default-image

সত্তর দশকের প্রথম দিকে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানে জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার চনগ্রাম নিবাসী খাইরুল আলা চৌধুরী। বড় সন্তান হিসেবে তরুণ বয়স থেকে চৌধুরী সাহেবের কাঁধে ছিল নয় বোন আর তিন ভাই নিয়ে বাবা–মাসহ বিরাট পরিবারের গুরুদায়িত্ব।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি শহর থেকে ছুটি কাটাতে এলেন হবিগঞ্জ শহরে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত মহকুমা কানুনগো কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন হবিগঞ্জ সদরে। জীবদ্দশায় বলতেন, হবিগঞ্জ শহরের বনেদি কটি পরিবারের ভালোবাসা এবং সব ছেলে–মেয়ের বেড়ে ওঠার স্মৃতি তাঁকে অন্যত্র যেতে দেয়নি।

’৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অবিভক্ত পাকিস্তানের শেষ সাধারণ নির্বাচনে খাইরুল চৌধুরী অংশ নিলেন করাচির এক ভোট কেন্দ্রে। ভোট দিলেন পুরো পাকিস্তানের ৩৮ শতাংশ অধিবাসীর দেওয়া রায়ের প্রতীক নৌকা মার্কায়। করাচি সেন্ট্রাল আসনের গণপরিষদ সদস্য পদে আওয়ামী লীগের দেওয়া টিকিটে পদপ্রার্থী হয়েছিলেন ভারত থেকে আসা এক মোহাজের। পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হওয়া আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি দেখে পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাসকারী বাঙালিদের মনে ধীরে ধীরে নানা সংশয় আর শঙ্কার দানা বাঁধতে থাকে।

খাইরুল চৌধুরী বার্ষিক পাওনা ছুটি অগ্রিম নিয়ে ঢাকা এলেন ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে। ঢাকা নেমে চলে গেলেন নারায়ণগঞ্জ শহরে পাক সার্কাস এলাকায় অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহনে কর্মরত অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনী কর্মকর্তা জেড এ চৌধুরী সাহেবের বাংলোতে, যিনি ছিলেন ওনার বড় বোনের স্বামী। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের ছোট–বড় প্রত্যেকটি শহর স্বাধিকার আন্দোলনে তখন উত্তাল অবস্থা। দেশজুড়ে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অধিকার আন্দোলন ক্রমে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিচ্ছে। পাকিস্তান সরকারের নানা বৈষম্যমূলক আচরণে পুরো দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ ও প্রচণ্ড হতাশ। নারায়ণগঞ্জ থাকা অবস্থায় শুনলেন ৭ মার্চ ঐতিহাসিক জনসভার কথা। সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি যাবেন সশরীরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ শুনতে। দুপুরের দিকে বাসে চড়ে রওনা দিলেন রেসকোর্স অভিমুখে। গুলিস্তানে নেমে দেখলেন চারদিক লোকে লোকারণ্য। হাজার হাজার বাঙালি প্ল্যাকার্ড আর ফেস্টুন আর বড় বড় লাঠি হাতে নিয়ে ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিতে দিতে সভা মঞ্চের দিকে পাগলের মতো ছুটছে। বিশাল বিশাল মিছিলের পাশাপাশি দেখলেন গুলিস্তান বায়তুল মোকাররমসহ রেসকোর্স ময়দানের আশপাশে প্রচুর পুলিশের উপস্থিতি। কোথাও আবার বড় বড় সামরিক ট্রাকে সঙিন উঁচিয়ে পাকসেনারা চোখমুখ শক্ত করে পাহারা দিচ্ছে। বঙ্গবন্ধু মঞ্চে ওঠার আগেই পৌঁছলেন রেসকোর্স মাঠের এক পাশে।

স্মৃতি হাতড়ে বললেন, মানুষ পাগলের মতো ছুটে আসছে স্লোগান দিতে দিতে। চারদিকে শুধু স্লোগান আর স্লোগান। জনগণের চোখেমুখে প্রতিরোধ আর প্রতিবাদের আগুন। এসবের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেষ করলেন তার কালজয়ী ভাষণ। পরদিন ২৪ মার্চ ট্রেনে চেপে চলে আসলেন হবিগঞ্জ শহরের নিজ বাসায়। আওয়ামী লীগ নেতা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরীর নেতৃত্বে হবিগঞ্জ শহরে চলছে জোর প্রতিরোধ আন্দোলন। পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প তৈরি করেছে হবিগঞ্জ শহরের অদূরে শায়েস্তাগঞ্জের চৌমুহনীর পাশে।

বিজ্ঞাপন

২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যার খবর হবিগঞ্জে পৌঁছার পর সারা শহরে থমথমে অবস্থার চিত্র আজ ৫০ বছর পরও ভুলতে পারছেন না সরকারি ব্যাংকের চাকুরে খাইরুল চৌধুরী। শহরে পাকিস্তানি বাহিনীর তৎপরতা শুরু হলে পুরো পরিবার চলে গেলেন শহরের নিকটবর্তী রিচি গ্রামে। এরই মধ্যে তৎকালীন হবিগঞ্জ মহকুমা কারাগারে ৯ এপ্রিল ঘটে গেল এক ঘটনা, যা তখনকার সময়ে যুদ্ধকালীন ঘটনা বলা হলেও, বাস্তবতার নিরিখে সেখানে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। হবিগঞ্জ মহকুমার সীমান্ত এলাকার অনেক চা বাগানে পাহারাদার হিসেবে কর্মরত প্রায় ৩৭ জন পশ্চিম পাকিস্তানি, যাদের অধিকাংশ ছিল পাঠান। নিরাপত্তার জন্য তাদের সবাইকে রাখা হয় মহকুমা সাব জেলে। শহরের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন গণপরিষদ সদস্য কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী।

১০ এপ্রিল সকালে শোনা গেল, কিছু সশস্ত্র লোক জেলে থাকা নিরস্ত্র পাঠানদের হত্যা করে। বৃন্দাবন কলেজের অদূরে পুরোনো জেলের পাশে আবাসিক এলাকা রাজনগর কোয়াটার্সে অবস্থানরত খাইরুল চৌধুরী নিজেই গোলাগুলির আওয়াজ শুনেছেন। সকালে বাসার পাশেই পুরোনো জেলে গিয়ে সারিবদ্ধ সেই মরদেহগুলো নিজের চোখে দেখেন। কেন সেই হত্যাযজ্ঞ হলো, তার অনেক কারণ থাকতে পারে। তবে এই ঘটনা যেহেতু মার্চের উত্তাল সেই দিনে ঘটে, তা ইতিহাসে যুক্ত থাকার দাবি করে বলে তিনি মনে করেন। একদিন সুযোগ বুঝে বাবার কাছে ভারতে পাড়ি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি চাইলেন। পিতা অমত না করে সংসারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে পরিবারের দায়িত্বের বিষয় স্মরণ করিয়ে দিলেন। সেই সময়ের কঠিন বাস্তবতা এত সহজে অতিক্রম করা সহজ ছিল না। মে মাসে সিদ্ধান্ত নিলেন চাকরিতে যোগ দিতে করাচি যাবেন।

রাস্তাঘাটে চলাচল যেমন স্বাভাবিক ছিল না, তেমনি নিরাপত্তার অভাব ছিল প্রচুর। কয়জন সঙ্গী জোগাড় করে পায়ে হেঁটে রওনা দিলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে। যাত্রাপথে বিরতি নিলেন নাসিরনগর সৈয়দ বাড়িতে। সেখানে ইতিমধ্যে বাইরের অনেক লোকের বিরাট সমাগম হয়। ১২ দিন সৈয়দ বাড়িতে অবস্থানকালে অতিথি সেবায় কোনো ত্রুটি চোখে পড়েনি তাঁর।

নাসিরনগর থেকে কখনো বাসে, আবার কিছুটা পথ হেঁটে নানা বাহন ধরে ঢাকা পৌঁছলেন মে মাসের শেষ দিকে। অবরুদ্ধ ঢাকা শহর পুরো বদলে গেছে। শহরজুড়ে পাকিস্তানি বাহিনীর জোরালো তৎপরতা। পরিচিত অনেক পরিবারে স্বজন হারানোর কান্না আর কষ্ট। এসব শুনে মন খারাপ হলেও কঠিন বাস্তবতাকে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েই চড়ে বসলেন করাচিগামী পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসে। তেজগাঁও এয়ারপোর্টে ঢোকার মুখে বিরাট বাংকারসহ এখানে–সেখানে সামরিক পাহারা ও প্রতিরোধ স্থাপনা, যা দেখে দেশে যে স্বাভাবিক অবস্থা চলছে না, তা আর বলে দিতে হয় না। করাচিগামী বিমানে আরোহণের অপেক্ষায় বসে আছেন মাত্র দুজন সাধারণ যাত্রী। মনে বারবার শঙ্কা জাগছে, শুধু দুজন যাত্রী নিয়ে কি প্লেন উড়বে?

শেষ ঘোষণা শুনে বিমানে উঠে চক্ষু চড়কগাছ। পুরো বিমানের ৯৫ শতাংশ আসনে বসা প্রায় ২০০ আহত পাকিস্তানি সৈন্য ও অন্যান্য বাহিনীর লোক। তাদের সবাই কমবেশি আহত। কারও আঘাত গুরুতর। খাইরুল চৌধুরীর ভাষায় ওনার পাশে বসা এক সৈনিকের বুক থেকে নাভি পর্যন্ত পুরু ব্যান্ডেজ করা আর সারাক্ষণ ব্যথায় কাতরাচ্ছে। কেউ কেউ কষ্টে উচ্চ স্বরে আল্লাহকে ডাকছে। বিমান বালারা দৌড়াদৌড়ি করে কাউকে ব্যথানাশক বড়ি এবং পানীয় দিয়ে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। এতসবের পরও পুরো প্লেন যেন ক্রমে হয়ে যাচ্ছে নরকের একটি অংশ। চুপ করে বসে আছেন। পুরো উড়োজাহাজভর্তি আহত পাকিস্তানি সেনাদের মধ্যে মাত্র দুজন সাধারণ যাত্রী।

মনে মনে ভাবছেন, যুদ্ধের শুরুতে বাংলার মুক্তিকামী জনগণ আর প্রশিক্ষণ ছাড়া দেশের জন্য যুদ্ধে নেমে পড়া মুক্তিসেনাদের আঘাত আর কামড়ে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি বাহিনীর যদি এই অবস্থা হয়, তবে কিসের ভিত্তিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের এ দেশীয় দালালেরা হুংকার ছুড়ে বলে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দুনিয়ার সেরা বাহিনী। এত দেখি সব ভুয়া আর মিথ্যা প্রচার। শেষ বিস্ময় ছিল, বিমান থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এগোচ্ছি করাচি টার্মিনালের দিকে। বাঁ পাশে তাকিয়ে দেখি, কমপক্ষে শ খানেক কফিন। যার ভেতরে শুয়ে আছেন নিজ দেশের নিরীহ জনতাকে হত্যার দায় নিয়ে মৃত্যুবরণ করা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। যাদের প্রশিক্ষণ আর যুদ্ধাস্ত্র ছিল বিশ্বমানের। অন্যদিকে শুধু দেশকে ভালোবেসে ওদের কফিন বন্দী করল বাংলার দামাল সন্তানরা।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন