default-image

মুখ ও মুখোশের মধ্যকার সম্পর্ক পরস্পর বিপরীত, বাস্তবতার বিপ্রতীপ কোণে অবস্থান মুখ ও মুখোশের। একটি প্রকৃতি সঞ্জাত সত্য, অন্যটি আরোপিত এক কৃত্রিমতা। এখন এই করোনাকালে বিপর্যয়ে যেন মুখের চেয়ে মুখোশই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই প্রথম জানলাম, মুখরক্ষা নয়, সত্যি সত্যিই মুখের রক্ষার জন্য মুখোশ অত্যাবশ্যক। আর কেবল মুখই বা বলি কেন, শারীরিক সুস্থতার জন্যই মুখোশ হয়ে উঠেছে এক ধরনের আবশ্যিক পোশাক। মুখোশ শব্দটির প্রচলিত অর্থ নেতিবাচক; সম্ভবত সে কারণেই অনেকেই বাংলায় মাস্ক শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে মাস্ক বলুন, আর মুখোশ বলুন—দুটিই আমাদের প্রকৃত সত্তাকে আড়াল করে রাখে। এই আড়ালের লক্ষ্য হল, নিজেকে বিপদ থেকে রক্ষা করা। আর এখনকার সময়ে সেই অণুজীব থেকে নিজেকে রক্ষা করা, যে অণুজীব জীবনের বিপরীতে প্রাণ সংহার করেই চলেছে। এটাও একরকম পরিহাস বলা যায়। কারণ অনুজীবটিও জীবই বটে, তবে জীবনসংহারী জীব।

এই আইরনি কিংবা পরিহাস আমাদের প্রাত্যহিক জীবনজুড়েই চলছে। আমার আমি কখনো মুখ, কখনো মুখোশ। এই যে ধর্ষণের যজ্ঞ চলছে, সর্বত্র এই উন্মাদনার উৎসবে সব ধর্ষকই লুকায় মুখ, থাকে মুখোশের আড়ালে। মুখের যে ভয়াবহতা, সেটি আড়াল হয়ে যায় মুখোশের বর্ণিল সৌন্দর্যে। এখানেই করোনার মুখোশের সঙ্গে অপরাধীর মুখোশের পার্থক্য। করোনার মুখোশ আত্মরক্ষাকারী, অপরাধীর মুখোশ প্রাণসংহারী। করোনার মুখোশে আছে জীবনের জয়গান, অপরাধীর মুখোশে থাকে ধ্বংসের ভয়াবহ বার্তা। করোনার মুখোশ খসে পড়বে হয়তো, কিন্তু অপরাধী তার মুখোশ কখনো খুলবে না। করোনার মুখোশ শঙ্কার প্রতীক, অপরাধীর মুখটিইতো শঙ্কার, যে মুখ সে ঢেকে রাখে বর্ণিল মুখোশে। আমরা দেখি না, কোন পাশব মুখ, মানবিক মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকে সে।

বিজ্ঞাপন

২.

আমরা যে ধর্ষকদের কথা শুনছি প্রতিদিন, প্রতিনিয়তই তারা যে মুখোশ ধারণ করে আছে, সেটিই আমাদের বিভ্রান্ত করেছে। অমানুষদের মানুষ ভাবতে বাধ্য করেছে। এরা কখনো আত্মীয় হয়ে, কখনো শিক্ষক হয়ে, কখনো ছাত্র হয়ে, কখনো প্রেমিক হয়ে, কখনোবা বন্ধু হয়ে আমাদের ভিন্নতর মুখোশে মুগ্ধ করে। এই হায়েনাদের হাত থেকে রক্ষা পায় না চার বছরের শিশুও, যখন তাকে আদর করার মুখোশে নিপীড়ন করে সে। নিজের ভোগের ভয়াবহ আনন্দে সে দুর্ভোগ বাড়ায় কত শত পরিবারের, সমাজের কিংবা দেশের।

আমাদের নিষ্পাপ, নিরপরাধ সত্তা কখনই হয়তো সন্ধান করে পায় না ধর্ষকের আসল চেহারা, যতক্ষণ না দেখি তার বৈরী আচরণ, যতক্ষণ না সে ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়নার মতো। এই মুখ ও মুখোশের দ্বান্দ্বিক সত্য আমাদের নিয়ে যায় একাত্তরের সেই ভয়াবহ দিনে। তখন হয়তো আমাদের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হয়ে উঠেছিল আমার পিতার ঘাতক কিংবা আমার বোনের ধর্ষক। তার মুখোশে ছিল একজন সুপ্রতিবেশী সুলভ আচরণ। হয়তো আমরা ভেবেছি, এর মতো ভালো মানুষ ইহজগতে খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। তার মুখোশকে মুখ বলে ভুল করেছি বারবার। যখন দেখেছি মুখ, তখন দেখি সে মানুষ নয়, রীতিমতো দানব। ঠিক মহিষাসুরের মতো সে জীবনের সব সুরকে স্তব্ধ করে দিয়ে স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করে। অসুরের এই অত্যাচার বাঙালি বারবার দেখেছে, ’৪৬ এর’ দাঙ্গায় কলকাতা, বিহার কিংবা নোয়াখালীতে যখন হিন্দু কিংবা মুসলিম প্রতিবেশী এক সময়কার সুজন হয়ে যায় দুর্জন। হয়তো সে তেমন মুখোশধারী নয়, কিন্তু ধর্মের ভাবাবেগে সে কিছুক্ষণের জন্য পরিণত হয়ে যায় দানবে। মিলনের যে সুর বাজিয়েছিল সে বহুদিন, হঠাৎ মুহূর্তের নেতিবাচক আবেগ তাকে অসুরে পরিণত করে। আমরা আকস্মিক টের পাই, মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে তখন চিনতে ভুল হয়। মুখ ও মুখোশের এই দ্বন্দ্বে বিভ্রান্ত হই আমরা, বিশ্বাসের বৃক্ষ ক্রমশই দুর্বল হতে থাকে বারবার।

বিজ্ঞাপন

৩.

কঠিন এসব অপরাধী কিংবা রাজনৈতিক কূটকৌশলে বিভ্রান্ত সাম্প্রদায়িক জনগোষ্ঠী ছাড়াও মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের সমাজটাই এক ধরনের মুখ ও মুখোশের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে চলছে। আমাদের ভদ্রতা ও সুশীলতাও আমাদের ঢেকে রাখে বারবার। এই যে সুশীল সমাজের কথা বলি আমরা, তাঁরাও যে মুখোশ পাল্টান না, তাতো নয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে তাঁদের কথাবার্তা, আচার–আচরণে এমন কি পোশাকেও পরিবর্তন আসে। এখন যারা যত্রতত্র সযত্নে পরে থাকেন বঙ্গবন্ধু কোট, তাঁদের কারও কারও আলমারিতে হয়তো লুকিয়ে আছে জিয়াউর রহমানের আমলের সেই সাফারি। সুযোগ বুঝেই তাঁরা পরিত্যাগ করবেন বঙ্গবন্ধু কোট, সেটি মুজিব কোট নামে বাক্সবন্দী হবে যত দিন না আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। কিংবা এক সময়ে যাঁরা বিদেশি শিফন শাড়ির মোহে পাগল ছিলেন, আজ তাঁরা দেশি জামদানিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন। এর কোনটা মুখ, আর কোনটাইবা মুখোশ, সেটা বোঝা কোন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও সহজ নয়।

মানুষ প্রায়ই সুযোগ সন্ধানী হয়ে ওঠে। সুযোগের সন্ধান করা কোন অপরাধ নয়, সুযোগই জীবনকে দিতে পারে বাহ্যত সুখ ও শান্তি। রাজনৈতিক ব্যাপারেই হোক কিংবা নিতান্ত ব্যক্তিগত চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রেই হোক, কর্তাব্যক্তিদের মন যুগিয়ে চলতেই হয়। কথায় আছে, ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, ‘আজকাল অবশ্য কর্ত্রীর ইচ্ছায় কর্ম’—এ রকম কথাও বলা যায়। যদি না বারবার আমরা নানান রঙের মুখোশ পরে থাকি, তাতে দোষের কিছু নেই। এই তো হ্যালোইন আসছে শিগগিরই। হ্যালোইন হচ্ছে পশ্চিমি বিশ্বের বহু দেশে এই অক্টোবরের শেষে একটি মজার উৎসব, যখন বিশেষত শিশুরা মুখোশ পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে, ‘Treat or Trick’ বলে সবাইকে চমকে দেয়। সংগ্রহ করে ঝুড়ি ভর্তি চকলেট।

বিজ্ঞাপন

৪.

শিশুরা দৈত্য-দানব কিংবা ভূত-প্রেতের পোশাক ধারণ করে বটে, কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তাদের মুখোশটা মুখ্য নয়, মুখ্য তাদের উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত কচি মুখ। আর আমাদের কুটিল কৌতুকে মুখোশটা থাকে মানুষের, মুখটা হয়ে ওঠে দানবীয়। চেয়ে থাকি তাই, করোনাকালের মুখোশ থেকে আমরা মুক্ত হব কবে। আর সেই সঙ্গে আমরা সবাই কবে আমাদের মুখোশ ছেড়ে হয়ে উঠব কেবল মুখের আমি, আর সে মুখ হবে মানুষের মুখ।

মন্তব্য পড়ুন 0