default-image

কমলা হ্যারিস বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে আলোচিত একটি নাম। বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন তিনি। আগামী ২০ জানুয়ারি শপথ নিতে যাচ্ছেন। নতুন বছরে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চলেছেন। ৩ নভেম্বর আমেরিকা জাতীয় নির্বাচন হল। সেই নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দল থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ছিলেন জো বাইডেন আর ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস। টান টান উত্তেজনা শেষে সব জল্পনা–কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ডেমোক্রেটিক দল পপুলার ও ইলেকটোরাল ভোটে জয়ী হয়ে ইতিহাস গড়েছে। বাইডেনের ঝুড়িতে গেল ৩০৬ ইলেকটোরাল ভোট আর ট্রাম্পের ২৩২। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা অভিনন্দন জানিয়েছেন ইতিমধ্যে।

কমলা হ্যারিস একজন দৃঢ় প্রত্যয়ী মানুষ। শত বাধা উপেক্ষা করেই আজ তিনি স্বপ্নের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। জো বাইডেন যখন কমলা হ্যারিসকে তাঁর রানিং মেট হিসেবে নেন, অনেকেই বলেছিল ভুল করছেন। কিন্তু যারা কমলা সম্পর্কে জানত তারা বলেছিল, বাইডেন ঠিক কাজটি করেছেন। কারণ, কমলা শুধু একজন দক্ষ অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন না, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে যৌক্তিক ও ধারালো বক্তব্য সিনেটর কমলাই দিয়েছিলেন। তার যুক্তির মারপ্যাঁচে ট্রাম্প প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছিল। বলা যায়, স্পষ্টবাদী কমলা তার দায়িত্বের জায়গা থেকে জোরালো ভূমিকাই রেখেছেন সব সময়।

কামলার স্বপ্ন ছিল প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করার এবং সেভাবে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু একপর্যায়ে এসে দেখলেন, তাঁর নির্বাচন করার মতো সে রকম তহবিল নেই। তাই পিছিয়ে যান। আর এর সবকিছুই বাইডেন পর্যবেক্ষণ করেছেন। বাইডেন ভেবেছেন একজন যোগ্য, দক্ষ মানুষ তার পাশে দরকার, যা কমলা হ্যারিসের মধ্যে আছে। তাই তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি কমলাকে বেছে নিতে। কামালও তাঁর প্রস্তাব লুফে নেন। কারণ, ভবিষ্যতে তার দরজা খুলে যাবে যদি কোনো কারণে পরবর্তীতে বাইডেন না আসেন নির্বাচনে। বয়সের ভারে নুয়ে আসছেন বাইডেন। তাই এমনও হতে পারে, পরবর্তীতে বাইডেন না এসে কমলাই প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন। আর এমন সুযোগ তিনি হাতছাড়া করবেন কেন? কমলার জয়ে আনন্দিত, উচ্ছ্বাসিত প্রবাসে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকলে স্বপ্নকে ছোঁয়া যায়, কমলা তার উদাহরণ। বিশেষ করে তাঁকে নিয়ে উচ্ছ্বাসিত এশীয় কমিউনিটি।

বিজ্ঞাপন

অনেক ছেলেমেয়ের আইকনে পরিণত হয়েছেন কমলা। ১৯৬৪ সালের ২০ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে জন্ম তাঁর। জন্ম বেড়ে ওঠা যুক্তরাষ্ট্রে হলেও তার মা ছিলেন ভারতীয় আর বাবা জ্যামাইকান। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয় কামলার শৈশবে। তবে মা ছিলেন সব সময়ের ছায়াসঙ্গী। কমলার মা শ্যামলা গোপালন দক্ষিণ ভারতের, তাঁর জন্ম চেন্নাইয়ে। দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা, উচ্চতর শিক্ষা নিতেই এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। ইউনিভার্সিটি অফ ইলিনয়ে ব্রেস্ট ক্যানসার গবেষক হিসেবে যোগ দেন। একজন ক্যানসার গবেষক হিসেবেই তাকে চেনেন সবাই। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ২০০৯ সালে। তবে মা হিসেবে কমলার মধ্যে যে স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন, তা আজ প্রকাশিত।

বহুমুখী প্রতিভাধর, স্পষ্টবাদী, কমলা প্রতিকূলতায় লড়াই করার অদম্য সাহস পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। তিনি বলেন, মা তাঁর বড় অনুপ্রেরণা। সেই ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছেন মায়ের লড়াই, ঘরে-বাইরে সর্বত্র। মা বলতেন, শুধু লড়াই করব বললে হবে না, তা কাজের মাধ্যমে করে দেখাতে হবে। তুমি যদি মানুষের জন্য কিছু করতে চাও, রাজপথে নামো। অধিকার আদায় কর তাদের জন্য। বর্ণ প্রথার একটা ব্যাপার তো ছিলই সে সময়, সেই সঙ্গে কমলার ধর্ম এবং বংশোদ্ভূত নিয়েও জলঘোলা কম হয়নি। কিন্তু এসব কিছুকে তুড়ি মেরে তিনি এগিয়ে গেছেন। তাঁর শিক্ষা, মানসিক শক্তি সবকিছু ছাপিয়ে আজ এই পর্যায়ে এসেছেন।

স্রোতের প্রতিকূলে বা বাস্তবতার নিরিখে রাজনীতির মাঠে আজকের এই পর্যায়ে আসা কমলার জন্য সহজ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কমলার আগে মাত্র দুজন নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মনোনীত হয়েছিলেন, ২০০৮ সালে রিপাবলিকান দল থেকে সারাহ পেলিন এবং ১৯৮৪ সালে ডেমোক্রেটিক দল থেকে জেরালডিন ফেরারো। কমলাই প্রথম সাউথ এশিয়ান-আমেরিকান যিনি ডেমোক্র্যাট রাজনৈতিক দল থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়ে জয়ী হয়েছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার একেবারে তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে এসেছেন তিনি। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি, স্টেট অ্যাটর্নি জেনারেল ও সিনেটর হিসেবে একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন।

কমলাকে একজন বুদ্ধিদীপ্ত রাজনীতিক, দক্ষ ও সফল আইনজীবী হিসেবেই দেখছে সবাই। আর দেখবেই বা না কেন, যার রাজনৈতিক ভিত এত মজবুত তাঁকে সহজেই শুধু বংশের দোহাই দিয়ে ছিটকে দেবে, তা কী করে হয়। ২০০৩-২০১১ সাল পর্যন্ত তিনি সান ফ্রান্সিসকোর ২৭তম ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১০ এবং ২০১৪ সালে তিনি পরপর দুবার ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নির্বাচিত হন। ক্যালিফোর্নিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়ার পরই ২০১৬ সালের নভেম্বরে তিনি সিনেটর পদে নির্বাচন করে জয়ী হন। সিঁড়ির ধাপে ধাপে পা রেখে আজ এ পর্যায়ে এসেছেন তিনি। আসলে জীবনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা কমলা চেনেন সংগ্রামের পথটা।

কমলা নির্বাচনী বক্তৃতায় বলেছিলেন, লড়াকু মানুষের সংগ্রাম তাঁর জানা। ন্যায়বিচারের সংগ্রাম কারও একার নয়, সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যেতে চান। ইতিমধ্যেই জানা যায়, কমলার স্বামী ডগলাস চাকরি ছেড়ে স্ত্রীর পাশে থাকবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যাকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের প্রথম ‘সেকেন্ড জেন্টেলম্যান’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ডগলাস পেশায় একজন আইনজীবী। ২০১৭ সাল থেকে ‘ডিএলএ পাইপার’ নামে আইন বিষয়ক একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। চাকরি ছাড়ছেন স্ত্রীকে কাজে সহযোগিতা করতেই।

এদিকে, এশীয় বংশোদ্ভূত যেসব ছেলেমেয়ে রাজনীতির সঙ্গে ইতিমধ্যে নিজেদের জড়িয়েছেন, তারা কমলাকেই অনুসরণ করবেন বলে মনে হচ্ছে। কারণ, জয়ের পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা রাস্তায় নেমেছিলেন। বাঁধভাঙা জোয়ার বইছিল সর্বত্র। যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় অভিবাসীদের দেশ। মেধা আর শ্রম থাকলে কঠিন পথ পাড়ি দেওয়া যায়। নিজেকে নেওয়া যায় অনন্য উচ্চতায়। এখানে বংশ বা শুধু অর্থ থাকলেই রাজনীতি হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিষয়টা একটু জটিল। কংগ্রেসে সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ—সবকিছু সম্পর্কেই নখদর্পণে থাকতে হয় একজন রাজনীতিবিদের। প্রেসিডেন্ট হলে তার সন্তান প্রেসিডেন্ট হবে এমন নয়। এখানে যোগ্যতার মাপকাঠিতেই আসতে হবে। আর সেই যোগ্যতা অর্জন করার মতো শিক্ষা, সাহস, শ্রম সবকিছুই দিতে হয়। উড়ে এসে জুড়ে বসার সুযোগ নেই। কংগ্রেসে এবার নারীর আধিক্য বেশি। রিপাবলিকান থেকে শুরু করে ডেমোক্র্যাট—সবখানেই অন্যবারের তুলনায় এবার নারীরা আসন পেয়েছে বেশি। আর ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেই তো কমলা থাকছেন, যা দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের উৎসাহিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির জবাবদিহির জায়গাটা খুব শক্ত। এমনকি একজন প্রেসিডেন্টও চাইলেই যা খুশি করতে পারে না। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের মতামতের ভেতর দিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সঙ্গে বিচার বিভাগ তো থাকছেই।

করোনাভাইরাসের কারণে এবার আগাম ভোট পড়েছে বেশি, প্রায় ১০ কোটির মতো, যা নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব পড়েছে। এত বেশি ভোট যুক্তরাষ্ট্রের গত শত বছরের ইতিহাসে আর পড়েনি। আর ভোটের ফলাফল নিয়ে ট্রাম্প যা করছেন, তা নজিরবিহীন। গত কয়েক দিন ধরে যা ছিল সংবাদের শিরোনামে। এত হইচইয়ের ভেতর যে বিষয়টা উঠে এসেছে, তা হলো নতুন প্রজন্মের রাজনীতির প্রতি মনযোগ, যা আগে তেমনটা ছিল না বা থাকলেও প্রকাশ পায়নি। যেসব তরুণ রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তারা কমলাকে তাদের পথিকৃৎ ভাবতে শুরু করেছেন। ক্যালিফোর্নিয়ার একেবারে তৃণমূল থেকে উঠে আসা কমলা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই করে নিয়েছেন নিজ যোগ্যতায়। তিনি এখন অনেকের স্বপ্নের অগ্রপথিক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0