বিজ্ঞাপন

এবার আবার যাওয়া যাক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে। পৃথিবীর এই নড়েচড়ে ওঠার সময় বাড়ির ঠিক কী কী হতে পারে তা কল্পনা করা যাক। ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন অনুযায়ী বাড়ির কোন কোন জায়গাগুলো সবচেয়ে দুর্বল তা জানা দরকার। প্রথমেই মনে পড়ে সিঁড়ির কথা। একটা বাড়িকে জোরে ঝাঁকানো হলে, ওই সিঁড়ি স্যান্ডউইচের মতো হয়ে যাবে। যারা সিঁড়ি বেয়ে পালানোর চেষ্টায় ব্যস্ত তাদের অবস্থা বলা বাহুল্য। এ ছাড়া পাতলা ইটের দেয়াল, দরজা বা যেকোনো প্রবেশ পথ, জানালার কার্নিশ, জানালার কাচও মানুষের প্রাণকে বিপন্ন করতে পারে এক মুহূর্তে। সিঁড়ি দিয়ে বেরোতে গিয়ে ওপরের দেয়াল ভেঙে মানুষের চাপা পড়ার উদাহরণ অনেক। তাঁরা নিজেদের ঘরেই ঘাপটি মেরে খাটের তলায় লুকিয়ে থাকলে এর চেয়ে কম আহত হতো নিঃসন্দেহে। ভবনের বাইরে দুর্বল কার্নিশের একটা দলছুট ইট, উড়ে আসা ভাঙা কাচের টুকরো, উড়ন্ত টিনের চাল হঠাৎ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে মানুষকে। আর শহুরে জায়গায় ইলেকট্রিকের তার ছিঁড়ে পড়লে তো কথাই নেই।

টিভিতে, খবরের কাগজে ভাঙা বাড়িঘরের ছবি দেখে ভয় পেয়ে যাই ঠিকই, কিন্তু যেখানে ঠিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন অনুযায়ী বাড়ি তৈরি হয়, সেখানে বাড়িঘর একেবারে গুঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম। প্রাচীন পন্থায় যে বাড়ি তৈরি যেমন মাটির কুঁড়েঘর, সেখানে অবশ্য বেরিয়ে আসাটাই সমীচীন। হাইতি বা নেপালেও স্থানীয় পদ্ধতিতে বাড়ি তৈরি হওয়ায় ধ্বংসের হার অনেক বেশি। আজকাল শহুরে অঞ্চলে বিশেষ করে উন্নত দেশে, বহুতল বাড়িতে ক্ষতি হলেও ভেঙে পড়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে।

বাড়িতে একা থাকলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আরও ভয় পেয়ে যায়, মনোবল পাওয়ার জন্য অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়। সেটা কোনোভাবেই করা উচিত নয়। অবশ্য শুধু বাড়িতে থাকাটাই শেষ কথা নয়। তারও একটা নিয়ম আছে। নিয়মটা হলো ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন। এই মন্ত্রটা মনে করিয়ে দেয় যেকোনো ভবন থেকে বেরোনোর চেষ্টা না করে, এমনকি এ-ঘর ও-ঘর না করে হাঁটু আর কনুইয়ের ওপর ভর করে, কাছের কোনো টেবিলের নিচে ঢুকে পড়ে, মাটির কাছে মাথাটা নুইয়ে দিয়ে দুই হাতে মাথা আগলে ঢেকে রাখা বা শক্ত টেবিলের একটা পায়া ধরে রাখা। এতে টেবিল যদি কাঁপুনির ফলে জায়গা বদলাতেও থাকে, তাহলে আপনিও তার সঙ্গে সঙ্গেই থাকবেন। বিপদের আশঙ্কা এতে কম থাকে।

এই ভঙ্গির সবচেয়ে বড় যেটা লাভ তা হলো, বাড়িতে কিছু উল্টে যদি পড়ে, দেয়াল থেকে তাক যদি খসেও যায়, গায়ে ব্যথা লাগলেও মাথা আর চোখ বাঁচবে। খাটে শুয়ে থাকাকালীন যদি ভূমিকম্প হয়, উঠে লুকোনোর মতো সময় সুযোগ না থাকলে অন্তত বালিশটা মাথায় চাপা দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকতে হবে। মাথা আর চোখ দুটি বাঁচানো অত্যন্ত জরুরি।

অনেকের বাড়িতেই আজকাল সাবেকি খাট বা পালঙ্ক থাকে না। বক্স খাটের তলায় ঢোকা অসম্ভব। কোনো একটা ঘরে অন্তত একটা খাট চারপেয়ে সাধারণ ডিজাইনের থাকা ভালো। যেই ঘরে কোনো খাট বা টেবিল নেই, ভেতরের দিকের দেয়াল ঘেঁষে ওই ড্রপ-কভার-হোল্ড অন পোজ নিয়ে দরজা জানালার দিকে পেছন ফিরে আর যথাসম্ভব দূরে থাকতে পারলে ভালো। অনেক বাড়িতেই আলমারির ওপর পাহাড় প্রমাণ জিনিস। বাড়ি হেলে গেলে সেগুলোর বৃষ্টিও কারও প্রাণ ধ্বংসের কারণ হতে পারে। টিভি, উঁচু বইয়ের তাক, ড্রেসিং টেবিলের ওপরের অংশ লম্বা স্ক্রু দিয়ে দেয়ালের সঙ্গে পোক্তভাবে জুড়ে দেওয়া উচিত।

জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয় লেগেই আছে কোনো না কোনো দিকে। সেসবের মোকাবিলা করতে স্কুল, কলেজ, অফিসে করানো হয় ‘ড্রিল’ বা প্রস্তুতি নেওয়ার মকশো। ফায়ার ড্রিল, টর্নেডো নামক ঝড়ের ড্রিল আর আর্থকোয়েক ড্রিল তাদের মধ্যে অন্যতম। আর আছে স্কুলের নিরাপত্তার জন্য ‘লক আউট’।

এবার ধরুন, বাড়ির বাইরে আছেন আপনি। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে কী করা যাবে? গ্রামের দিকে থাকলে খোলা চত্বরে বা মাঠের দিকে চলে যাবেন। মুশকিল হলো শহরের মানুষের, ফাঁকা জায়গা পাওয়া দুষ্কর। যেখানে কাছাকাছি বহুতল বাড়ি নেই, কোনো ইলেকট্রিকের তার নেই। নেই কোনো কাচের জানালা বা বড় গাছ, বড় হোর্ডিং বা গাড়ি। এ প্রায় অসম্ভব আর পথচারী না হয়ে যদি গাড়িতে থেকে থাকেন, তাহলে গাড়ি রাস্তায় থামিয়ে তার ভেতরেই যতটা সম্ভব মাথা বসে থাকতে হবে। ভুলেও গাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করবেন না। গাড়ির ভেতরেই সবচেয়ে নিরাপদ।

থিয়েটার বা স্টেডিয়ামে থাকলে চেয়ারেই মাথা গুঁজে হাত দিয়ে মাথা ঢেকে রাখতে হবে। ভূমিকম্প থেমে গেলে ধীরে ধীরে চারদিক নজর রাখতে রাখতে বেরোনো উচিত। নদীর ধারে থাকলে জেনে রাখা দরকার, নদীতে কোনো বাঁধ থেকে থাকলে বিপদের আশঙ্কা আছে। যদিও বাঁধে অত সহজে ফাটল ধরে না, তবুও পাড় থেকে সরে আসাই ভালো। সমুদ্রের ধারেও কাঁপুনির সময়টুকু ওই মাথা নিচু করা পোজ নিয়ে তারপর তীর থেকে দ্রুত গতিতে যতটা পারবেন দূরে চলে যাবেন। গাড়িতে চড়ে নয়, একেবারে পায়ে হেঁটে। ট্রাফিক জ্যাম বা গাছ-পাথর পড়ে রাস্তা অবরোধ হয়ে থাকলে ওই দুই পা-ই সবচেয়ে বড় ভরসা। সুনামির কবল থেকে বাঁচার জন্য অন্তত দুই তিন মাইল ভেতরে যাওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ে উঠতে পারলে আরও নিরাপদ।

গুগলে সার্চ করলে সারা পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটের ম্যাপ সহজেই দেখতে পারেন। ভালো খবর হলো, বাংলাদেশ কোনো প্লেটের ধারে হয়নি। বড়জোর হিমালয় অঞ্চলের বড় ভূমিকম্পের হালকা কাঁপুনি মাঝে মাঝে নাড়া দিয়ে যাবে। তবুও উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য অবশ্যই প্রস্তুতি দরকার, দরকার মানসিক প্রশিক্ষণ। বিপদ আসার আগেই বাড়ির সবার সঙ্গে আর বিশেষ করে ছোট ছেলেমেয়ে আর খুব বয়স্কদের সঙ্গে পুরো বাড়িতে সব ঘরে কোথায় কোথায় লুকোনোর জায়গা আছে তা যাচাই করা দরকার। দরজার অঞ্চল বিপজ্জনক বলে যে যেই ঘরে আছেন, সেখানে ড্রপ-কভার অ্যান্ড হোল্ড অন করুন। দেয়ালের বড় শো-পিস বা বাহারি আয়না হালকা পেরেকের ভরসায় থাকলে চলবে না। অনেকের বাড়িতে এখন টেবিল মানেই কাচের, সেগুলোর তলায় লুকোনো মোটেই নিরাপদ নয়। বাড়িতে প্রতিবন্ধী থাকলে তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজন। সময় থাকতে প্রস্তুতি নেওয়ার জুড়ি নেই।

আসল ঘটনার সময় যেখানেই থাকুন ছোটদের সামনে খুব বেশি চাঞ্চল্য দেখাবেন না। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় মানুষের ভয়ার্ত উত্তেজনা স্বাভাবিক, কিন্তু কোলাহল শৃঙ্খলাকে নষ্টও করে।

জাপান আর যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয় লেগেই আছে কোনো না কোনো দিকে। সেসবের মোকাবিলা করতে স্কুল, কলেজ, অফিসে করানো হয় ‘ড্রিল’ বা প্রস্তুতি নেওয়ার মকশো। ফায়ার ড্রিল, টর্নেডো নামক ঝড়ের ড্রিল আর আর্থকোয়েক ড্রিল তাদের মধ্যে অন্যতম। আর আছে স্কুলের নিরাপত্তার জন্য ‘লক আউট’। বিশেষ করে স্কুলের আশপাশে কোনো বন্দুকধারী আসামিকে যদি ঘোরাফেরা করতে দেখা যায় তো পুলিশের পক্ষ থেকে এই ‘লক আউট’ অর্ডার আসে। এই সব কয়েকটির ক্ষেত্রেই নিয়ম হলো, প্রশিক্ষণের সময় টুঁ শব্দটি না করা। উত্তেজনা প্রকাশ করে ফেললে অনেক খেসারত দিতে হয়।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন