default-image

‘জল পড়ে পাতা নড়ে

তাহার কথা মনে পড়ে’

কার কথা? কার কথা মনে পড়ে? সারা বাড়ি ম ম করছে ঘ্রাণে। বিরিয়ানি রান্না হচ্ছে। বেলি। না, ফুল না। একজন রমণী। বয়স অনুযায়ী প্রোঢ়া। কিন্তু, আজ যে মেহমান এসেছে, তারা যেন তার শৈশব–কৈশোর–যৌবনের দিন তার সামনে নিয়ে এসেছে। স্মৃতির পর্দা তুলে যেন সেই ধুলোমাখা শহরে ফিরে যাচ্ছে সে। অথবা সে শহরই যেন তার সামনে হাজির হয়। ধুলোভর্তি একটা শহর। কেমন যে ধুলোমাখা একটা গন্ধ। গরু–মহিষের গাড়ি ভোর হতেই ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে নানা পণ্য নিয়ে আসত। হেই হেই। হ্যাট হ্যাট।

বাওকুমটা বাতাস যেমন ঘুরে ঘুরে ফাগুনের আগমনী বার্তা শোনায়, তেমনি ফাগুনের আকাশে সূর্যতাপের সঙ্গে পলাশের রং লেগেছিল। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ত, ৩ মার্চের গোলাগুলির পরপর তাদের কেউ কেউ ফিরে এসেছিল। কেউ রাজশাহীতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় চলে যায় গোলাগুলির পর।

‘কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া

তোমারও চরণে দেবো হৃদয় খুলিয়া’

সমীর কুমার কণ্ডু। গান করত। রবীন্দ্র সংগীত। গায়কিতে একদম যেন সাগর সেন। আরও ছিল বেলি, লিলি, ডলি। তিন বোন। অপূর্ব সুন্দরী। বেলির গানের গলা খুব মিষ্টি। লিলি বেলি স্কুলের উঁচু ক্লাসে পড়ে। ডলি সিক্সে পড়ে। শহর উত্তাল করে তোলে এরা গানে কবিতায়। ছোট এক শহর। ট্রাকে মঞ্চ বানিয়ে এখানে–ওখানে গান করত ওরা সবাই। মাইক ছাড়াই গলায় জোর তুলত। হারমোনিয়াম গলায় বেঁধে ঢোলের সঙ্গে কেমন এক মায়ার বাঁধনে বাধা সবাই। ভাওয়াইয়া গানের সুরে মন মাতোয়ারা।

‘মৃত্যুর উত্তাল সমুদ্র পেরিয়ে

জীবনের তীর খুঁজে পেয়েছি’

‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেবো রে।

আমরা কজন নবীন মাঝি-হাল ধরেছি।’

ডাক্তার আজিজ সাহেবের বাসায় গানের আসর বসতো ছুটির দিন বিকেলে। সমীর কণ্ডু যখন গান করত সবাই বলতো সাগর সেন। একই পাড়ায় আসিফ নামের এক যুবকের বাসা। ফুড কন্ট্রোলারের ছেলে। কলেজে পড়ত।

আজাদ সাহেবের বাসার আশপাশে তরুণদের আনাগোনা বেশি। তবে আসিফকে দেখলে আর কেউ এদিকটা মাড়ায় না। দু–দুজন উঠতি সুন্দরী কন্যা আজাদ সাহেবের। শহরের আরেক তরুণ কিবরিয়া। কলেজে পড়ে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ শুনে সব প্রেমিক তরুণেরা কোথায় যে চলে গেল কেউ কিছু আঁচ করার আগেই। ১৯৭০/’৭১ সালে একদল তরুণ–তরুণী নীলফামারী শহরে গান গেয়ে মিছিল করে উত্তপ্ত করে রাখত। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ভাষণ রেডিওতে প্রচারের পরপর সমীর কণ্ডু গিয়ে এসডিও অফিসে উড়ানো পাকিস্তানের চাঁদ তারা পতাকায় আগুন ধরিয়ে দিল। এমনই দুর্ধর্ষ দুঃসাহসী ছেলে। যুদ্ধের ডামাডোল বাজতে না বাজতেই এই তরুণেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধে।

বিজ্ঞাপন

আজাদ সাহেবের দুই ছেলে ছাত্র ইউনিয়ন করত। ওরাও যুদ্ধে চলে গেল। তিনি যক্ষ্মা রোগী। শয্যাশায়ী। তিন মেয়ে আর স্ত্রীসহ বাসায় থেকে গেলেন। তার ছেলেরা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। এই অপরাধে বিহারিদের নজরদারিতে পড়ে গেলেন। ইতিমধ্যে শহরে পাকিস্তানি সেনারা এসে গেছে। তাদের পালানোর আর উপায় নাই।

পাকিস্তান সেনার মেজর একদিন আজাদ সাহেবের বাড়ি আসবে। খবরটা কীভাবে যেন পৌঁছে গেল আজাদ সাহেবের বাসায়। বেলি লিলিরা বাড়ি থেকে পালাল। পাশেই ছিল খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বাসা। মাঠের উল্টো দিকে। ছোট শহর। সবাই জানত, ওই বাড়ির ছেলে আসিফের সঙ্গে বেলির প্রেম। আসিফ বেলিকে মাতৃমঙ্গলের কাঠের আলমারির ভেতর লুকিয়ে রাখল। বিহারিরা মেজর সাহেবকে আসিফদের বাসায় নিয়ে আসে। কে যেন দেখিয়ে দেয়, পাশেই মাতৃমঙ্গল। পিল পিল করে বুটপরা সেনারা মাতৃমঙ্গলে ঢুকে ওদের খুঁজতে থাকে। আলমারির ভেতর নিশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে বেলি। শেষমেশ কাঠের আলমারির পাল্লা খুলে পাকিস্তানি সেনারা বের করে আনে বেলিকে। ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। পরে সেনাদের জিপ বাসায় নামিয়ে দিয়ে যায়। শোনা যায়, ওই মেজর নাকি দয়ালু ছিল। ওদের ছেড়ে দিয়েছিল। তবে ওদের নজরবন্দী রাখা হয়। বলে দেওয়া হলো, ওরা যেন কোনোভাবেই বাসা ছেড়ে কোথাও না যায়।

একদিন মধ্যরাতে ওরা তিন বোন আজিজ ডাক্তারের বাসায় উঠোনের দিকে দরজা ধাক্কা দিতে থাকে। ডাক্তারের স্ত্রী হাসিনা বেগম দরজা খুলে ওদের আশ্রয় দেন। ওদেরকে ধানের ডুলির ভেতর লুকিয়ে রাখলেন। সরকারি ডাক্তার হওয়ার কারণে তখনো শহরের বাসায় ছিলেন।

-ডাক্তার ছাহাবজী দরজা খুলিয়ে।

জোরে জোরে করাঘাত করে ডাকতে থাকে। ডাক্তার সাহেব দরজা খুলে দেখেন বিহারিরা। তাদের মধ্যে কয়েকজন রিকশাওয়ালা। ওদের হাতে লাঠিসোঁটা।

-ছালাম ছাবজী।

-কী ব্যাপার?

স্যার আজাদ ছাবকো তিন লাড়কি আপকা ঘর মে আয়া?

-আরেহ না না না। আমার বাসায় সবাই ঘুমে। পেছনের দরজা বন্ধ। আসো ভেতরে, দেখো।

-ছালাম ছাব এই চল্ চল্। হাম বোলা না গোপাল বাবুকা ঘর মে চেক করো।

ওরা হুড়মুড় করে চলে গেল পাশের হিন্দু বাড়িতে খুঁজে দেখতে। গোপালদের বাড়ি খালি পড়ে আছে। মার্চের প্রথম দিকে গোপাল বাবু ওর বাবা–মাসহ ভারতে চলে গিয়েছিল। আর তার দিদিকে পাঠিয়ে দিয়েছিল আরও আগে। আজিজ ডাক্তার সাহেব দরজা বন্ধ করে চুপচাপ ইজি চেয়ারে শুয়ে সিগারেট টানতে লাগলেন। তার ছেলেমেয়েরা ঘুমাচ্ছে। বড় ছেলে ক্লাস ফোরে পড়ে। তার ছোট ছেলে থ্রিতে। মেয়ে একজন টুয়ে। আর ছোটটি ওয়ানে। শাশুড়ি মা আছেন সঙ্গে। তার স্ত্রী এসে বসে আছেন পাশে। তার ভয়ার্ত দৃষ্টি।

-আবার আসবে নাকি? ফিসফিসিয়ে জানতে চান।

-না, ওরা আসবে না। ওরা আমার কাছে ওষুধ–চিকিৎসা পায়। আমাকে মানে।

রাতে আর ঘুমালেন না। হাসিনা বেগম বেলি, লিলি, ডলি মেয়ে তিনটাকে নিজেদের বিছানায় শুয়ে থাকতে বললেন।

ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। আসিফ নামের ছেলেটা সঙ্গে আরও কয়েকজনসহ এসে তিন বোনকে নিয়ে গেল। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে হলদিবাড়ি রেখে আসল। আমজাদ সাহেব আর ওনার স্ত্রী ওই বাসায় থাকলেন। ওই দিন বিহারিদের ওই বাসায় ঢুকে ভাঙচুর করতে দেখল সবাই।

‘জয় বাংলা বাংলার জয়

হবে হবে হবে হবে নিশ্চয়’

বাংলার জয় এসেছিল। নূতন ভোর এসেছিল ঠিকই। বাংলাদেশ নামের দেশটি তখনো শিশু। ওই শহরের এসডিও অফিসে একদিন বাংলাদেশের সবুজের মাঝে লালবৃত্ত আঁকা পতাকা উড়ল। কিন্তু সমীর কুন্ডুও আর ফেরেনি। এই পরিবারটিও আর নীলফামারী ফিরে আসেনি। আজাদ সাহেবের বাড়িটি অন্য একজন কিনে নেন। আর বাংলাদেশের অন্য এক মহকুমায় আজাদ সাহেব তার স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে চলে গেলেন। বেলি লিলিরাও আর ফেরেনি এই শহরে। ফেরেনি আসিফও। শুধু কিবরিয়া অস্ত্র হাতে ফিরেছিল।

২০১২ সাল। নিউজার্সির এক বাসায় বেড়াতে যাই। ঘরময় বিরিয়ানি খুশবু ছড়িয়েছে। বেশ স্বাস্থ্যোজ্জ্বল বিড়াল পেয়ে কন্যা আমার খুব খুশি। বিড়ালটির সঙ্গে তার ভাব হয়েছে। জলপাইগুড়ির বিলু খালার ভাই তারা মামার সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল বেলি খালার। তারা মামাদের ডুয়ার্সে চা বাগান ছিল একসময়। এখানে সুখের সংসার। ৪০ বছর প্রায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তাদের এক মেয়ে ডাক্তার। দুই ছেলে এমবিএ করেছে। ছেলেরাও সব করপোরেট জব করেন।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে এখনো কী তাদের মনে পড়ে সেই বেদনাবিদূর দিনগুলো। বেলি খালা ডাক্তার আজিজ সাহেবের ছেলেকে —‘তীর হারা ওই ঢেউ এর সাগর পাড়ি দেবো রে’ গানটি গাইতে বললেন। নিশ্চয়ই স্মৃতির কপাট খুলে মনে পড়েছে আগুনের হল্কা লাগা দিনগুলো।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন