default-image

জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট। তিনি মনে করেন, সামনে অনেক কাজ। তাই সময় অপচয় না করে ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম কার্যদিবসেই ১৭টি নির্বাহী আদেশে সাক্ষর করেছেন।

বাইডেন তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢুকেছেন হোয়াইট হাউসে। এই রাজনৈতিক জীবনে দেখেছেন অনেকের উত্থান-পতন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবেও ছিলেন অনেক দিন। অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেক। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হয়তো তাঁর চেষ্টা থাকবে প্রতিশ্রুতি পূরণের।

কিন্তু কংগ্রেসে যদি রিপাবলিকানদের সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে না পারেন, তাহলে সামনের পথ চলা কঠিন হয়ে যাবে। যদিও সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ।

মানুষ গত চার বছরে ট্রাম্পের অনিয়ন্ত্রিত কথাবার্তায় অস্থির হয়ে গিয়েছিল, তারা মুক্তি চেয়েছে। ট্রাম্পের মতো এমন বাজে প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রে আর আসেনি—এটাই ভেবেছে মানুষ। যার ফলে বাইডেনকে অনেক স্বপ্ন নিয়েই ভোট দিয়েছে। চেয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র আগের অবস্থায় ফিরে আসুক, ফিরে আসুক সেই গণতন্ত্র, সেই পারস্পরিক সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে কাজ করার পরিবেশ। ট্রাম্পের কারণে রাজনীতিতে এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা চলে এসেছিল, যা এর আগে কখনো যুক্তরাষ্ট্রবাসী দেখেনি। যুক্তরাষ্ট্র একটা গণতান্ত্রিক সমুন্নত দেশ, এখানে সুনাগরিকেরা চায় গণতন্ত্র মজবুত থাকুক। তাই, তারা এবার ভোটে জো বাইডেনকেই বেছে নিয়েছে।

সংগতকারণেই জনগণের চাওয়াটা একটু বেশি বাইডেনের কাছ থেকে। স্পাইডারম্যান মুভির একটা ডায়ালগ আছে, With great power comes great responsibility। এই ছোট গুরুত্বপূর্ণ কথার মতোই বাইডেন এখন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী, তাই তার দায়িত্বও এখন অনেক। আর নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জনগণকে, তা এখন পূরণ করাও কর্তব্য। ব্যক্তি বাইডেন হয়তো সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, কিন্তু তাঁর একক সিদ্ধান্তে আর আইন পাশ হবে না। এখন সাংবিধানিক বিষয় আছে, আছে নীতিনির্ধারকেরা, আছে কংগ্রেসের উচ্চ কক্ষের সিনেটররা, আছে নিম্ন কক্ষের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা। এদের নিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। আর সমস্যা যে একেবারে হবে না তা নয়। কারণ, ট্রাম্প ক্ষমতার বাইরে থাকলেও সিনেটে রিপাবলিকানদের ৫০ ও ডেমোক্র্যাটদের ৫০ সদস্য—সমানে সমান, শুধু কমলা হ্যারিসের ভোটের কারণে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। কোনো বিল পাশ করতে হলে ৬০ জনের মতামতের প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে জো বাইডেনকে রিপাবলিকানদের সহযোগিতা নিতে হবে। তিনি এর মধ্যে ঐক্যেরও ডাক দিয়েছেন। সবাইকে নিয়ে তিনি কাজ করতে চান। কিন্তু রিপাবলিকানরা এত সহজে ছাড় দেবে বলে মনে হয় না। ইতিমধ্যে তারা অভিশংসনের ব্যাপারে ট্রাম্পের পাশে থাকবে এমন কথাই বলছে।

স্পিকার ন্যান্সি বলেছেন, ট্রাম্পকে অভিশংসন করা নিয়ে সিনেটে আলোচনা হবে। কিন্তু রিপাবলিকানরা বলেছেন, প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করা যায়, কিন্তু ট্রাম্প তো এখন সাবেক। আর এমন নিয়মও নেই যে, চাইলে সাবেক প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করা যাবে, এমন পরিস্থিতি আগে আসেনি। তাই এ নিয়ে চলছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। এদিকে করোনায় বিপর্যস্ত দেশ, ফলে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে, বাড়ছে বেকারত্ব। চলছে রাজনীতি ও ক্ষমতা নিয়ে দুই দলের হিসাব-নিকাশ। ক্ষমতার চেয়ে এখন ক্ষমতায় বসে প্রতিশ্রুতি রক্ষা কঠিন হবে বাইডেনের জন্য।

বিজ্ঞাপন

বাইডেন এমন একটা সময়ে ক্ষমতা পেয়েছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র অনেক সমস্যায় জর্জরিত। বিশেষ করে বেকারত্ব ও অর্থনীতি। করোনাভাইরাস এমনভাবে জেঁকে বসেছে, ইতিমধ্যে চার লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা প্রভাব ফেলেছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অর্থনীতির গ্রাফ নিচের দিকেই বলা যায়। ফলে বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে সামাজিক অসংগতি। বিভিন্ন রাজ্যে চুরি, ছিনতাইয়ের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। অতীতে যা কখনো দেখেনি মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্র উন্নত রাষ্ট্র, সাধারণত মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। অনেকের অর্থের ঝনঝনানি না থাকলেও সংসার চলে যেত অনায়াসে সাধারণ কাজের মধ্য দিয়ে। কিন্তু চাকরি হারিয়ে অনেকে নিঃস্ব বলা যায়। যদিও সরকার ভাতা দিচ্ছে। কিন্তু কতদিন? ভবিষ্যৎ ভাবনায় অস্থির অনেকে। আর বর্তমানে যে করোনা পরিস্থিতি, তাতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে অনেক সময় লাগবে। ভ্যাকসিন নিলেও মানুষ স্বস্তিতে নেই। তা ছাড়া বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গেও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তেমন ভালো নেই ট্রাম্পের কারণে। ইউরোপসহ অনেকে দেশকেই মিত্র থেকে শত্রুতে পরিণত করেছেন ট্রাম্প। তা ছাড়া চীনের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। আর চীনও অত সহজে ধরা দেবে বলে মনে হয় না। কারণ, তারা অর্থনীতি, শিক্ষা, গবেষণায় আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। বরং বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে চীন হতে যাচ্ছে বিশ্বের মোড়ল। তাই, কূটনৈতিক সম্পর্ক চীনের সঙ্গে কতটুকু এগোবে, তা ভাবার বিষয়।

তবে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে, বাইডেন যে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দেওয়ার কথা বলেছেন তা নিয়ে। যারা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আছে, কিন্তু তাদের বৈধ কাগজপত্র নেই—তারা ভবিষ্যতে বৈধতা পাবেন, এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। প্রথমে পাঁচ বছরের জন্য গ্রিনকার্ড এরপর নাগরিকত্বের জন্য আরও তিন বছর। তবে শর্ত আছে অনেক। এর মধ্যে যে শর্ত সবচেয়ে বেশি দেখা হবে, তা হলো অবৈধ অভিবাসীর অপরাধ রেকর্ড আছে কিনা? থাকলে তিনি এ আওতায় নাও আসতে পারেন। তাঁর এমন কথায় অনেকে আশ্বাসের পথ দেখেছেন, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে থেকে ও সততার সঙ্গে কাজ করেও বৈধতা পাননি। তারা যেন অন্ধকারে আলোর পথ দেখছেন। তবে এই আইন পাশ করতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন বাইডেন। এদিকে মুসলিম প্রধান দেশ থেকেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছেন, যা ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প করেছিলেন।

ব্যক্তি জো বাইডেন একজন সহনশীল মানুষ। বিপরীত মতামতকে তিনি সব সময় গ্রহণ করেছেন। তিনি প্রথম এক শ দিন কী করবেন, তার একটা খসড়া প্রকাশ করেছেন। বিষয় সেটি নয়, বিষয় হলো দেশ চালাতে হলে বিরোধী দলের সহযোগিতা প্রয়োজন। কেননা, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, বেকারত্ব ঘোচানো, করোনা মহামারি মোকাবিলা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু। সব মিলিয়ে রিপাবলিকানদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, রিপাবলিকান অর্থাৎ ট্রাম্প কিন্তু কম ভোট পাননি, তারা বিরোধী দলে থাকলেও শক্তিশালী বিরোধী দল। এমন কিছু রাজ্য আছে, যেখানে খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে ডেমোক্র্যাটপ্রার্থী জিতেছেন। সেসব রাজ্যের জনগণ কিন্তু এখন বাইডেনের কাছ থেকেই প্রত্যাশা করবে এবং তার প্রতিটি কাজেই আলোচনা–সমালোচনার আয়নায় দাঁড় করাবে। অত সহজে ডেমোক্র্যাটদের ছাড় দেবে না।

রাজনীতিতে আজ যে শত্রু, কাল সে মিত্র হয়ে যায় স্বার্থের কারণে। বাইডেনের পক্ষে আজ কারা আছে, কংগ্রেসে অধিবেশন শুরু হলে সেটি বোঝা যাবে। তারা কী সত্যি বাইডেনকে সহযোগিতা করবে, নাকি আলোচনা করে করে সময় কাটিয়ে দেবে।

আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক বিষয় একটু জটিল, তাই চাইলে একজন রাজনীতিবিদ যা খুশি করতে পারে না। কিংবা প্রেসিডেন্ট। তাঁকেও জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। বাইডেন তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হলে রীতিমতো তাকে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। ট্রাম্প ক্ষমতায় না থাকলেও তার দলের দাপুটে নেতারা কিন্তু কংগ্রেসে থেকেই যাচ্ছেন। তারা সহজে বাইডেনকে ছাড় দেবে না। তা ছাড়া বাইডেন বয়সের ভারেও নুইয়ে পড়েছেন। যদিও সঙ্গে আছে চৌকস বুদ্ধিদীপ্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।

মূলত কমলা হ্যারিসকে বাইডেনের ডান-বাম হয়ে কাজ করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হলো, অনেকে হ্যারিসকে পছন্দ করে না, যদিও তা অনুচ্চারিত।

বিজ্ঞাপন

বাইডেন চুয়াল্লিশ বছর ধরে রাজনীতি করছেন। তার অভিজ্ঞতার ভান্ডার অনেক। রাজনীতির আঁকাবাঁকা পথ তার চেনা। কোথায় কীভাবে কখন কোনো পদক্ষেপ নিতে হবে, তা তিনি ভালোভাবেই জানেন। ক্ষমতার উচ্চ শিখরে গিয়ে একা কিছু করা যায় না, তাকে তার নিজের দল ও বিরোধী দলের সহযোগিতা নিয়েই কাজ করতে হয়। বাইডেন এখন দায়িত্বের শিখরে বসেছেন। এই দায়িত্ব পালনই তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যাবে। কারণ তিনি যে জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা পূরণ করা সহজ নয়। অনেক সময় নিজ দলের নেতারা বিরোধিতা না করলেও চুপ থাকে, আর এই চুপ থাকা বিব্রতকর।

এতে সুবিধা পায় অন্যপক্ষ। রিপাবলিকানরা ছক কষছেন, কীভাবে বাইডেনকে কংগ্রেসে আটকাবেন। ট্রাম্প তার তুরুপের তাস মারবেন কংগ্রেসেই। বিশেষ করে উচ্চ কক্ষ সিনেটে। ৫০ আসন আছে। তিনি না থাকলেও তার দলের চৌকস নেতাদের দিয়ে করিয়ে নেবেন। সেখানেই আটকে যেতে পারেন বাইডেন। যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তাতে কয়টা কাজ তারা করতে পারবেন রিপাবলিকানদের সহযোগিতা ছাড়া? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রিপাবলিকানরা আগামী চার বছর পর কী করে ট্রাম্পকে নিয়ে আবার ফিরতে পারবেন, তার জন্য যা করা দরকার তারা তাই করবেন।

আমাদের এখন দেখার পালা, জো বাইডেন কত দূর প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেন।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন