টানা সাড়ে ছয় মাস বন্ধ থাকার পর সশরীরে বা ইনপারসন ক্লাসের লক্ষ্যে স্কুল খোলার একদিন পরই ৩ নভেম্বর আবার নিউইয়র্ক নগরের তিন শতাধিক স্কুলে ছুটি ঘোষণা করা হলো। ব্রুকলিন ও কুইন্সের অর্থোডক্স ইহুদি অধ্যুষিত এলাকার এসব স্কুলের পাশাপাশি রেস্টুরেন্ট, অত্যাবশ্যকীয় নয়—এমন ব্যবসা-বাণিজ্যও বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন মেয়র বিল ডি ব্লাজিও।

কিন্তু অঙ্গরাজ্যের গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমো শুধু দু শ প্রাইভেট ও এক শ পাবলিক স্কুলে ছুটি ঘোষণা করেন। এই নয় জিপকোড এলাকায় করোনা সংক্রমণের হার অঙ্গরাজ্যের গড় ৩ শতাংশর চেয়ে বেশি। নিউইয়র্ক নগরে ১১ লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জন্য পনেরো শতাধিক পাবলিক স্কুল রয়েছে। অন্য স্কুলগুলোতেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে ক্লাস চালানো হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা নগণ্য।

নগরের মেয়র কার্যালয়ের তথ্যমতে, এলাকাগুলো হচ্ছে ফার রকঅ্যাওয়ে (১১৬৯১), বরো পার্ক (১১২১৯), গ্র্যাভসেন্ট/হোমক্রেস্ট (১১২২৩), মিডউড (১১২৩০), বেনসনহার্স্ট/ ম্যাপেলটন (১১২০৪), ফ্ল্যাটল্যান্ডস/ মিডউড (১১২১০), গেরিটসেন বিচ/ হোমক্রেস্ট (১১২২৯), কিউ গার্ডেন (১১৪১৫) ও কিউ গার্ডেন্স হিলস/ পমোনক (১১৩৬৭)। এসব জিপকোডভুক্ত এলাকায় প্রতিনিয়ত সংক্রমণ বাড়ছে।

নিউইয়র্ক নগরে গড় সংক্রমণ হার দেড় শতাংশ হলেও এই নয় এলাকায় এ হার গড়ে ৩ শতাংশের বেশি। গত মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে জুন পর্যন্ত এই নগরে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ২৪ হাজার মানুষ মারা গেছে। সেই ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষদের বেপরোয়া আচরণে পুনরায় সবার মধ্যে গভীর শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এসব স্কুলের শিক্ষার্থীরা পুনরায় অনলাইনে ক্লাস করবে নিজ নিজ বাসায় থেকে। দু সপ্তাহে যদি সংক্রমণের হার ৩ শতাংশের নিচে নামে, তাহলে আবারও স্কুলগুলো খোলার অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে গভর্নর কার্যালয়। তবে প্রচুরসংখ্যক শিক্ষক রিমোট ক্লাস নেওয়ার জন্য সাইন-আপ করায় শিক্ষা বিভাগ এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল খুললেও এর প্রস্তুতি নিতে আমরা আগে থেকেই স্কুলে যেতে শুরু করি। এক হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র এক শ শিক্ষার্থী স্কুলে ইনপারসন শিক্ষার জন্য সাইন-আপ করেছে। বাকিরা রিমোট লার্নিং বেছে নিয়েছে। যারা রিমোট লার্নিং বেছে নিয়েছে, তারা বই ও ল্যাপটপ সংগ্রহের জন্য এল। আবহাওয়া ভালো থাকায় স্কুলের খেলার মাঠে সব শিক্ষক টেবিল নিয়ে বসে বই বিতরণ করলেন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ‘নিউ নরমাল’ জীবন শুরু হলো। প্রতিদিন শিক্ষা বিভাগের ওয়েবসাইটে লগইন করে চারটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। এটা হচ্ছে ভবনে ঢোকার ক্লিয়ারেন্স, যা আপনাকে সিকিউরিটি গার্ডকে দেখাতে হয়। সকাল ৭টায় আমরা ছয় ফুট দূরত্ব বজায় রেখে প্রবেশ করি স্কুল ভবনে। তারপর তাপমাত্রা নেওয়া হয় আমাদের স্কুল সিকিউরিটি মারিয়া ও ম্যাগানের তত্ত্বাবধানে। তারপর অফিস শুরু। অফিসে ইনপারসন কাউকে আর প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না। ফোন বা ওয়েবপেজে গিয়ে আগে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিরাপত্তা বিভাগের মাধ্যমে স্কুলের দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। নির্দিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে অথবা কম্পিউটার শিক্ষকের সঙ্গে অথবা অফিসে দেখা করে প্রয়োজনীয় সাহায্য নিতে পারে। অফিসের সব কাজের বিবরণ ই-মেইলে পাঠানো হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোন ক্লাসে কতজন, কোন দিন কারা আসবে—সেগুলো ভাগ করে নিয়ে শিক্ষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।

খেলার মাঠ থেকে কোন প্রবেশপথ দিয়ে কোন শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কখন প্রবেশ করবে, তার নির্দেশনাও থাকে আগে থেকেই। ভ্রাম্যমাণ টেবিলে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র, মাস্ক ও স্যানিটাইজার নিয়ে স্কুল সেফটি, নার্স ও সহায়ক শিক্ষকেরা অপেক্ষায় থাকেন। শিক্ষার্থীদের শরীরের তাপমাত্রা মেপে স্কুলে প্রবেশ করানো হয়। খেলার মাঠে টেপ দিয়ে ছয় ফুট দূরে দূরে চিহ্ন দেওয়া আছে, যেখানে বাচ্চারা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে। সেখান থেকে একেক ক্লাস একেক পথে ভবনে যার যার শ্রেণিকক্ষে যায়।

যেহেতু ছোট ছোট দলে ভাগ করা হয়েছে, সেহেতু শিক্ষার্থীদের বসার ব্যবস্থাও দূরে দূরে। তাদের মাস্ক পরে থাকতে হয়। অধ্যক্ষ ও দুজন সহকারী অধ্যক্ষ সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকেন। সকাল ৯টার ভেতর সবাই ক্লাসরুমে চলে যায়। প্রবেশপথে তাদের লাঞ্চ ও ব্রেকফাস্ট সংগ্রহ করে শিক্ষকদের সঙ্গে ক্লাসে যায়। আমাদের স্কুল ভবনে একটি রুমকে আমরা আইসোলেশন রুম করেছি। যদি কোনো শিক্ষার্থী স্কুলে এসে অসুস্থ হয়, তাহলে তাকে নিয়ে যেতে তার মা-বাবা আসার আগ পর্যন্ত সে ওই রুমে থাকবে। তবে আশার কথা গত এক মাস ১০ দিনে আমাদের ওই রুম ব্যবহারের প্রয়োজন হয়নি। প্রতি শুক্রবার বিনা মূল্যে করোনা টেস্ট করতে স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে দল আসে।

শিক্ষকদের একটা অংশ সাইন-আপ করেছেন রিমোট টিচিংয়ের জন্য। শিক্ষার্থীদের ৯০ শতাংশই রিমোট লার্নিং করছে। তাই সেই শিক্ষকেরা বাড়িতে বসে ক্লাস নিচ্ছেন। আর এগুলো সেট-আপ করতে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে হরদম।

আমার পরিবারের তিনজন আমরা সব নিয়ম মেনে বাইরে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারণ, ফ্রন্ট লাইনাররা তো সেই শুরু থেকেই কাজ করছেন। আমরা মাস্ক-গ্লাভস পরে শতভাগ নিয়ম মেনে কাজ করছি। শুধু উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষারত দুজন রিমোট লার্নিংয়ে ক্লাস নিচ্ছে।

অন্যদিকে নগরে মাস্ক না পরলে জরিমানা ৫০ ডলার করে আদায়ের কঠোর নির্দেশ জারি করা হয়েছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁয় প্রবেশাধিকার নেই মাস্ক না পরলে। একইভাবে বাস-সাবওয়েতেও মাস্ক ছাড়া কাউকে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। টহল পুলিশ দেখলেই জরিমানার টিকিট ধরিয়ে দিচ্ছে মাস্ক ছাড়া লোকজনকে। সচেতনতা আমাদের সকলকে সুরক্ষা দেবে। আসুন সচেতন হই। আগের স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0