default-image

এক.

আশির দশকের প্রথম, হোসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক আমল। খবর এল, ব্রিটেনের রানি এলিজাবেথ ও তাঁর স্বামী প্রিন্স ফিলিপ বাংলাদেশ সফরে আসছেন। রানির সফর সীমাবদ্ধ থাকবে ঢাকায়। প্রিন্স ফিলিপ আসবেন সিলেটে।

মহাপ্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে সালুটিকর ওসমানী বিমান বন্দর থেকে শহরতলির লাক্কাতুরা গলফ ক্লাব পর্যন্ত এলাকা ঝকঝকে তকতকে নতুনে মোড়ানো হচ্ছে। টার্মিনালসহ বিমান বন্দর, রাস্তাঘাট, আশপাশের বাড়িঘর মেরামত, চুনকাম, রং করাসহ সৌন্দর্য বর্ধনের সবই করা হচ্ছে। রাজকীয় অতিথির উষ্ণ অভ্যর্থনায় কোনো ঘাটতি থাকতে পারে না।

ব্রিটেনে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকাংশই সিলেটের। ব্রিটিশদের কাছে সিলেট যেমন পরিচিত, সিলেটিদের কাছেও রাজপরিবার তেমনি সমাদৃত।

বিমানবন্দরে লালগালিচা বসানো হলো। রাজকীয় বিমানের দরজা থেকে গাড়ি পর্যন্ত। এক শ ফুট দূরত্বের লালগালিচার দুপাশে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা ছাড়াও অভ্যর্থনা জানাবেন শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। প্রিন্স ফিলিপ মিলিত হবেন তাঁদের সঙ্গে। বিমান বন্দর থেকে তিনি যাবেন লাক্কাতুরা গল্ফ ক্লাবে।

সিলেট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের তালিকায় আমার নামও ছিল। কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির পর নির্ধারিত সময়ে বিমান বন্দরের টারমাকে উপস্থিত হলাম। লালগালিচা লাইনের ডানে-বামে বা সামনে-পেছনে কারা কারা ছিলেন, এখন আর তা মনে নেই। তবে ঠিক ডান ও বাঁ পাশের দুজনকে মনে রেখেছি অন্য কারণে।

বিজ্ঞাপন

আমার বামে ছিলেন আবদুল করিম চৌধুরী (করিমদাদ চৌধুরী)। তিনি অ্যাপেক্স ক্লাবের সভাপতি। কিছুদিন আগে ক্লাবের এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য জাপান সফর করেছেন। এ সময় জাপানের হোস্টরা তাঁকে সম্রাটের মনোগ্রাম খচিত একটি পিন উপহার দেয়। ব্রিটেনের রানির স্বামীকে অভ্যর্থনা জানাতে করিমদাদ চৌধুরী এসেছেন সেই জাপানি পিনটা কোটে ধারণ করে। এত সূক্ষ্ম বিষয় সাধারণত কারও

নজরে পড়ার কথা নয়। কিন্তু নজরে পড়েছে প্রিন্স ফিলিপের।

হাত মেলানো ও নাম-পরিচয় জানার পর প্রিন্স ফিলিপ

জিজ্ঞেস করলেন, জাপানি সম্রাটের মনোগ্রাম খচিত পিন

আজ কেন ধারণ করেছেন? করিমদাদ চৌধুরী প্রথমে থতমত খেলেও পরে নিজেকে সামলে নেন। উত্তর দেন, তাঁর জাপান সফরের কথা বলেন। মাথা নেড়ে প্রিন্স ফিলিপ আমার সামনে এলেন। পরিচয় পর্বের পর এগিয়ে গেলেন আমার ডানে নূরুল ইসলামের কাছে। নূরুল ইসলাম বললেন, আমি ব্রিটেনপ্রবাসী কল্যাণ সমিতির সভাপতি। প্রিন্স ফিলিপ সঙ্গে সঙ্গে

জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে তো আপনার ব্রিটেনে থাকার কথা, এখানে কি করছেন? নূরুল ইসলামের উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। মুহূর্ত বিলম্ব না করে উত্তর দিলেন, আপনাকে অভ্যর্থনা জানাতে এখানে এসেছি। স্মিত হেসে প্রিন্স ফিলিপ সামনে এগিয়ে গেলেন।

শুক্রবার ৯ এপ্রিল প্রিন্স ফিলিপ পরলোকগমন করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর এসব ছোট ছোট ঘটনা স্মৃতিতে ভেসে উঠে। এই লেখায় তাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করলাম।

দুই.

একই দিন পরলোকগমন করেছেন প্রবীণ সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার। তিনি ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ছিলেন। তাঁর বা তাঁদের পরিবারের সঙ্গে আমরা যারা যুগভেরীতে কাজ করেছি, আমাদের সম্পর্কের অনুভূতিটা একটু ভিন্ন। যুগভেরী বাংলাদেশের প্রাচীনতম সংবাদপত্র (১৯৩০)। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন হাসান শাহরিয়ারের বাবা মকবুল হোসেন চৌধুরী। জনাব চৌধুরী আসামের পার্লামেন্ট মেম্বারও ছিলেন। হাসান শাহরিয়ারের অগ্রজ হোসেন তওফিক চৌধুরী দৈনিক পূর্বদেশে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতা করেছেন। বর্তমানে সুনামগঞ্জে বসবাস করছেন। সত্তরের দশকে যুগভেরীর টেবিলে তাঁর সঙ্গে অনেক আড্ডা দিয়েছি। চৌধুরীর কয়েকটি এক্সক্লুসিভ রিপোর্টও সে সময় যুগভেরীতে প্রকাশিত হয়।

সত্তর দশকের শেষদিক অথবা আশির দশকের প্রথম, সন–তারিখ ঠিক মনে নেই। একদিন যুগভেরী সম্পাদক আমীনূর রশীদ চৌধুরী আমাকে ডেকে পাঠালেন জ্যোতি মঞ্জিলে। যাওয়ার পর বললেন, মাহবুব, তোমাকে ঢাকায় ইত্তেফাকে এক সপ্তাহের জন্য যেতে হবে। আমি জনাব মঞ্জুকে (আনোয়ার হোসেন মঞ্জু) চিঠি লিখে দিচ্ছি। এই এক সপ্তাহে একটি দৈনিক প্রকাশনার নানা দিক তুমি জানবে, শিখবে। আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় কাজে আসবে।

একটি দৈনিক প্রকাশনার ব্যাপারে আমীনূর রশীদ চৌধুরীর প্রচণ্ড আগ্রহের কথা আমি জানতাম। তবে যুগভেরীকে দৈনিক করার ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তিনি মনে করতেন, সাপ্তাহিক হিসেবে যুগভেরীর যে ঐতিহ্য তা সাপ্তাহিকেই অক্ষুণ্ন থাক। দৈনিক হলে হবে ভিন্ন নামে। সে পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আমার এ যাত্রা ঢাকা সফর।

বিজ্ঞাপন

ইত্তেফাক ভবনে পৌঁছে সোজা গেলাম সম্পাদকের রুমে। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সাজানো-গোছানো সুদৃশ্য বিশাল কক্ষ। চিঠিটা পড়েই তিনি ডাকলেন জেনারেল ম্যানেজার খন্দকার শাহাদাৎ হোসেনকে। আমাকে সোপর্দ করলেন তাঁর কাছে।

ইত্তেফাকের বিভিন্ন সেকশন ঘুরে ঘুরে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়। বিশাল কাজ কারবার। মুদ্রণ বিভাগে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা। মফস্বলের অভিজ্ঞতার সঙ্গে কোনো মিল নেই। এর ওপর আছে ইউনিয়ন। এক ইউনিয়ন লিডার তো আমাকে অভিযুক্ত করলেন, মফস্বলে আমরা শ্রমিকদের ঠকাই। এ সব মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্যে হঠাৎ দেখা হাসান শাহরিয়ারের সঙ্গে। কুশল বিনিময়ের পর জানতে চাইলেন, আমি ইত্তেফাকে কেন। বললাম সবকিছু।

তাঁর টেবিলে চা আপ্যায়িত করে বললেন, ইত্তেফাকের অভিজ্ঞতা দিয়ে মফস্বলে দৈনিক করা যাবে না। ইত্তেফাক একটি জাতীয় দৈনিক। তার প্রচার সংখ্যা, বিজ্ঞাপন, স্টাফ, আয়-ব্যয় কোনো কিছুর সঙ্গে মফস্বলের একটি দৈনিকের মিল থাকবে না। এখানের এক সপ্তাহের কোনো অভিজ্ঞতাই বাস্তবে কাজে আসবে না। তার চেয়ে বরং আসুন, আপনি ও আমি বসে সিলেটে একটি দৈনিক বের করতে কী কী লাগতে পারে তার একটি তালিকা করি। এ কথা বলে হাসান শাহরিয়ার কাগজ-কলম নিয়ে শুরু করলেন লেখা।

একটি দৈনিকের কাঠামো।

কত পৃষ্ঠা, কত সাংবাদিক, কত স্টাফ, বিজ্ঞাপন, মুদ্রণ, কাগজ, বিতরণ, নিউজ সার্ভিস ইত্যাদি ইত্যাদি। সবকিছুই মফস্বলের একটি দৈনিকের কথা মাথায় রেখে।

হাসান শাহরিয়ারের এই পুরো পরিকল্পনা বগলদাবা করে পরদিনই ফিরে গেলাম সিলেটে। জনাব আমীনূর রশীদ চৌধুরীকে বললাম সবকিছু। তিনি খুশি হলেন। আরও খুশি হলেন হাসান শাহরিয়ারের সম্পৃক্ততায়।

জনাব চৌধুরীর অসুস্থতায় দৈনিকের সে পরিকল্পনা আর এগোয়নি। তবে যুগভেরী এখন দৈনিক হিসেবে বের হচ্ছে।

হাসান শাহরিয়ারের আত্মার শান্তি কামনা করছি।

লেখক: নিউইয়র্কপ্রবাসী সাংবাদিক।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন