default-image

হাত-পা কাটলে, কোথাও চামড়া ছিঁড়ে গেলে ফার্স্ট এইড বক্স বের করে যেমন ব্যান্ডএইড লাগান, ডেটল দিয়ে মোছেন যাতে ইনফেকশন বা ঘা না হয়, ঠিক তেমনি মনেরও ফার্স্ট এইড বক্স আছে। আঁচড় লাগলেই আপনাকে মেরামত করতে হবে। মনে আঁচড় লাগতে লাগতে এক সময় তা আত্মাকে নিঃশেষিত করে ফেলে। তারপর একসময় শক্তি থাকে না আত্মায়। মনের অশান্তি আস্তে আস্তে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে রোগ-বালাই রুপে। মনের ফার্স্ট এইডের জন্য আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। কারও সাহায্য চাইতে হবে না। নিজেই নিজেকে হিল বা নিরাময় করবেন।

মনে প্রতি মুহূর্ত ঘরে-বাইরে আঁচড় লাগে। মা-বাবার কথা শুনলে সন্তানদের লাগে। স্বামী-স্ত্রী একজন আরেকজনের কথাও ধারালো ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আঘাত করে। বউ-শাশুড়ি মানেই তো মিসাইল বোমা। প্রেমিক-প্রেমিকা তো নিমের মতো এই তিতা আবার মধুর মতো মিঠা। সম্পর্ক ধরে রাখা দায় হয়ে পড়েছে। অনেকে এক ঘরে থেকেও কথা বলছে না একে অন্যের সঙ্গে। একই পরিবারের মানুষ একসঙ্গে থাকলেও সত্যিকার অর্থে যোগাযোগ নেই শুধু মনের দূরত্বের জন্য।

এখন তো আঘাত পাওয়ার জন্য অন্য কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা নিজেরাই তা তৈরি করে ফেলতে পারি। ফেসবুকে ছবি একটা পোস্ট দেওয়ার পর কেউ কেউ লাইক, কমেন্ট না করলেও আমাদের মনঃকষ্ট বেড়ে যায়। আমি তার সবকিছুতে লাইক দিই, সেতো আমারটায় দেয় না। কেউ কেউ অন্যের লেখা পড়লে চরম বিরক্ত হয়। এ রকম বিরক্তি শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক। সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্যে বুলির শিকার এখন হরহামেশাই মানুষ হচ্ছে। সবার মানসিক শক্তি প্রকট থাকে না।

নিউইয়র্কের একবোন সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, তাঁর কোনো পোস্ট নিয়ে তাঁরই দুই সহকর্মীর আঘাতে তিনি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন! কী মারাত্মক কথা! আমি তাঁকে এক ঘণ্টা মন শান্ত রাখার যত রকম কৌশল, কাউন্সেলিং আছে, দিয়েছি। এই যে অন্যের কথায় যদি তাঁর মন শান্ত হয়, তাহলে তাঁর বা আমাদের নিজের কথায় কী আমাদের মন শান্ত হয় না? অবশ্যই হয়। শুধু ধৈর্য ধরে অনুশীলন করতে হবে। আমার জন্য আমার নিজের যে বাণী তাই হচ্ছে মনের ফার্স্ট এইড বক্স। যখনই আঘাত লাগে, সে বক্স খুলুন। দেখবেন জীবনে ম্যাজিক হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আশপাশে সব সময় আপনি আপনাকে সমস্যা থেকে তুলে আনার মানুষ পাবেন না। বরং হয়তো এমন কাউকে পাবেন, যে আপনাকে পরামর্শ দেবে মরার আগে সুইসাইড নোটে ওর নাম লিখে যেতে, যাতে সে পার না পায়। তাই, সবচেয়ে ভালো হয় নিজের ফার্স্ট এইড বক্স খুলে নিজেই নিজের মনের হিলিং করেন। চোখ বন্ধ করে পাঁচ মিনিট বলুন, আপনি সুখী মানুষ। অন্যের ব্যবহারে নিজেকে কখনো কষ্ট দেবেন না। সে খারাপ ব্যবহার করেছে, সে–ই খারাপ। সে জন্য আমি কেন কষ্ট পাব? নিজেকে সত্যিকারে সুখী মানুষ হিসেবে কয়েকবার ঘোষণা করুন। দেখবেন, জ্বলাপোড়ায় লাগানো মলমের মতো দ্রুত আপনার মনের যন্ত্রণা কমছে। আপনি যা বলবেন, তা শরীরে অনুভব করবেন। যখনই আঘাত লাগবে, এক/দুই মিনিট যতটুকু সময় পারেন, মনকে শান্ত করুন।

মনের কান্না বন্ধ করতে মেডিটেশন জরুরি। আপনার বাচ্চা স্কুল থেকে আঘাত পেয়ে এসে কান্না করলে তাকে যেভাবে ভালো কথা বলেন, তেমনি নিজের মনের সঙ্গে কথা বলুন। মন এক বাচ্চা। পুরোনো প্রোগ্রাম মোছে নতুন প্রোগ্রাম তৈরি করুন। একটা সময় বুঝতে পারবেন, অন্যের কথায় আপনার আসলেই কিছু আসে যায় না। তখন নিজে কত বোকা ছিলেন, সেটি ভেবে লজ্জা পাবেন। চুপচাপ ধ্যান করুন। মেডিটেশন ভেতরের শক্তি বাড়িতে দেয় কয়েকগুণ।

আমরা গোসল কেন করি? হাত মুখ কেন ধুই? শরীরের ময়লা পরিষ্কার করার জন্য। হাতে যেহেতু ময়লা বেশি লাগে, হাত বেশি ধুই। আর এখন তো ময়লা না লাগলেও ধুই। কিন্তু একবার চিন্তা করুন, বছরের পর বছর ধরে মনকে কত কষ্ট দিয়েছেন। কেউ একজন একবার আপনাকে আঘাত করেছে, কিন্তু আপনি নিজে সে আঘাতের কথা মনে করে হাজার বার নিজেকে আঘাত করছেন। শরীরের মতো মনের পরিচ্ছন্ন দরকার। মনের খোরাক দরকার। এ জন্য প্রতিদিন ভোরের স্থির হয়ে বসে আধঘণ্টা নিজের সঙ্গে কাটান। বাকি আধা ঘণ্টা জ্ঞানের কথা বা ভালো ধ্যানে অনুশীলন করুন, দেখবেন সারা দিন মনের আনন্দও বিরাজমান।

যতটা সম্ভব নিজেকে ক্ষমতায়ন করুন। মনে মনে মনকে কিছু জ্ঞানের কথা উপহার দেন। যেমন-

–আমার অনুশীলন হল বিশ্বের কাছে আমার উপহার।

–আমি আজ বিশ্বকে দোষ দেব না।

–আমি ছোট জিনিসগুলোতে সুখ খুঁজে পাই।

–আমি আজ অন্যের কোনো বিচার করব না।

–আমি আজ আমার নিজেকে প্রতারিত করব না।

–আমি আজ তাড়াহুড়া করব না।

–আমি এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে একা নই।

–আমি আজ ভয় পাব না।

এভাবে নিজেকে প্রতিদিন কিছু সুন্দর কথার মধ্যে নিয়ে আসুন। নিজেকে বোঝার জন্য আপনি স্থির হয়ে বসুন। সেটিই আপনার অনুশীলন। যখন বিশ্বের প্রতি নালিশ কমাবেন, আপনি নিজে হালকাবোধ করবেন। খুব বেশি কিছু আশা করবেন না। নিজেকে কখনো বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না। কোনো কাজে তাড়াহুড়ো করবেন না। পৃথিবীতে একটা সময় দেখবেন, আপনার মধ্যে কোনো অবাঞ্ছিত চিন্তা নেই। আপনার মন একদম নির্মল শিশুর মতো। অন্যের কথায়, আঘাতে নিজেকে আর ক্ষতবিক্ষত করবেন না।

আপনার নিজের প্রতি নিজের এই ভালোবাসাই আপনার মনের ফার্স্ট এইড বক্স।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন