default-image

খ্যাতনামা মার্কিন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব কিংবদন্তি ল্যারি কিং ২৩ জানুয়ারি চলে গেলেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৮৭ বছর বয়সের এই খ্যাতনামা টিভি উপস্থাপক। ল্যারি কিংয়ের ফেসবুক পাতায় প্রথম তাঁর মৃত্যুর খবর জানানো হয়। চলতি মাসের প্রথমদিকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ল্যারি কিং-কে লস অ্যাঞ্জেলসের সিডার-সিনাই মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানেই মারা যান তিনি। এমন তুখোড় সাহসী সাংবাদিক পৃথিবীতে খুব বেশি জন্মায়নি।

মনে পড়ে, ঢাকায় থাকতেও খুব আগ্রহ নিয়েই ল্যারি কিংয়ের অনুষ্ঠানগুলো দেখতাম। তাঁর অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অতিথিদের নানা প্রশ্নবানে জর্জরিত করতেন না তিনি। তাঁর প্রশ্নের ধরন ছিল অনুসন্ধানী, কৌতূহলী ও শ্রদ্ধা মেশানো। তিনি অতিথিদের নিজস্ব বক্তব্য দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দিতেন। ‘দ্য ল্যারি কিং শো’–এর অতিথিদের সাক্ষাত্কারকে তিনি সহজ-সরল, অ-দ্বন্দ্বমূলক করে তুলতেন। তিনি অতিথিকে বিতর্কিত বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ না করে তাদের কথা বলার আগ্রহের বিষয়ে কথা বলতে দিতেন। অতিথিরা কথা বলার জন্য আরামদায়ক পরিবেশ পেতেন। এভাবেই ল্যারি কিং লাইভের জন্ম হয়েছিল।

নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া সদালাপী এই উপস্থাপক ১৯৭০–এর দশকে বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক মিউচুয়াল ব্রডকাস্টিং সিস্টেমে তার রেডিও অনুষ্ঠান ‘দ্য ল্যারি কিং শো’–এর মাধ্যমে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন। একটানা ২৫ বছর সিএনএনে ‘ল্যারি কিং লাইভ’ টকশোর হোস্ট ছিলেন তিনি। উপস্থাপক হিসেবে বহু রাজনীতিবিদ, ক্রীড়াবিদ, বিনোদন ব্যক্তিত্বসহ অনেক খ্যাতিমান অতিথির সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। ইউএসএ টুডেতে কলাম লিখেছেন ২০ বছরের বেশি সময় ধরে। সম্প্রতি কিং হুলু ও রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আরটিতে ‘ল্যারি কিং নাও’ নামে আরেকটি অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

৮৭ বছরের জীবনে রেডিও, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে হাজার হাজার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন ল্যারি কিং। কর্মজীবনে দুটি পিবডি ও একটি অ্যামি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। সেলিব্রিটিদের সাক্ষাৎকার নিয়ে, তাদের সঙ্গে প্রাণবন্ত আড্ডা দিয়ে একপর্যায়ে নিজেই ‘তুখোড় সেলিব্রিটি’ হয়ে উঠেছিলেন।

দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রখ্যাত এই টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের ক্যানসারসহ বহু ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০২০ সালে তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুজন পরপর মারা যান। তাদের মধ্যে একজন হৃদ্‌রোগে ও অন্যজন ফুসফুসের ক্যানসারে ভুগে মারা যান।

ল্যারি কিং ১৯৮৮ সালে ‘ল্যারি কিং কার্ডিয়াক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠান স্বল্প আয়ের লোকজন ও যাদের মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স নেই, তাদের হৃদ্‌রোগজনিত চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা করে।

সম্প্রচারের আইকন হওয়ার সুবাদে ল্যারি কিং তাঁর বহুবিবাহ এবং বিয়ে বিচ্ছেদের জন্য ব্যাপকভাবে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৩ থেকে ২০২১ সাল। ল্যারি কিংয়ের ৮৭ বছরের এই সুদীর্ঘ জীবন, তার নেওয়া চমকপ্রদ সব সাক্ষাৎকারের মতোই বর্ণাঢ্য ও আকর্ষণীয়। তিনি তাঁর ৮৭ বছর বয়সের জীবনে সাতজন নারীর সঙ্গে আট বার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তবে তাঁর জীবনের বৈবাহিক উত্থান-পতন সত্ত্বেও তিনি একজন সুখী বাবা ছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘পিতৃত্বকে কোনো কিছুই হারাতে পারে না। আমি কী পেরেছি তা দেখার জন্য পেছন ফিরে তাকালে অনুভব করি, সব মিলিয়ে আমি যে জীবন পেয়েছি, তা খুবই সমৃদ্ধ।’

ল্যারির প্রথম প্রণয় ও বিয়ে হয়েছিল ফ্রেডা মিলারের সঙ্গে। ফ্রেডা ছিলেন তাঁর হাইস্কুল জীবনের বান্ধবী। তাঁকে তিনি বিয়ে করেছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে। বিয়ের পরের বছর, তাদের বাবা-মা বিয়েতে অনুমোদন দেননি বলে বিচ্ছেদ হয়ে যায়।

‘আমি আমার স্ত্রীদের প্রতি সব সময়ই যত্নশীল ছিলাম। শন ও আমার মধ্যে বয়সের বড় একটা পার্থক্য থাকায় অবশেষে এটি একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। এ ছাড়া, শন খুব ধার্মিক মেয়ে এবং আমি ধর্মে বিশ্বাসী না হওয়ার কারণে একপর্যায়ে সমস্যা দেখা দেয়। আমরা অনেক কিছুকে পরাভূত করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের সম্পর্কে সমাপ্তি টানতে বাধ্য করে।’

ল্যারির দ্বিতীয় বিয়ে ছিল অ্যানেটে কেয়র সঙ্গে, যা টিকেছিল এক বছরেরও কম সময়। অ্যানেটের গর্ভে জন্ম নিয়েছিল ল্যারির প্রথম পুত্র সন্তান।

অ্যালেন আকিনস, এই নারীকে ল্যারি দুবার বিয়ে করেছিলেন। মিক্যি সুপ্তিন, ল্যারির কন্যা কেলি কিংয়ের মা। মিকি তাদের বিয়ের দুবছর পর ল্যারির সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ করেছিলেন।

অ্যালেনের সঙ্গে ল্যারির দ্বিতীয়বার বিচ্ছেদের পরে তিনি সহকারী প্রযোজক ও সাবেক গণিত শিক্ষক শ্যারন লেপোরকে বিয়ে করেন।

জুলি আলেক্সান্ডার একজন সফল ব্যবসায়ী নারী। ল্যারির ষষ্ঠ স্ত্রী জুলি। বিয়ের পরের বছরই জুলির সঙ্গে ল্যারির বিচ্ছেদ ঘটে।

শন সাউত্থিকের সঙ্গে ছিল ল্যারির সর্বশেষ বিয়ে। যদিও শনের সঙ্গে ল্যারির মৃত্যুর কিছু আগেই বিচ্ছেদ হয়েছিল। ২০১৯ সালে শন ও ল্যারির বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।

ল্যারি কিংয়ের জীবনে বিয়ে বিষয়টি ছিল খুব আলোচিত। ২০১০ সালে শন তাদের ছেলের বেসবল কোচ হেক্টর পেনেটের সঙ্গে সম্পর্ক জড়িয়েছেন বলে জানার পর ল্যারি তাঁর সঙ্গে বিচ্ছেদের আবেদন করেছিলেন। পেনেট পরে বিষয়টি স্বীকার করে নিলে ওই দম্পতি একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে ল্যারি এই বিচ্ছেদের কথা প্রকাশ করে বলেন, স্ত্রীদের সঙ্গে তিনি কখনো প্রতারণা করেননি। যদিও তাঁর সব স্ত্রী তাতে একমত নন।

ল্যারি কিং পিপল ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি আমার স্ত্রীদের প্রতি সব সময়ই যত্নশীল ছিলাম। শন ও আমার মধ্যে বয়সের বড় একটা পার্থক্য থাকায় অবশেষে এটি একটি ইস্যুতে পরিণত হয়েছিল। এ ছাড়া, শন খুব ধার্মিক মেয়ে এবং আমি ধর্মে বিশ্বাসী না হওয়ার কারণে একপর্যায়ে সমস্যা দেখা দেয়। আমরা অনেক কিছুকে পরাভূত করেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি আমাদের সম্পর্কে সমাপ্তি টানতে বাধ্য করে।’

ল্যারি বলেন, ‘যদিও আমি অনেকবার বিয়ে করেছি, তবে আমি বিয়ে পাগল মানুষ নই। আমি যে সময়টাতে বড় হয়ে উঠেছি, তখন কেউ লিভিং টুগেদার করত না। প্রেমে পড়লে বা কাউকে ভালোবাসলে তখন বিয়ে ছাড়া একত্র থাকার উপায় ছিল না। তাই আমি যাদের পছন্দ করেছি, ভালোবেসেছি, তাদের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে। তবে, আমি আমার ২০ বছরে যা ভালোবেসেছি, তা আমি ৩০–এ এসে পছন্দ করিনি। এবং ৩০–এ আমি যা পছন্দ করেছি, ৪০–এ এসে তা আর পছন্দ করিনি।’

মৃত্যুকালে ল্যারি কিং ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল সম্পত্তি রেখে গেছেন। মৃত্যুর সময়ও তাঁর ছিল ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। তিনি ছিলেন গণমাধ্যম জগতের সত্যিকারের লিজেন্ড।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন