্যক নারী মাথা উঁচু করে অগ্রসর হয়। একজন নারী যখন গঠনমূলক বা সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রে তাঁর মেধা ও মননের পূর্ণ বিকাশ ঘটান, সেটি তাঁর স্বতন্ত্র কোনো সৃষ্টি রূপে বিবেচনা না করে দুঃখজনকভাবে সে ক্ষেত্রে যেকোনোভাবে তাঁর পুরুষ সঙ্গীর ভূমিকা খোঁজা হয়। সমাজের একপেশে মনোভাবে ক্ষেত্রবিশেষে নারী নিরুপায় হয়ে অথবা সদিচ্ছায় অন্যায়, নীতিবিবর্জিত অবস্থার সঙ্গে আপস করে। আর এসব বিচ্ছিন্ন উদাহরণ টেনে পুরো নারী সমাজকে তাঁদের সঙ্গে তুলনা করে নানা রসালো কটূক্তি চলে।

বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত করেছেন, যা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। যখন একজন নির্যাতিতার আর্তচিৎকার সংবলিত ধর্ষণের ভিডিও আর ধর্ষকদের উন্মত্ততার উল্লাস তুলে ধরে সর্বত্রই প্রচার হয়, তা কি মানব সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয় না?

বাংলাদেশের শহর ও মফস্বল অঞ্চলে নারীদের প্রতিদিনের চলার পথে উত্ত্যক্তকারীদের যথাযথ প্রতিরোধ না করে সামাজিকভাবে তা এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর পুঁজিবাদী পুরুষকেন্দ্রিক সংকীর্ণ স্বার্থরক্ষার্থে প্রচার ও গণমাধ্যমেগুলোতে নারীকে দেহগত সৌন্দর্যের বাহক রূপে এক ধরনের লাস্যময় ভোগের পণ্যতুল্য ভাবমূর্তিতে উপস্থাপন করা হয়। এই উপস্থাপনায় নেতিবাচক ধর্ষকামী মানসিকতাকে উসকে দেওয়া হয়। সমাজে দরিদ্র শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুটির শিক্ষাহীনতা, চেতনাবোধহীন পারিপার্শ্ব নারীর প্রতি নেতিবাচক আচরণের নির্মম প্রকাশ ঘটাতে অনেক সহায়ক।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষিত পরিবারে শিক্ষার প্রভাবে নেতিবাচক ও বৈষম্যমূলক প্রকাশে আপাতদৃষ্টিতে অপেক্ষাকৃত মার্জিত হলে অন্তরালে চলে নানা নিপীড়ন-নির্যাতনের বিচিত্র চিত্র। নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোবৃত্তির অবসানে সাধারণ জনগণ ও নতুন প্রজন্মকে নিয়মিত সঠিক নীতিবোধের ও চেতনার, ধর্মের সঠিক ব্যাখ্যামূলক শিক্ষা ও নীতি দর্শন, মূল্যবোধ সম্পন্ন সঠিক বৈষম্যবিহীন নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন। সুরক্ষার প্রয়োজনে নারীকে আত্মরক্ষার শিক্ষা দিতে হবে। স্কুল পর্যায় হতে শিক্ষাদানের সব স্তরে নিয়মিতভাবে পারিবারিক ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রীয় সংগঠনে, বেসরকারি সংগঠন, প্রচারমাধ্যমে জীবনের সুস্থ মূল্যবোধ ও নৈতিকতার আলোকে নারী সদস্যকে পরিপূর্ণ চেতনা ও বোধ সম্পন্ন মানুষ রূপে ইতিবাচক ভাবমূর্তির তুলে ধরার ক্রমাগত চর্চা করতে হবে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে আইনের সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর সব সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং সমাজের সামগ্রিক সমস্যা রূপে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে তাঁদের আচরণে, গণমাধ্যমগুলো তাঁদের প্রতিদিনের প্রচারণায় সমাজ উন্নয়নকর্মী, রাজনীতিবিদেরা নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিটি ভূমিকা অবদানের প্রশ্নে ইতিবাচক কর্ম, বক্তব্য সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত করেছেন, যা সত্যি প্রশংসার দাবিদার। যখন একজন নির্যাতিতার আর্তচিৎকার সংবলিত ধর্ষণের ভিডিও আর ধর্ষকদের উন্মত্ততার উল্লাস তুলে ধরে সর্বত্রই প্রচার হয়, তা কি মানব সভ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয় না? সভ্যতার সুষম ভারসাম্য ও সঠিক স্থিতিশীলতা রক্ষার্থে কোনো নির্বোধ দানবীয় নয়, বরং প্রয়োজন একটি শুভবোধ সম্পন্ন মূল্যবোধের আদর্শে লালিত স্বাভাবিক মানবিক প্রজন্ম বিকাশই বিশেষ প্রত্যাশিত।

মন্তব্য পড়ুন 0