আর্টিস্ট সৃষ্টি করা যায় না, আর্টিস্ট জন্মায়। ঘষেমেজে একটা জায়গা অবধি যাওয়া যায়। কিন্তু একজন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হওয়া যায় না। তাঁর ধী শক্তি, মেধা, নিজেকে সতত উন্নত করার চেষ্টা, তাঁকে কিংবদন্তির মর্যাদা দিয়েছে। তিনি নিজেকে নিরন্তর ভেঙেচুরে নতুনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতেন। যেটা আমি বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে দেখিনি। আজীবন বামপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী শিরদাঁড়া সোজা করে থাকা এক প্রতিভা।

সৌমিত্রদার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় ২২ বছরের। কাজের সূত্রে পরিচয়। পরে সেটা পারিবারিক হয়ে যায়। ওনার অসম্ভব স্নেহ পেয়েছি। আসলে মানুষটা কাজ ভালোবাসতেন। তাই, যারা সত্যিকারের ক্রিয়েটিভ (সৃষ্টিশীল), তাদের স্নেহ করতেন। অনুপ্রেরণা দিতেন। অসংখ্য কাজের স্মৃতি দাদার সঙ্গে। কোনটি ছেড়ে কোনটি বলব! আড্ডা, গান, গল্প সেই সবেরও স্মৃতি অসংখ্য। কলকাতা, কলকাতার বাইরে বহু প্রোগ্রাম করেছি এক সঙ্গে। প্রোগ্রাম শেষে তাঁর যেকোনো পরামর্শ মাথা পেতে নিতাম। তিনি খুব নিরিবিলি মানুষ ছিলেন। কাজের মধ্যে ডুবে থাকতেন সব সময়। কখনো ফোন করে বা এসএমএস করে না পেলেও তিনি সব সময় ফোন ব্যাক করতেন। সামান্য পরিচিতি পেলেই এখন অনেককে দেখি অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না। কিন্তু দাদার কাছে শিখেছি, ভদ্র ব্যবহার করাটা পেশাদারিরই অংশ।

বিজ্ঞাপন

এত বড় শিল্পী ছিলেন, অথচ যেকোনো প্রোগ্রামের অন্তত ১/২ ঘণ্টা আগে চলে আসতেন। সম্ভব হলে গ্রিন রুমে রিহার্সাল করে নিতেন। এত রিহার্সাল করে আসতেন যে, বলার নয়! সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে টোটালিটি বা পূর্ণতার কথা বলি, সেটা তার মধ্যে ছিল। মানুষ হিসেবে খুব মেথডোলজিক্যাল ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে হয়তো অনেকে অনেক কথা বলতে পারেন। আমি সেসব তর্কে যাব না। আসলে তাঁর পজিটিভ দিক এত ছিল যে, সেটা নিতে পারলে জীবন পথে উন্নতি করতে পারব।

দাদা’—এই শব্দেই তাঁকে ডাকতাম। এখনো দাদা বলেই ডাকব। তিনি তো শুধু স্টার ছিলেন না। আমাদের অভিভাবক ছিলেন। কত অনুষ্ঠান, কত রেকর্ডিং, কত যে অভিজ্ঞতা আছে বলে শেষ করা যাবে না। আমাকে আর দেবজিতকে খুব স্নেহ করতেন। এটা আমরা অনুভব করতাম। আসলে যেখানে সৌমিত্রদা প্রতিভার স্ফুরণ দেখতেন, সেখানেই আপনার দৃষ্টিতে স্নেহধারা ঝরে পড়ত। দাদা, দীপা বৌদি, মিতিল—সবাই আমাদের খুব আপন। তাঁরাও আমাদের খুব আপন করে নিয়েছিলেন। মনে পড়ে, শিলিগুড়ি প্রোগ্রামে গিয়ে দাদা অসুস্থ হলেন, সেখানে সারা রাত নার্সিংহোমে সঙ্গে রাত জেগেছিলাম অনেকের সঙ্গে।

সব মনে পড়ে দাদা। ভরসা করতেন আমাদের। কাজের প্রতি ভালোবাসা, নিষ্ঠা তাঁকে মহিরুহ করে তুলেছিল। চিরজীবন বামপন্থী মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। শত চাপেও মাথা নোয়াননি। এসব কিছু আপনার কাছে শিখেছি দাদা। আমাদের আর্কাইভ দেখে শিশুর মত খুশি হয়েছিলেন। কত কিছু নিয়ে যে গল্প করতাম। কত কিছু যে শিখেছি। শুধু মিতিল, বিলুদের শূন্য করে দাদা চলে গেলেন না। আমরাও শূন্য হয়ে গেলাম। আজ কত কথা মনে পড়ছে দাদা। কত কিছু লেখার আছে দাদাকে নিয়ে। সব লিখব দাদা। ভালো থাকবেন। বাঙালির সৌভাগ্য, তারা তাঁকে পেয়েছিল। মূল্য বুঝেছে কিনা জানি না। কিছু মানুষের মনে আপনি আলোকশিখা হয়ে থাকবেন। কিছু মানুষকে আপনার শিক্ষা পথ দেখাবে।

অনুলিখন: মনিজা রহমান

মন্তব্য পড়ুন 0