default-image

‘ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা’, ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাতে এভাবেই বলছিলেন প্রয়াত টিম রাসের্ট, যা ছিল দেশের ভবিষ্যৎ ইলেকটোরাল ব্যাটলগ্রাউন্ড সম্পর্কিত একটি যথাযথ মূল্যায়ন। দুই দশকে পাঁচটি প্রেসিডেনশিয়াল প্রচারের পরও সুইং স্টেটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অনিশ্চিত অঙ্গরাজ্য হিসেবে ফ্লোরিডা নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। আর এবারও আমরা ফ্লোরিডাবাসী ফল নির্ধারণী ভোট দিয়ে জানাব, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি থাকবে কি, থাকবে না।

সিএনএনের মতামত কলামে ক্রিস কিং লিখেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সুখবর হলো ফ্লোরিডা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে পছন্দ করে। গত ৪০ বছরে ফ্লোরিডা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ভোট দেয়নি। ক্ষমতায় যে দলই থাক না কেন, আমরা গত চার দশক আমাদের ইলেকটোরাল ভোট ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকই দিয়েছি। ফ্লোরিডার পাম বিচ কাউন্টিতে আবাস স্থানান্তরের পর ট্রাম্প নিজেও এখন একজন ফ্লোরিডিয়ান, যিনি ঘরের সুবিধা পেতে পারেন।

এর বাইরে বাকি যা কিছু থাকল, তার পুরোটাই ট্রাম্পের জন্য দুঃসংবাদ। অঙ্গরাজ্যটি পতনোন্মুখ। হোটেল ও থিম পার্কগুলোর লাখো কর্মী চাকরি হারিয়েছেন। খাদ্য সরবরাহকাজে নিয়োজিত শত শত গাড়ি বেকার পড়ে আছে। প্রায় এক লাখ ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। উদ্যোক্তা শ্রেণি থেকে হারিয়ে গেছে পুরো একটি প্রজন্ম। অঙ্গরাজ্যটির সবচেয়ে বিখ্যাত ইঁদুরকে (মিকি মাউস) সাক্ষী রেখে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া কিসিমি শহরের রাস্তার দুধারে পরিত্যক্ত হোটেলগুলো এখনো দাঁড়িয়ে আছে স্মৃতির অনুলিপি হয়ে। আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সৈকতগুলোর পাশেই তলিয়ে যাচ্ছে আমাদের শহরগুলো। তাদের উভয়েই জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বশেষ শিকার। স্বাস্থ্য খাতে আধুনিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যেই আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে স্বল্পমূল্যের আবাসন সংকটের বিষয়টি। রিপাবলিকান নেতৃত্বে থাকা ফ্লোরিডা অ্যাফোর্ডেবল কেয়ার অ্যাক্ট গ্রহণ করেনি, যা কোটি মানুষকে এই ভয়াবহ ভাইরাসের সামনে রীতিমতো অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন
গত মার্চ ও আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে ফ্লোরিডার ৩৫ লাখ মানুষ বেকারভাতা পেতে আবেদন করেন। ফ্লোরিডার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার কারণে এর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশেরই নেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত বেকারভাতা পাওয়া ব্যক্তিরাও পেয়েছেন অনেক কম। প্রতি সপ্তাহে একটি পরিবারকে বেঁচে থাকতে হয়েছে মাত্র ২০০ ডলারে

গত মার্চ ও আগস্টের মধ্যবর্তী সময়ে ফ্লোরিডার ৩৫ লাখ মানুষ বেকারভাতা পেতে আবেদন করেন। ফ্লোরিডার অপর্যাপ্ত ব্যবস্থার কারণে এর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশেরই নেই অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুযোগ। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত বেকারভাতা পাওয়া ব্যক্তিরাও পেয়েছেন অনেক কম। প্রতি সপ্তাহে একটি পরিবারকে বেঁচে থাকতে হয়েছে মাত্র ২০০ ডলারে। পরিমাণটা এতই নগণ্য যে, ট্রাম্প সমর্থিত আমাদের গভর্নর শেষ পর্যন্ত ফেডারেল সরকার নির্ধারিত সহায়তা পাওয়ার যোগ্যতাকে অগ্রাহ্য করতে হয়েছে। রৌদ্রোজ্জ্বল এ অঙ্গরাজ্যের কোনো কিছুই আর উজ্জ্বল নয়।

আমাদের আশা দরকার। দরকার নেতৃত্ব। জনগণকে নিরাপদ রাখতে পারে এবং শুধু ধনী নয়, সবার সমৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে পারে—এমন একটি সরকার আমাদের প্রয়োজন। ক্ষুদ্র ব্যবসার মালিক ও আজীবন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি জানি ফ্লোরিডার অর্থনীতি কী করে তার অপরিহার্য কর্মীদের অগ্রাহ্য করছে। আমাদের সেবা খাতের কর্মীদের বেতন সবচেয়ে কম, সবচেয়ে অনিরাপদ। সংকট এলে তাঁরাই প্রথম চাকরি হারান। ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও শিক্ষকেরা ন্যায্য মজুরি থেকে বেশি কিছু চাইছেন না। তাঁরা চান তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী মজুরি। ফ্লোরিডার লাখো বাসিন্দার ঘর নেই, নেই স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা। তারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট চায়, যিনি তাদের দুর্দশা শুধু দেখবেনই না, সহমর্মী হবেন এবং তাদের পাশে দাঁড়াবেনও। এখানেই এগিয়ে আছেন জো বাইডেন, যিনি সবচেয়ে জরুরি সময়ে ভোটারদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন।

ভাইরাসকে পরাজিত করার পর পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে আমাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাহাড়সম কাজ করতে হবে। কথাটি যেমনই শোনাক, একজন যোগ্য ও কৌশলী নেতাই পারেন তুলনামূলক ভালো বেতনের চাকরি সৃষ্টি, শ্রমজীবীদের চাহিদার দিকে বাড়তি মনোযোগ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি সবার সামনে তুলে ধরে এই সুযোগটি নিতে। পর্যটন খাতে অতি নির্ভরতার কারণে ফ্লোরিডার অর্থনীতি বরাবরই ঝুঁকিতে থাকে। মহামন্দার সময় আমরা এই কঠিন শিক্ষাটি পেয়েছিলাম। কিন্তু এ অঙ্গরাজ্যের রিপাবলিকান প্রশাসনগুলো এই বিষয়টি হয় শনাক্তই করতে পারেনি, নয়তো এটি মোকাবিলায় অঙ্গরাজ্যকে প্রস্তুত করে তুলতে পারেনি। ফলে অর্থনৈতিক দুর্দশা এখনো আমাদের দেখতে হচ্ছে।

ফ্লোরিডা এমন একজন নতুন প্রেসিডেন্ট চায়, যিনি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। শুধু শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিরোধিতাই যথেষ্ট নয়, আমাদের নতুন প্রেসিডেন্টকে অশ্বেতাঙ্গদের নিঃশর্ত আস্থা অর্জন করতে হবে

মিকি মাউস, বিহারতরি, আর সৈকতের বালুরাশি হয়তো গোটা বিশ্বের মানুষকে ইশারায় ডাকে। কিন্তু যখন সুর থেমে যায়, যখন কোনো নৌযানের আর ভাসবার উপায় থাকে না, তখন এই ফ্লোরিডাকে সবচেয়ে বেশি ভুগতে হয়। সরকার আমাদের সব সমস্যার সমাধান করবে—এমন চাওয়া আমাদেরও নেই। কিন্তু আমরা চাই, এমন সব উপকরণ, ভর্তুকি ও পুঁজির অংশীদারত্ব, যার মাধ্যমে পরের প্রজন্মের উদ্যোক্তারা আসছে দিনের সংকটের সৃষ্টিশীল সমাধান খুঁজে নিতে পারবে। আমাদের খুব করে প্রয়োজন টেকসই জ্বালানি সম্পর্কিত কর্মসংস্থান, যা ফ্লোরিডার অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনবে, আনবে স্থিতিশীলতা।

নতুন প্রশাসনকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, এই পুনরুদ্ধার কর্মসূচি ইংরেজি ‘কে’ বর্ণের আদলে হবে না, যেখানে সমাজের উঁচুতলার লোকদের সমৃদ্ধি হবে, আর আরও প্রান্তে যেতে হবে মধ্য ও নিম্নবিত্তকে। কম খরচে আবাসন, উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো নিশ্চিত করার মাধ্যমে পরিবারগুলোর ওপর চেপে বসা খরচের বোঝা কমিয়ে আমরা এটি করতে পারি। একই সঙ্গে মার-এ-লাগো-তে ২ লাখ ডলারের বিনিময়ে সদস্য হওয়ার সামর্থ্য যাদের নেই, তাদের জন্য একটি অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করতে হবে।

ফ্লোরিডা এমন একজন নতুন প্রেসিডেন্ট চায়, যিনি আমাদের ঐক্যবদ্ধ করবেন। শুধু শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের বিরোধিতাই যথেষ্ট নয়, আমাদের নতুন প্রেসিডেন্টকে অশ্বেতাঙ্গদের নিঃশর্ত আস্থা অর্জন করতে হবে। ফ্লোরিডা জাতিগত বৈচিত্র্যে ভরপুর অঙ্গরাজ্য। আমাদের নতুন প্রেসিডেন্টকে তাই এখানকার কালো ও বাদামি বর্ণের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাম্যের নীতি যেমন নিতে হবে, তেমনি বর্ণবাদী নীতি পরিহার ও প্রতিটি মানুষের নিজ ঈশ্বরদত্ত কাজ করে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

অন্য কথায় বলতে গেলে, আমাদের পরবর্তী প্রেসিডেন্টকে আরও উন্নত করে সবকিছু পুনর্গঠন করতে হবে। আর একজন মাত্র ব্যক্তি এটি করতে প্রস্তুত রয়েছেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় আমি অনুধাবন করেছি, কীভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্লোরিডা ও প্যানহ্যান্ডেলের মতো অঞ্চলে কাজ করেছেন, যাতে আমোদের মধ্যে ভোট নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়। অন্য অনেকের চেয়ে আমি বিষয়টি সম্পর্কে ভালো জানি।

মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে যে অঙ্গরাজ্যের ভোটের ফল অধিকাংশ সময় নির্ধারিত হয়, সেখানে ট্রাম্পের পক্ষে একজন সমর্থককেও অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। তাঁর অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, মহামারি মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং এ সবকিছুতে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি নিষ্ঠুর অবজ্ঞার ব্যাপ্তি এতটাই যে, তিনি একে এড়াতে পারবেন না।

যদি বাইডেন এই অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্যের চূড়ান্ত দুর্গতির সময়ে তাঁর মানবিক ও সহমর্মী বাণী সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরতে থাকেন, তবে এই অঙ্গরাজ্যই তাঁকে হোয়াইট হাউসে পাঠাবে, যাকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও এখন নিজের ঘর বলে দাবি করছেন, ‘ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা, ফ্লোরিডা’ আওড়াতে আওড়াতে।

লেখক: ফ্লোরিডার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে ২০১৮ সালে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ ভোটে পরাজিত হওয়া ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী এবং অরল্যান্ডোভিত্তিক স্বল্পমূল্যের আবাসন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান এলিভেশন ফিন্যান্সিয়াল গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা।

মন্তব্য পড়ুন 0