default-image

তখন ক্লাস নাইনের বার্ষিক পরীক্ষা শেষ। প্রায় মাসখানেক স্কুল বন্ধ। বাসা থেকেও লেখাপড়ার জন্য তেমন একটা চাপ নেই। একবার ঘর থেকে বের হলে পেটে প্রচণ্ড ক্ষুধা না লাগা পর্যন্ত ফেরার কথাই ভুলে যেতাম। কিশোর বয়সের উন্মাদনা ও উদ্ভট চিন্তা তখন একেবারে তুঙ্গে। সেই উন্মাদনা ও উদ্ভট চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় অনেক অদ্ভুত ও মজার ঘটনা। তেমনি এক মজার ঘটনা হচ্ছে শিয়াল নিধন অভিযান।

আমার বাবার চাকরির সুবাদে তখন একটা সরকারি প্রোজেক্টের আবাসিক এলাকায় থাকতাম। ওই প্রকল্পটি ছিল রঘুনন্দন পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। তাই প্রকল্প এলাকায় সব সময়ই ছিল শিয়ালের আনাগোনা। এমনকি সেখানকার বিভিন্ন ঝোপের ভেতরেই ছিল এদের বসবাস। সন্ধ্যার পর ‘হুক্কা হুয়া’ ডেকে ওরা নিজেদের অবস্থান জানান দিত। তারপর বুক চিতিয়ে মাথা উঁচিয়ে প্রকাশ্যে সারা এলাকায় ঘোরাঘুরি করত। ওই সময়ে অনেকেই বাসার বারান্দায় মুরগি পালতেন। দিনে দুপুরেই শিয়াল এসে বিভিন্নজনের মুরগি ধরে নিয়ে যেত। আর বিশেষ করে ছোটরা ও মহিলারা শিয়ালের আতঙ্কে সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বের হতে ভয় পেতেন।

বিজ্ঞাপন

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সবগুলো শিয়াল মেরে প্রকল্প এলাকা শিয়ালমুক্ত ঘোষণা করব। যে ভাবনা, সেই কাজ। সেখানে বসবাসরত প্রায় সমবয়সী ৮/৯ জন মিলে প্রথমে ‘শিয়াল নিধন অভিযান’ নামের একটি কমিটি গঠন করি। কমিটি গঠনের প্রথম দিন সন্ধ্যার পর লাঠিসোঁটা ও ইট-পাটকেল নিয়ে সবাই শিয়ালদের অভ্যর্থনা জানাতে অপেক্ষায় থাকি। যথাসময়ে ওরা ‘হুক্কা হুয়া’ ডেকে বের হয়ে আসে। আর আমরাও দলবদ্ধভাবে ওদের পেছনে ধাওয়া করি। শিয়ালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে না পারায় প্রথম দিনেই ব্যর্থ হলাম। তবে আমরাও হাল ছাড়ার পাত্র ছিলাম না।

তড়িৎ প্রকৌশল পড়ুয়া এক বড় ভাইয়ের পরামর্শে আমরা শিয়াল মারার ফাঁদ বানাই। মূলত তিনি নিজ হাতেই শিয়াল মারার ফাঁদ বানিয়েছিলেন। আর আমরা শুধু উপকরণ হিসেবে পনেরোটা আড়াই ফুট লম্বা শুকনো লাঠি, তিনটি টু-পিন প্লাগ ও কিছু তার জোগাড় করে এনে দিয়েছিলাম। ফাঁদ তৈরি হলো।

বিজ্ঞাপন

আমরা তিনজন বন্ধু বাসার পেছনে তিনটি ফাঁদ স্থাপন করি। তারপর সন্ধ্যার দিকে প্রতিটি ফাঁদের মাঝখানে একটি করে মুরগির বাচ্চা বেঁধে রেখে আসি। পরে বৈদ্যুতিক সেই ফাঁদে বিদ্যুৎ সংযোগ করি। মুরগির বাচ্চা তখন সমানে চেঁচাতে থাকে আর আমরা আড়ালে বসে শিয়ালের অপেক্ষায় থাকি। অল্প সময়ের ব্যবধানে ওরা ‘হুক্কা হুয়া’ ডেকে ফাঁদের কাছে চলে আসে। চার-পাঁচটি শিয়াল ফাঁদের চারপাশে ঘুরতে থাকে। কিন্তু মুরগির বাচ্চাকে আক্রমণের কোনো লক্ষণ নেই। যেন কেউ এদের বলে দিয়েছে, ‘সাবধান, এখানে বিপদ আছে।’ এদের গতিবিধি দেখে বুঝলাম, কেন শিয়ালকে পণ্ডিত বলা হয়। যা হোক, টানা সপ্তাহখানেক চেষ্টা করে তিনটি ফাঁদের মাধ্যমে এলাকার প্রায় অর্ধশত শিয়ালের মধ্যে মাত্র চারটি শিয়াল মেরে আমাদের ব্যর্থ অভিযানের ইতি টানা হলো। সেই ব্যর্থ অভিযানের কথা এখনো মনে পড়লে বড্ড হাসি পায়।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন