default-image

ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনের বারান্দায় বসে কাঁদছে মেয়েটি। বন্ধুরা সব ঘিরে বসে আছে। সবার হৃদয় ভারাক্রান্ত আজ। মেয়েটি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী। ধরা যাক, তাঁর নাম শিরিন। হ্যাঁ, মেয়েটি নিহত যুবকের প্রেমিকা। গত রাতে নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের ছেলেদের ছোড়া গুলিতে নিহত হয়েছে যে ছেলেটি, তাঁর নাম রাউফুন বসুনিয়া। এই মেয়েটির সাথে তাঁর প্রেম ছিল; হৃদয়ের সম্পর্ক। এই ছেলের মধ্যে যে প্রেমিক মন ছিল, তার সঙ্গে মন বেঁধেছিল শিরিনের। ওদের সবাই ‘শিরি-ফরহাদ’ ডাকত। বিশ্ববিদ্যালয় ছুটি হলে বাসভর্তি করে ওরা রংপুর-কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরত। অনেকের ভিড়ে এই দুজন কেমন যেন এক ছিল। ওদের বন্ধু ছিল দীপা, বেবী, সেলিম, শেলী। বাস আরিচা ঘাটে ফেরি পেয়ে গেলে ওরা দেরি না করে উঠে যেত সিঁড়ি বেয়ে ওপরে। পরোটা-ডিম মামলেট, আর চা; সঙ্গে আড্ডা। ফ্রয়েড থেকে ম্যাক্স ওয়েভার, হার্বার্ট স্পেনসার কোথায় না বিচরণ করত তারা। আফসারউদ্দিন স্যার থেকে রঙ্গলাল সেন—সবাই এসে যেতেন তাঁদের গল্পে-আলোচনায়।

একসঙ্গে লাইব্রেরি ওয়ার্ক, পলাশির বাজার, কিংবা নিউমার্কেটে যেত দুজন। শিরি আর বসুর চমৎকার বোঝাপড়া ছিল। অপরাজেয় বাংলার সামনের ঘাসে বসে বাদাম-ঝালমুড়ি খাওয়া, টিএসসি মধুর ক্যানটিনে চা-শিঙাড়া খাওয়া, নাটক দেখতে বেইলি রোডে যাওয়া, নাটক দেখে টাঙ্গাইল শাড়ি কুটির থেকে একটা জরিপাড় শাড়ি কেনা, কখনো পাবলিক লাইব্রেরি থেকে কোনো রেফারেন্স বই নিয়ে শিরিনের চুলে শাহবাগের মোড়ের ফুলের দোকান থেকে বেলি ফুলের মালা কিনে দেওয়া—এই সবই চলতে থাকে।

রাউফুন বসুনিয়া কুড়িগ্রাম জেলার রাজারহাট উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম নজরুল ইসলাম। তিনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। মা ফিরোজা বেগম ছিলেন গৃহিণী। পাইকপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বসু প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এর পর পাঙ্গারাণী লক্ষ্মীপ্রিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষ করেন। উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন রংপুরের ঐতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ থেকে। তারপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এখানেই শিরিনের সঙ্গে পরিচয়।

বিজ্ঞাপন

জাগো বাহে, কুনঠে সবাই? নূরলদীনের কথা মনে আছে? সেই বৃহত্তর রংপুরের কুড়িগ্রামের এক অজ-গ্রাম থেকে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন যে যুবক, রাউফুন বসুনিয়া তাঁর নাম। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনে, মিছিলে-মিটিংয়ে উজ্জ্বল উচ্ছল এক যুবক। মাথাভর্তি কোঁকড়া চুল। কথা বলতেন, যেন স্ফুলিঙ্গ। পড়াশোনায় তুখোড়।

বাঙালি কখনোই অন্যায় অবিচারের কাছে মাথা নত করেনি। সব সময় তারা রুখে দাঁড়িয়েছে। আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছিল। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এর সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ। ১৯৮২ সালে সামরিক জান্তা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করলেন, তখনো দেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি। সারা দেশে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। বরাবরের মতো এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ছাত্র সমাজ, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এই সময় রাউফুন বসুনিয়া ছিলেন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগের’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক। সামরিক-জান্তা সরকার আন্দোলনকে রুখতে ‘নতুন বাংলা ছাত্রসমাজ’ নামে নতুন একটি দল গঠন করে। আসলে তারা ছিল সরকারের গুন্ডা বাহিনী। এদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়। তাদের কাজ ছিল সহিংসভাবে ছাত্র আন্দোলনকে প্রতিহত করা। এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো দখল করে। ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে ঘৃণ্য এই রাজনীতি শুরু হয় আশির দশকে।

১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টার দিকে নিত্যনৈমিত্তিক প্রস্তুতি হিসেবে একটি মিছিল সূর্যসেন হল, মহসীন হল হয়ে জহুরুল হক হল ও এফ রহমান হলের মধ্যবর্তী সড়কে ওঠার মুহূর্তেই এফ রহমান হল থেকে মিছিল লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে সরকার সমর্থক নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের সন্ত্রাসীরা। মাথায় গুলি লাগে এক যুবকের। ঢলে পড়ার আগেই সহযোদ্ধারা তাঁকে ধরে ফেলেন। ঢাকা মেডিকেল নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। এই যুবক আর কেউ নন; বাকশাল সমর্থিত জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাউফুন বসুনিয়া। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। চিকিৎসকেরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারেননি তাঁকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠন নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের গুন্ডাদের গুলিতে নিহত হন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১৯৮৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মদদপুষ্ট ছাত্র সংগঠন নতুন বাংলা ছাত্র সমাজের সশস্ত্র গুন্ডাদের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রাণ হারান রাউফুন বসুনিয়া। কুড়িগ্রামের এক পিতামাতা হারান তাঁদের সন্তানকে। শিরিন নামের এক প্রেমিকা হারান তাঁর প্রেমিক,বন্ধু, স্বপ্নের নায়ককে। রাউফুন বসুনিয়া ছিলেন তৎকালীন বাকশাল সমর্থিত ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগের নেতা। মৃত্যুর সময় সমাজবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন তিনি।

এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্রনেতা এখন চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামে, তাঁদের পারিবারিক কবরস্থানে। গাছপালা ঘেরা শ্যামল প্রকৃতি, পুকুরের স্নিগ্ধ-স্বচ্ছ জলের পাশে তিনি শুয়ে আছেন বড় নীরবে-নিভৃতে।

কবি মোহন রায়হানের ভাষায় বলি—

‘বসু তোমাকে মনে পড়ে

রিপার বিয়েতে তুমি বলেছিলে

অ্যাকশনে আপনার আর আগে থাকার দরকার নেই,

আমরা তো আছি

বসু, তুমি রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে সে কথা প্রমাণ করে গেলে

বসু, তুমি আমার শ্রেষ্ঠ ভালোবাসার একটি রক্তকরবী বৃক্ষ।’

মন্তব্য পড়ুন 0