default-image

শরীরজুড়ে প্রচণ্ড ব্যথা। চোখে জ্বালাপোড়া। ২ এপ্রিল এমন যন্ত্রণা নিয়েই কাজে যেতে হয়েছে। ভিনদেশে থামতে নেই। তাই নয় ঘণ্টার কাজ শেষে শরীরের অস্বাভাবিকতা যে খুব বাড়ছে তা টের পাচ্ছিলাম। রাত আসতে না আসতেই জ্বর। পরের দুদিন খুসখুসে কাশির সঙ্গে গলায় চরম অস্বস্তি। ভারী কাঁথা-কম্বলে জড়িয়ে তিন দিন বিছানায় পরে থাকা আমি চিন্তা করছিলাম, এটা কী দেশ পাল্টানোর খেসারত। মনের মধ্যে একবারও আসেনি দ্রুত ছড়ানো করোনার কথা। এই চিন্তা হবেই বা কেন, বাংলাদেশে ২০২০-এর পুরো বছরে পাঁচবার কোভিড টেস্টে রেজাল্ট নেগেটিভ ছিল। ডিসেম্বরের শেষ দিকে দেশ ছাড়ার আগের দিনও করোনা আমায় জড়ায়নি বলে রেজাল্ট এসেছিল।

এই কয়েক দিনে শরীর কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। চার দিনের বন্দীদশা আর জ্বর, শুকনো কাশি-শ্বাসনালিতে যন্ত্রণার তীব্রতা যখন প্রকট তখন কিছুটা হুঁশ ফিরল। চরম উৎকণ্ঠা নিয়েই করোনার টেস্ট করতে যাই। দ্রুত ফলাফলের জন্য ৬ এপ্রিল সকালে অনলাইনে র‌্যাপিড টেস্টের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে দুই ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফার্মেসি সিভিএসের মিনিট ক্লিনিকে উপস্থিত হই। কোভিড টেস্টে নমুনা দেওয়ার ১৫ মিনিট পরেই জানিয়ে দেওয়া হলো, প্রাণঘাতী করোনা এখন আমার শরীরে। ওই মুহূর্তে পরিবারহীন নিজেকে ভিনদেশে অসহায় লেগেছে। চোখটা ছলছল করছিল। মনে হয়েছিল মায়ের বুকে গিয়ে লুকিয়ে থাকি। মানসিকভাবে নিজেকে সামাল দিয়ে ভাবলাম অদৃশ্য ঘাতকের সঙ্গে তো আমার একাই যুদ্ধ করতে হবে। সাংঘাতিক ছোঁয়াচে এমন ভাইরাস থেকে অন্যদের নিরাপদ রাখার জন্য বাসায় এসে নিজেকে সবার কাছ থেকে আলাদা করে নিলাম। যদিও আগে থেকে ঘরবন্দী অবস্থায় চার দিন কেটেছিল।

বিজ্ঞাপন

করোনা আমার দেহে প্রবেশের পরের দিনগুলোতে দেশে থাকা স্বজন-প্রিয়জন অনেকেরই করোনা আক্রান্তের খবর নিজেকে আরও দুর্বল করে তুলছিল। এমন সময় নিজের করোনায় আক্রান্তের খবর তেমন কাউকে দিইনি। আক্রান্ত অবস্থায় থাকা দিনগুলোতে অনেকেই যোগাযোগ করলেও সবার সঙ্গে কথা বলতে পারিনি বলে দুঃখ প্রকাশ করছি। হাতেগোনা কয়েকজনকে জানিয়েছিলাম কোভিড পজিটিভের খবর। আল্লাহর ওপর ভরসা ও নিজের মনের ওপর সাহস রেখে সময়টা পার করে চলেছি। কোভিড যুদ্ধে পাশে আছি বলে এই কয়েক দিন আমার কাজের জায়গা থেকে ফোন দিয়ে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে তোলার চেষ্টা করা হতো। যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ ডিপার্টমেন্ট শারীরিক অবস্থা জানতে দুই দিন ফোন করেছে। এই লড়াইয়ে যেন জেতা যায় সে জন্য অনেক পরামর্শ আর সাহস জোগাতেন তাঁরা। শারীরিক অবস্থা জানার পাশাপাশি আলাদা থাকার জন্য দরকার হলে হোটেল কিংবা হাসপাতালে তাঁদের তত্ত্বাবধানে যাওয়ার প্রস্তাব দেয় হেলথ ডিপার্টমেন্ট। তবে এসবের প্রয়োজন হয়নি। মনের মধ্যে তখন দেশের কথাই ঘুরেফিরে এসেছে। প্রিয় দেশটা বর্তমানে অনেকটা অসহায় হয়ে আছে। আইসিইউর জন্য হাহাকার, রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাওয়া হাসপাতালগুলোর খবর তো চোখের সামনে ভেসে উঠছে। তবুও যেন আমার দেশ করোনাকে সামাল দিতে পারে এমন প্রত্যাশাই রাখি।

৬ এপ্রিল থেকে শরীরকে পুরোপুরিভাবে দুর্বল করে দেওয়া করোনা দিন দিন যন্ত্রণা দিয়েই চলছিল। আতঙ্কিত না হয়ে অবিরত নিজেকে মানসিকভাবে দৃঢ় করে তোলার চেষ্টা করেছি। করোনার নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ না থাকলেও স্বজনদের কথায় আর অনলাইনের দিকনির্দেশনায় মধু, কালিজিরা, চা, লবঙ্গ, আদা, লেবু, গরম পানি, লবণ পানির গার্গলের মতো অব্যর্থ ওষুধ চালু রেখেছিলাম। কাজ করুক আর না করুক এমন টোটকা চিকিৎসায় ক্ষতি নেই, বরং মানসিকভাবে শক্তিশালী রাখে।

১৫ এপ্রিল থেকে মনে হলো করোনা দুর্বল হতে শুরু করেছে। জ্বর কমে গেছে, নিশ্বাসও স্বাভাবিক নিতে পারছিলাম। আর গলা ব্যথা না থাকায় বেশ নির্ভার ছিলাম। তবে কেন জানি মুখে স্বাদ ও নাকে কোনো গন্ধ পাচ্ছিলাম না, সঙ্গে ছিল অতিরিক্ত দুর্বলতা। পরদিন থেকে নিজেকে কিছুটা চাঙা মনে হলো। সুস্থ হওয়ার দলে ফিরছি এমনটাই জানিয়ে দিচ্ছে পুরো শরীর।

১৪ দিনের ঘরবন্দী জীবন থেকে বের হয়ে ১৯ এপ্রিল কোভিড টেস্টের জন্য ল্যাবে নমুনা দিয়ে আসি। সুখবরটা পরদিন ফোন করে জানিয়ে দেন অপর প্রান্তে থাকা স্বাস্থ্যকর্মী। কিছুক্ষণ পর ইমেইলে চলে আসে মুক্ত হওয়ার কাগজ। ওই সময় ১৪ দিন বন্দী থাকার স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। করোনা আক্রান্তের পরদিন স্কুল জীবনের বন্ধু রায়হানের রাত দুইটায় ওষুধ নিয়ে আসার দৃশ্য হৃদয়ে গেঁথে থাকবে। ওপরে থাকা আমি চাইলেও বন্ধুর কাছে যেতে পারিনি। দূর থেকে তাকিয়েছিলাম গাড়ি থেকে নেমে বাসার দরজায় ওষুধ রেখে চলে যাওয়ার মুহূর্ত টুকু।

বিজ্ঞাপন

যন্ত্রণা ব্যাপারটা কী তা এই কয়দিনে বুঝতে পেরেছি। এই কয়দিনে মনে হলো আবারও সংগ্রাম করেই যেন জীবন ফিরে পেলাম। এখন সুস্থ হলেও অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাস নিতে কষ্টের যন্ত্রণা মনে হয় বয়ে বেড়াতে হবে আমায়। তবুও এখন অনেকটা স্বস্তি লাগছে নেগেটিভের খবর আসায়। শরীরে কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও আবার কর্মজীবন শুরু করব। যান্ত্রিকতায় হয়তো বা হারিয়ে যাব। শুধু একটাই চাওয়া, এমন অদৃশ্য ভাইরাস যেন শত্রুকেও সংক্রমিত না করে।

করোনা যাদের জীবন কেড়ে নেয়, তাদের পরিবারের চাপা আর্তনাদ উপলব্ধি করতে হবে। করোনা থেকে বাঁচতে সবার সচেতন থাকতে হবে। বেঁচে থাকলে সুখের মুহূর্ত হাজার বার আসবে। ঘরবন্দী থাকা আর সরকারের দিকনির্দেশনা মেনে চললেই হয়তো আমরা রেহাই পাব। একটু অসতর্ক হলেই করোনা ঢুকে পড়তে পারে আপনার শরীরে। নিজে সাবধান থাকুন, অসুস্থ বাবা-মা ও স্বজনদের ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকুন। হয়তো কোনো একদিন ভাইরাস বিদায় নেবে, পৃথিবী আবারও জেগে উঠবে আগের মতো।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন