default-image

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন লড়াকু সৈনিক ছিলেন মুহিদ চৌধুরী। যুদ্ধের ময়দানে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি তিনি। ওয়াশিংটনে তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। স্বাধীনতাকামী লড়াকু বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানি জান্তা সরকারের বর্বরোচিত হামলার ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরাসহ বিশ্ব জনমত গঠনে বিরামহীন কাজ করে গেছেন তিনি।

একাত্তরের সেই ঘটনাবহুল সময়ে ওয়াশিংটনে পাকিস্তানি দূতাবাসে তখন কর্মরত ছিলেন ছয়জন বাঙালি কূটনৈতিক ও আটজন বাঙালি কর্মচারী। সেই ছয়জন কর্মকর্তার ভেতরে চারজন ছিলেন সিলেটী। শাহ এম এস কিবরিয়া, এম এ মুহিত, সৈয়দ মোয়াজ্জম আলী ও মুহিদ এ চৌধুরী। এ ছাড়া বাঙালি অফিসারদের মধ্যে আরও ছিলেন এনায়েত করিম, আবু রুশদ ও মতিন উদ্দিন। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন পাকিস্তানি আগা হেলালি।

২৫ মার্চের পর ওই দূতাবাসের সব বাঙালি অফিসারের কাছে পাকিস্তানি জান্তা সরকারের সব ধরনের উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়ে উঠেছিল। যার কারণে ৪ আগস্ট দূতাবাসে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা ও কর্মচারী ওয়াশিংটনে জাতীয় প্রেসক্লাবে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সামনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আনুগত্য জানান। তারা পাকিস্তান সরকারের চাকরি থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন।

এই পদত্যাগের খবরটি নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ অন্যান্য প্রিন্ট মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী, যিনি প্রখ্যাত রম্য সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর ভাতিজা, তিনি তার এক লেখায় বলেছেন, ‘এরপর থেকে আমাদের পরিচয় হয়ে উঠেছিল রাষ্ট্রবিহীন মানুষ হিসেবে। এ অবস্থায় আমাদের লক্ষ্য ছিল একটাই, নিজের দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

বিজ্ঞাপন

মুহিদ এ চৌধুরী তখন ওয়াশিংটনে পাকিস্তান দূতাবাসে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিফেন্স অ্যাকাউন্ট্যান্ট পদে কর্মরত ছিলেন। তিনিও তখন পদত্যাগী ১৪ জনের একজন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বসবাসকারী বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে জনমত গঠনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া দিনের পর দিন ধরে তিনি হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র দপ্তর ও ক‍্যাপিটাল হিলের সামনে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি বিশ্ব জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করেছেন। কখনো কখনো একা একাই সারা দিন পথ থেকে পথ ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে তুলে ধরেছেন পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে নির্যাতিত বাঙালির করুন কাহিনি। তার এসব কাহিনি স্থানীয় মিডিয়ায় গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সাবেক সব কূটনৈতিকের মধ্যে মুহিদ এ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের মাধ্যমে গ্রিনকার্ড পেয়েছিলেন। ওই ’৭২ সালে দেশে গিয়ে বিয়ে করলেন সিলেটের মেয়ে সাইয়েদা মেহের চৌধুরীকে। মেহের তখন সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ‍্যমিক শ্রেণির ছাত্রী ছিলেন। তিনি ওয়াশিংটন এসেই ইংরেজি ভাষা শিক্ষা কোর্স এবং একই সঙ্গে কমপিউটার

কোর্সে ভর্তি হয়ে যথাসময়ে শেষ করলেন পড়াশোনার পাঠ। ’৭৪ সালের প্রথম দিকে সবে আইবিএম যুক্তরাষ্ট্রে কম্পিউটার বাজারজাত শুরু করেছে।

বিশাল আকৃতির ওই সব কম্পিউটার শুধু অফিস আদালতে ব্যবহৃত হতো। মেহের তাঁর প্রবাস জীবনের শুরুতে বিষয়টিকে চ‍্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য তার এই সাহস অর্জনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি ছিলেন তাঁর স্বামী মুহিদ চৌধুরী। এক সময় কম্পিউটারে ডিপ্লোমা লাভ করলেন ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের ওপর। তারপর ’৮৪ সালে আমেরিকান সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন সাইয়েদা মেহের। এর পর সরকারি চাকরিতে যোগদানের ইচ্ছা নিয়ে আবেদন করতে লাগলেন। সহসাই তাঁর সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে গেল। ততদিনে পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে কাজে যোগদানের নিয়োগপত্র পেয়েছেন মেহের।

পররাষ্ট্র দপ্তরের ইকোনমি ব‍্যুরোতে অ্যাসিস্ট্যান্ট টু দ‍্যা চিফ হিসেবে যোগ দেন মেহের। তার এই কাজে যোগদানের ভেতর দিয়ে পররাষ্ট্র দপ্তরে এশিয়ান কমিউনিটির যাত্রা শুরুর ইতিহাস রচিত হল। এর আগে পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান দপ্তরে আর কোনো এশীয় ব্যক্তির যোগদানের কোনো ইতিহাস নেই। এ পর্যন্ত মেহের চৌধুরী একমাত্র বাঙালি ও একমাত্র এশীয় যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সফর সঙ্গী হিসেবে ঘুরেছেন দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সফর সঙ্গী হিসেবে সাইয়েদা মেহের চীন, সেনেগাল, রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, সুইডেন, আয়ারল্যান্ড ও বাংলাদেশ সফর করেন।

১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটন যখন বাংলাদেশ সফরে গিয়েছিলেন মেহের চৌধুরী তখন পররাষ্ট্র দপ্তরের ইকোনমি ব‍্যুরোর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সফর উপলক্ষে মার্কিন প্রশাসনের অগ্রবর্তী দলের সদস্য মনোনীত হয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। ২০১১ সাল থেকে মেহের দায়িত্ব পালন করছেন ব‍্যুরো অব এনার্জি রিসোর্সের প্রিন্সিপাল ডেপুটি অফিসার হিসেবে। তার বহুমুখী এসব কর্মকাণ্ডের সর্বস্বীকৃত হিসেবে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অনেক সম্মাননা লাভ করেছেন।

নিজের মেধা প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কারণে তার এত সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছানো সম্ভব হলেও এসব কিছুর মূলে ছিল মুহিদ এ চৌধুরীর অনুপ্রেরণা। সেই তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন ১ নভেম্বর মধ্য রাতে। ভার্জিনিয়ার তার নিজের বাসায় হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মুহিদ এ চৌধুরীর মারা গেলেন নীরবে–নিভৃতে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন দেশ মাতৃকার সেবায়।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0