মানুষ সমাজবদ্ধ জীব—এটা সমাজবিজ্ঞানের একেবারে প্রাথমিক পাঠ। এই পাঠ যে কতটা সত্য, তা বিরুদ্ধ পরিবেশে সবচেয়ে বেশি টের পাওয়া যায়। নিজের চেনা পরিবেশের বাইরে গেলেই একজনের পক্ষে বোঝা সম্ভব, সংঘবদ্ধতা কত বড় শক্তি। এ কারণেই প্রবাসের সমাজে নানা ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে, বিস্তার পায়। প্রবাসের মানুষ নিজেদের স্বার্থেই যূথবদ্ধ হয়।

এত বিচিত্র ধরনের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে যে, এগুলোর মধ্যেও অনেক সময় নানা বিরোধ দেখা দেয়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বার্থে বিভাজিত হয়ে যেতে দেখা যায় এক সময়ের প্রতিশ্রুতিশীল নানা সংগঠনকে। এ বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের দ্বারা গড়ে ওঠা নানা সংগঠনকে এক করে এক ছাতার নিচে আনতে গড়ে তোলা হয় ফেডারেশন অব বাংলাদেশি অ্যাসোসিয়েশনস ইন নর্থ আমেরিকা (ফোবানা)। উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশিদের বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের লক্ষ্যে এ সংগঠন গড়ে তোলা হয়।

ফোবানা খুব দ্রুত প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে নিজের পরিচয় দাঁড় করিয়ে ফেলেছিল। ফেলেছিল কথাটা বলতে হচ্ছে কারণ, এখন এই প্রভাবের বিষয়টি অতীত ছাড়া আর কিছুই নয়। কারণ, যে বৃহত্তর স্বার্থে এই সংগঠনের জন্ম তা-ই এখন ভুলতে বসেছেন সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ। নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব ও ক্ষুদ্র স্বার্থে বিভাজন এখন ফোবানার নিত্যকার ঘটনা। গত কয়েক বছর ধরে ফোবানার দুটি গ্রুপ পৃথক সম্মেলন করে আসছে, যা হতাশ করছে উত্তর আমেরিকাপ্রবাসী বাংলাদেশিদের। নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি শেষ পর্যন্ত আদালতে পর্যন্ত গড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কিছুদিন আগে আদালত ফোবানার একাংশের বিরুদ্ধে অন্য অংশের করা মামলা খারিজ করে দেন। এ প্রেক্ষাপটে ফোবানার একাংশ ঐক্য স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। বিবদমান দুই অংশের এক পক্ষের নেতৃত্বে থাকা মোহাম্মদ হোসেন খান অন্য পক্ষের নেতা শাহ এম হালিমের প্রতি ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন। এতে প্রাথমিকভাবে আলোচনায় সম্মতি জানিয়েছেন শাহ এম হালিম। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

কিন্তু এই আশার মধ্যেও ঢুকে পড়ছে নানা সংশয়। কারণ, এমন ঐক্য প্রচেষ্টা অতীতেও দেখা গেছে। উপরন্তু আদালতের রায়ের প্রেক্ষাপটে যে ঐক্য প্রচেষ্টা শুরু করা হয়েছে, তার কথা জানাতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অন্য পক্ষের বিষয়ে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা সংকট তৈরি করতে পারে। মনে রাখা জরুরি যে, বিভাজনের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ঐক্য স্থাপনের উদ্যোগ খুব কঠিন একটি উদ্যোগ। এটি সফল করতে হলে উদ্যোগ গ্রহীতার অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে। বিভক্ত ফোবানায় ঐক্য স্থাপিত হলে তা উত্তর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য একটি বড় ব্যাপার হবে। আর এ ক্ষেত্রে যে অংশ আন্তরিকভাবে প্রথম পদক্ষেপটি নেবে, তাকেই মানুষ মনে রাখবে। ঐক্য স্থাপনের ক্ষেত্রে সব সময়ই এগিয়ে আসা অংশটির দায়িত্ব বেশি থাকে। কিন্তু অন্য অংশটিকেও বুঝতে হবে, বিভক্ত ফোবানার একাংশের বড় নেতার চেয়ে ঐক্যবদ্ধ ফোবানার মাঝারি সারির নেতার স্থান মানুষের মধ্যে অনেক উঁচুতে থাকে। কারণ, ঐক্যবদ্ধ ফোবানা অনেক বেশি প্রভাব বিস্তারি। এটা অতীতে দেখা গেছে। এ থেকে শিক্ষা নিয়ে উভয় পক্ষই ঐক্য স্থাপনে আলোচনায় এগিয়ে আসবে—এটাই প্রত্যাশা।

মন্তব্য পড়ুন 0