default-image

গত বছরের জুনের শুরুতে মার্কিন সিনেটর টম কটনের একটি বিতর্কিত প্রবন্ধ ‘সেন্ড ইন দ্য ট্রুপ’ নিউইয়র্ক টাইমস–এর মতামত বিভাগে প্রকাশিত হওয়ার পর মতামত বিভাগের সম্পাদক জেমস বেনেটকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। অভিযোগ করা হয়েছিল, প্রবন্ধটিতে সামরিক বাহিনীকে বিক্ষোভ প্রদর্শনের পক্ষে সমর্থন জানানো হয়েছিল। প্রবন্ধটি প্রকাশ হওয়ার পর জনগণের পাশাপাশি তরুণ সাংবাদিকদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে অনেকেই প্রবন্ধটির সংশোধন চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব প্রচারে অংশ নেন এবং প্রবন্ধটিতে ভুল প্রচার সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়ে সম্পাদকের কাছে একটি নোট দাবি করেন। অবশেষে, বিদ্রোহী কর্মীরা সম্পাদক বেনেটকে পদত্যাগ বাধ্য করেন।

টম কটনের প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল মতামত পৃষ্ঠায়, সংবাদ পৃষ্ঠায় নয়। এটিই প্রথম নয়, যেকোনো সংবাদ সংস্থার ‘সংবাদ ও মতামত’–এর পার্থক্য প্রায়শই জনসাধারণের কাছে অস্পষ্ট একটি বিষয়।

যুক্তরাষ্ট্রে সাংবাদিকতায় একটি বিশ্বাস হলো, সংবাদ বিভাগগুলোতে কাজ করা সাংবাদিকেরা মতামত বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন থাকবেন। তবে সংবাদ ও মতামতের মধ্যে যে বিভাজন রয়েছে, তা অনেক পাঠকের কাছে এতটা পরিষ্কার নয়, যতটা সাংবাদিকেরা বিশ্বাস করেন। আর এ কারণেই মতামত বিভাগে প্রকাশিত সিনেটর টম কটনের প্রবন্ধটির দায়ভার এসে পড়ে বিভাগীয় সম্পাদক জেমস বেনেটের ওপর।

যেহেতু মার্কিন সংবাদ পাঠকেরা সংবাদের বস্তুনিষ্ঠ আদর্শে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাই সংবাদে যেসব প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, সূক্ষ্মভাবে তার ধারণাগুলো পাঠকদের কখনো কখনো সন্দেহের দিকে নিয়ে যায়। এবং পাঠকেরা ভেবে নেন, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে। পাঠকের এমন ধারণা বা বিশ্বাস সংবাদ মাধ্যমের জন্য ক্ষতিকর।

বিজ্ঞাপন

উনিশ শতকের গোড়ার দিকে খবরের কাগজগুলো রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে হতো। সে কারণে কাগজগুলো মোটামোটি পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। তবে উনিশ শতকে সংবাদপত্রের উচ্চগতির প্রেস ও কাঠের নিউজপ্রিন্ট কাগজের কারণে প্রচলন বৃদ্ধি পায় এবং আরও বেশি পাঠকের সন্ধান পেতে শুরু করে। সেই সঙ্গে কেউ কেউ দলমুক্ত হতে নিজেদের স্বাধীনতার ওপর জোর দেওয়া শুরু করেন। এরপর সাংবাদিকতায় বিভিন্ন স্কুল ও প্রেস সংস্থাগুলোর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ঘটনা, বাস্তবতা এবং সত্যতা নিয়ে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি যোগ হয়, যাকে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে পণ্ডিত বার্বি জেলিজার ‘গড টার্মস্ অব জার্নালিজম’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

সংবাদপত্রের মালিকেরা শুধু পাঠকের মতামতের ওপর তাদের সংবাদের প্রভাব ছেড়ে দিতে চাননি। সংবাদ যখন সংবাদপত্রের মূল পণ্য হয়ে উঠল, তখন প্রকাশকেরা সম্পাদকীয় পৃষ্ঠাগুলো সাজাতে শুরু করলেন, যেখানে তারা তাদের প্রিয় রাজনীতিবিদদের সমর্থন বা কারণবশত চাপ প্রয়োগ করতে পারেন।

এসব পৃষ্ঠা সাধারণত সম্পাদকীয় বোর্ড দ্বারা পরিচালিত হয়, যেখানে লেখক, কর্মী, পৃথক ক্ষেত্রে দক্ষ প্রতিনিধি থাকে, যারা অর্থনীতি বা বৈদেশিক নীতি, ছোট কাগজপত্রগুলোতে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি নিয়ে সম্পাদকীয় লেখাগুলো খসড়া করে থাকেন। খসড়াগুলো প্রকাশকসহ বোর্ড দ্বারা যাচাই করা হয়। তারপর সেগুলো প্রকাশিত হয়। এই প্রক্রিয়াটির মধ্যেও বৈচিত্র্য রয়েছে। লেখকেরা তাদের খসড়াতে কাজ করার আগে প্রায়শই সম্পাদকীয় বোর্ড থেকে লেখার বিষয় এবং মতামত সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে টম কটনের প্রবন্ধটি প্রকাশ হওয়ার মাসখানেক আগে পদত্যাগকারী নিউইয়র্ক টাইমসের মতামত বিভাগের সম্পাদক জেমস বেনেট পত্রিকার ওয়েবসাইটের একটি নিবন্ধে স্বীকার করেছিলেন, ‘সম্পাদকীয় বোর্ডের ভূমিকা বিভ্রান্তিকর হতে পারে, বিশেষত পাঠকদের জন্য, যারা টাইমসকে ভালো করে জানে না।’

বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থাগুলো তাদের পাঠক ও সাংবাদিকদের আশ্বাস দিয়েছিল, তাদের কার্যক্রমে ‘সংবাদ ও মতামত’ দুটি ভিন্ন পক্ষ এবং এর মধ্যে একটি ‘প্রাচীর’ রয়েছে। সংবাদ প্রতিবেদন ন্যায্য এবং স্বাধীন—পৃথক্করণের এই ধারণার ওপরই প্রকাশকেরা জোর দিয়েছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, পাঠকেরা সেই বিচ্ছেদকে বুঝতে পেরেছেন। যদিও অন্যান্য দেশের পাঠকেরা সাধারণত তাদের সংবাদপত্রগুলোকে একটি নির্দিষ্ট দল বা আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে বলে ভেবে থাকেন, কিন্তু সংবাদমাধ্যম পরিচালনার এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ পদ্ধতি।

প্রতিটা সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতার এক পাশে পাঠকের চিঠিপত্র নিয়ে আলাদা একটি বিভাগ থাকে। এটি কোনো পত্রিকায় ‘চিঠিপত্র’ বিভাগ আবার কোনো পত্রিকায় ‘মতামত’ বিভাগ বা ‘জনমত’ বিভাগ নামেও থাকে। লেখক, পাঠক যেকোনো বিষয়ের ওপর পরামর্শ, অভিযোগ, স্থানীয় বা রাষ্ট্রীয় সমস্যা, প্রতিকার এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লিখে থাকেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো অন্য দেশি ও বাংলা সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও একই ব্যবস্থা রয়েছে।

সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাগুলোতে বৃহত্তর মতামতকে অনুমোদন করার জন্য এই পদ্ধতিটি ১৯৭০ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার সম্পাদক জন ওকস সর্বপ্রথম ‘অপ-এড’ অর্থাৎ ‘অপজিট দ্য এডিটোরিয়াল পেজ’ (সম্পাদকীয় পৃষ্ঠার বিপরীতে) নামে পৃষ্ঠাটি তৈরি করেছিলেন। এটি একটি লিখিত গদ্য, প্রবন্ধ যা সাধারণত সংবাদপত্র বা সাময়িকীতে ব্যক্তি বিশেষের মতামত প্রকাশ করে। এটির সঙ্গে সম্পাদনা পরিষদের কোনো সম্পর্ক নেই। সাংবাদিকতার ইতিহাসবিদ মাইকেল সোকোলোর বিবরণ হিসাবে, ‘অপ-এড’ পৃষ্ঠাটি বের করার কারণ, জন ওকস অনুভব করেছিলেন, একটি পত্রিকা চ্যালেঞ্জ নিয়ে সবচেয়ে কার্যকরভাবে সামাজিক ও নাগরিক দায়িত্ব পালন করে, কৌশলতায় স্বাধীনভাবে মতবিরোধকে আমন্ত্রণ জানায়।

আক্ষরিক অর্থে, এটি মুদ্রণ পত্রিকার সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা থেকে বিপরীতে অবস্থিত। মুদ্রণ পত্রিকার ‘অপ-এড’ পৃষ্ঠায় সাধারণত কলামিস্টরা লিখে থাকে। এই কাগজে কর্মীরা নিয়মিত লিখেন। অপ-এড পৃষ্ঠার সূচনা হওয়ার পর সারা দেশের সংবাদপত্রগুলো নিউইয়র্ক টাইমসকে অনুকরণ করা শুরু করে।

জেমস বেনেটের পদত্যাগের সময় টাইমসের মতামত পৃষ্ঠায় সপ্তাহে ১২০টি মতামত প্রকাশ হয়েছিল। এই পৃষ্ঠাটি যদিও ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমস’–এর জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু এটি একটি সমস্যাও তৈরি করে।

নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার নিউজ বিভাগগুলোর ক্রমবর্ধমান সংবাদ বিশ্লেষণে এমন একটি স্তর রয়েছে, যা নিত্য পাঠকেরা মতামত বিভাগ থেকে অনেক সময় আলাদা করতে পারেন না। ১৯৭০ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে ‘অপ-এড’ পৃষ্ঠার সূচনা হওয়ার পর প্রতিদিনের সংবাদপত্রের প্রচারসংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের ৯৮ শতাংশ পরিবারের সমতুল্য ছিল। ২০১০ সালের মধ্যে এই সংখ্যাটি ৪০ শতাংশের নিচে নেমে আসে এবং তখন থেকেই পৃষ্ঠাটি ডুবতে থাকে।

সোশ্যাল মিডিয়া লিঙ্কগুলো থেকে মতামত বিভাগের গল্পগুলো পড়ে অনেক সময় পাঠকেরা নিউজ সাইটের সূত্রগুলোর দিকে মনোযোগ দিতে পারে না।

তাই অনেক সমালোচকেরা টাইমসের হোমপেইজে একটি সমমানের গ্রাফিক চিত্র যোগ করা দরকার বলে মনে করেন, যাতে পাঠকেরা হোমপেইজে গেলে একই স্তরে গ্রাফিকস সহকারে প্রদর্শিত সংবাদ এবং মতামতের গল্প-প্রবন্ধগুলো দেখতে পারেন। এব কোনটি সংবাদ, কোনটি মতামত তা লক্ষ্য রাখতে পারবেন।

যদি নিউইয়র্ক টাইমসের মতো সংবাদ মাধ্যম তাদের সংবাদ প্রতিবেদনের পাশাপাশি পৃথক এবং শক্তিশালী মতামত বিভাগটি জনসাধারণের কথোপকথন উপস্থাপনে অব্যাহত রাখেন, তবে সেই মাধ্যমগুলোকে অবশ্যই ‘সংবাদ ও মতামত’ সম্পর্কে সংবাদ ভোক্তাদের বোঝানোর জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করতে হবে এবং ‘সংবাদ এবং মতামত’–এর মধ্যে সেই বিদ্যমান ‘প্রাচীর’ কি, তা পাঠকদের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে হবে। এতে করে পাঠকও বিস্তারিত বুঝে নেবেন এবং মতামত বিভাগে লেখকের মত প্রকাশের দায়ে জেমস বেনেটের মতো মেধাবী সম্পাদকদেরও বিপাকে পড়ে পদত্যাগ করতে হবে না।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন