default-image

সাপ্তাহিক বন্ধ শনিবার। দূর থেকে আমাদের লেনে ভেসে আসছে হিন্দি গান ‘মেরে পেয়ারি বেহনা...’। গানটা শুনে বড় ভাইয়ের কথা মনে হলো। মনে হলো, ছোটবেলা আমাদের বোনদের সঙ্গে কিছু হলে খুশি করার জন্য বা পটানোর জন্য হলেও এ গানটা গাইতেন। তাই এই গান শুনে ভাইয়ের জন্য এক ধরনের প্রেম বা মায়া মমতা যাই বলেন তা অনুভব করছি। গান চলছে, এমন সময় বড় ভাই আমাকে ফোন দিয়েছেন।

উনি খুশি হয়ে কল দিয়েছেন সুসংবাদ দিতে। কারণ পারিবারিক একটা বড় ধরনের সমস্যা সমাধানে কিঞ্চিৎ ভূমিকা ছিল। তো কল দেওয়ার আগে তিনি মনে যে শান্তি অনুভব করেছেন, হয়তো মনে মনে এ গানটাই গেয়েছেন। হয়তো তাঁর মনের কথাটা কল পৌঁছার আগে আমার কাছে পৌঁছে গেছে গানের মাধ্যমে। কেননা তিনি যে চিন্তা করেছেন, এটা তারই ফল। নতুবা আমার অন্য ভাইদের কথা মনে হতো। তিনি বলছিলেন, ‘এইমাত্র ঘরে আসলাম, এসে তোকে ফোন দিচ্ছি।’ তিনি চিন্তা করে কল করার আগেই আমি অনুভব করেছি। ভাইয়ের বয়স হয়েছে। ইচ্ছা হলেও বলতে পারিনি, তুমি যে গানটা গাইতে সেটা বাজছে পাড়ায় কোনো অনুষ্ঠানে। এই যে আমি আমার ভাইয়ের ভালোবাসা আগেই অনুভব করছিলাম—এটাই হচ্ছে আত্মা থেকে আত্মায় যোগাযোগ। যাকে বলে একটা সম্পূর্ণ ভার্চ্যুয়াল বার্তা।

আজ পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তরে অসংখ্য সন্তান ব্যথায় কাতর এ লেখাটা তাঁদের জন্য। শুধু আমেরিকা, লন্ডন নয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনেকে আছেন, যারা চাইলেই দেশে যেতে পারেন না। ইচ্ছা সুযোগ থাকলেও অনেক সময় সম্ভব হয় না। অসুস্থ মা-বাবা দেশে, অনেকের মা-বাবা নেই কিন্তু বড় ভাইবোন মা-বাবার মতো। যারা হাত ধরে একদিন স্কুলে নিয়ে যেত। খেলতে খেলতে পড়ে গেলে হাত ধরে তুলত। আমরা চাইলেই সহজে ছুঁয়ে দেখতে পারছি না। নিউইয়র্কের এক লেখক বলছিলেন তাঁর স্বামীর কথা। যে ইফতারে বসে মা-বাবার কথা মনে করে কেঁদে ফেলেন। দেশে লকডাউনে কে কী খাচ্ছেন না খাচ্ছেন এসব ভেবেও কান্না করেন।

একই কাণ্ড আমার ছোট ভাইয়েরও। সে টাকা পয়সা দিয়ে সাহায্য করছে তবু এর-ওর ভাবনা তাকে বিচলিত করছে। এভাবে অনেকেরই মনে কষ্ট জমা। দেশে অনেকের মা-বাবা অসুস্থ। দুদিন আগে এক ছোট ভাইয়ের বাবা মারা গেলেন। সকালে একজনকে মেডিটেশন ইয়োগা করাই সেও বলছিল তার মায়ের অসুস্থতার কথা। এ রকম অসংখ্য দুঃখ সবাইকে স্পর্শ করে আছে। কেউ কাঁদছেন। কেউ কাঁদতেও পারছেন না। কেউ চাইলে যেতেও পারছেন না। তাঁরা যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। তাঁদের এ যন্ত্রণায় কাতর হওয়া অপর প্রান্তের মানুষগুলোর মনে কী প্রভাব ফেলছে তা হয়তো কেউ ভাবছেন না।

হয়তো অসুস্থ মা বলছেন, ‘বাবা, তুই কি আসবি না?’ এমন অবস্থায় মন কাতর হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু এ স্বাভাবিকতাকে সরিয়ে আপনি মাকে ভার্চ্যুয়াল ভালোবাসা পাঠান। বলেন, ‘মা, আমি তো তোমার পাশে আছি। তুমি চোখ বন্ধ করো। দেখবে আমি তোমাকে ছুঁয়ে আছি।’ কিন্তু এভাবে না বলে কান্নাকাটি করে বলছেন, ‘মা গো, তোমাকে দেখতে পারছি না।’ এটা সত্য কিন্তু এ সত্য আপনার মায়ের কষ্ট বাড়িয়ে দেবে কয়েক গুণ।

বিজ্ঞাপন

আপনি কি চাইলে মা-বাবা বা ভাইবোন, প্রিয়তমাকে স্পর্শ করতে পারবেন না? পারবেন। কথা হচ্ছে আপনি তাকে কীভাবে ছুঁয়ে আছেন? ব্যথা দিয়ে না ভালোবাসা দিয়ে? যে ব্যথায় কষ্ট আছে তাঁর জন্য কষ্ট পাওয়া মানে আমি তার কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছি। এখন প্রশ্ন উঠতে পারে প্রিয়জনের আঘাতে তো আঘাত আসবে। কিন্তু মনকে এখানে পজ দেন এবং বলেন তার ব্যথায় আমি কষ্ট পাব না। সে দ্রুত সেরে উঠবে।

আপনার এ চিন্তা তার সুস্থ হওয়ার শক্তি বাড়িয়ে দেবে। মা বাবা যদি জটিল রোগে ভোগেন তা শুধু তাদের আত্মাকে কষ্টই দেয়। শুনতে খারাপ হলেও তাদের ভালো হয় যা তা মেনে নিতে প্রস্তুত হতে হয়। আমার কি হবে? কি হবে? বললে, তাঁদের কষ্ট বাড়ে। তাই মনে মনে কল্পনা করুন মায়ের মুখ। আর বলুন, ‘আমার মা সুস্থ হয়ে গেছেন। তাঁর সব যন্ত্রণা শেষ।’ এতে অসুস্থ থাকলেও তাঁর আত্মা আপনার পাঠানো বার্তার জন্য আরাম পাবে। এভাবে দূর থেকে এম্পাওয়ার করেন।

মা বাবার ছায়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছায়া। তবু মায়া ত্যাগ করুন। নতুবা কষ্ট পেতে পেতে এক সময় নিজে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। সেটা হবে প্রিয়জনদের জন্য আরও বেদনাদায়ক। আমরা যে অনুভূতিকে মায়া বলছি জ্ঞান সেটাকে দুর্বলতা বলছে। অবচেতন মনের নড়াচড়া ভয়, ভীতি, উদ্বিগ্নতা দূর করতে হলে চুপ হয়ে বসুন। নিজের মাঝে আগে স্থিরতা দৃঢ় করুন এবং সে স্থিরতা দিয়ে প্রিয়জনকে স্পর্শ করুন। দেখবেন সব দূর, দূর হয়ে গেছে।

নাজুক মন নিয়ে আপনি কেবল বেদনা ছড়াবেন। আপনি যে টাকা-পয়সা পাঠাবেন তাও হবে বেদনা মিশ্রিত। তাই আগে মনকে স্থির করুন। তাঁদের ভালো দোয়া পাঠান। তাঁরা তখন না খেয়ে থাকলেও ভালো অনুভব করবেন। তাঁরা হয়তো বুঝতেও পারবেন না যে তাঁরা কেন ভালো বোধ করছেন! তাই প্রিয়জনকে দূর থেকে ভালোবাসা দিয়ে স্পর্শ করুন।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন