পিয়াইন নদীর বুকে

পাইলটের ঘোষণা শুনে জানলায় চোখ যায়। গাঢ় কুয়াশায় ঢাকা ঢাকার আকাশ। অপরিসীম দক্ষতায় কুয়াশার পর্দা ঠেলে ঠেলে আমাদের বিমান রানওয়ের মাটি স্পর্শ করল।

আমার মনে পড়ে,

‘ও আমার দেশের মাটি

তোমার পরে ঠেকাই মাথা’

কুয়াশার পর্দা সরিয়ে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে দেখি, হাজারি গাঁদার হলুদ আর সূর্যের আলোর মাখামাখি। এই আলো আমাকে সাদর আহ্বান জানায় যেন। ফাল্গুনী উতল হাওয়া গায়ে মেখে আমার হাতে বন্ধু শাকিলার হাত। করোনা মহামারি শুরু হলে আবার কোনো দিন বেঁচেবর্তে থাকব, সবাইকে দেখব ভাবিনি।

জয়নাল আবেদীনের শিমুল বাগানে গেলাম, জাদুকাটা নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে সেতু। কাজ প্রায় শেষের দিকে। বর্তমান সরকারের গুচ্ছ গ্রামের প্রকল্প দেখলাম। খুব মানবিক মনে হয় এই প্রকল্পগুলো। গ্রামগুলো আলোকিত এখন। গ্রামের ছেলেরা সূর্যমুখীর বাগানে ফুলের হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে ছয় তরুণ। বাগানে প্রবেশের মূল্য দশ টাকা। এই দিন বদল আমার কাছে খুব ইতিবাচক মনে হয়েছে।

দেশে থাকার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। বাসার ছাদে উঠলাম। দেখি, আম গাছে আমের মুকুল। নিমফুল আর সুপারির বুটি। বকুল গাছটি আরও উচ্চতায় উঠেছে। আকাশে সোনালি ডানার চিল। রোদ চিক চিক করা মধ্য দুপুর। কৃষ্ণচূড়ার পাতায় ধুলো ছড়ানো। চাতক পাখির মতো আকাশে তাকাই। একটু যদি বৃষ্টি হতো। বৃষ্টি ধোয়া গাছপালা যে সজীবতা ছড়ায়, তা দেখতে আমার মনে তৃষ্ণা জন্মায়। এ শহরে বৃষ্টি বিলাস এক অপরূপ অভিজ্ঞতা। যে জানে, শুধু সেই জানে। দেশের নানা জায়গায় সেই ছেলেবেলায় আব্বা–আম্মার সঙ্গে বেড়াতে যেতাম। একবার জাফলংয়ে গিয়ে ডাউকি ব্রিজের কাছে যাওয়ার পর জানা গেল, ওপারে যেতে জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগে। সেই দুঃখ বুকে নিয়ে আমরা তামাবিলের পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম। ডাউকি ব্রিজ পার হওয়া আর হয়নি। সেই পাহাড়, পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝরনার সুপেয় পানি পান করে স্মৃতিটুকু বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরি। পাহাড়ের খাঁজে সবুজ শেওলা আর গুল্ম, তার ফাঁকে গোলাপি বেগুনি ফুল আজও চোখে লেগে আছে। না সে সময় ব্যক্তিগত ক্যামেরা ছিল না। ক্যামেরায় তাই কোনো ছবি ধারণ করা হয়নি। যা আছে মনের ক্যামেরায় বন্দী।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য কোভিড-১৯ পিসিআর টেস্ট করা লাগবে ভ্রমণের ৭২ ঘণ্টা আগে। তার নিবন্ধন করা লাগে আগের দিন। সব শেষ করে একদিন আগে সিলেট যেতে হলো। ভোরবেলায় রওনা হলাম সিলেটের পথে। সুনামগঞ্জের নতুন কোর্ট ভবনের সামনের খালে লাল শাপলা ফুটে আছে। আকাশের কপালে কমলা রং টিপ পরে সূর্য উঁকি দেয়। এ শহর ছেড়ে যেতে সব সময় বুকের কোণে চিনচিন করে। সব ফেলে চলে যেতে হয়। এটাই বাস্তবতা।

সিলেটে পৌঁছে আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্সে টেস্ট স্যাম্পল দিতে গিয়ে দেখি লেজেগোবরে অবস্থা। ভোর ছয়টায় সুনামগঞ্জ থেকে রওনা হয়ে নয়টায় গিয়ে দেখি মানুষ মনে হয় ভোর ছয়টায় লাইন দিয়ে বসে আছে। এক খালাম্মা নিজে এক চেয়ারে বসে ব্যাগ দিয়ে দুটো চেয়ার দখলে নিয়েছেন।

ছাত্র জীবনে শেখা একটা ডায়ালগ মনে পড়ল, অধিকার কেউ কাউকে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। তাই বসে পড়লাম একটা চেয়ার টেনে। খালাম্মা একটু মনঃক্ষুণ্ন হলেন। কিছু করার নেই। বললাম, ভিড় দেখে মাথা ঘুরছে। পাশের ভদ্রলোক বললেন, আহা বসুক। তাঁকে বসতে দেন।

১০টা বাজলে প্রথম নামটি আমার ডাকলে আমি পা বাড়ালাম টেস্ট স্যাম্পল দিতে। টেস্ট স্যাম্পল দেওয়ার পর আর কোনো কাজ নেই সিলেটে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, জাফলং যেতে পারি। আমার বন্ধু ডাক্তার জেসমিনের বাসায় গেলাম। নাশতা করে আমরা আয়োজন করলাম জাফলং যাওয়ার। আসলে জেসমিন–ই সব আয়োজন করল। জেসমিন যে কত করিতকর্মা, তা বলে বোঝাতে পারব না। সে দশভুজা। ফোনে ম্যানেজ করছে সব। তার এক হরফুন মাওলা আছে, এহেন কাজ নেই যে পারে না। সে ওই আবুল মাল আবদুল মুহিত কমপ্লেক্সের মানুষভর্তি হলরুমে ফেসবুকে দেখে আমাকে শনাক্ত করে নেয়। গাড়ির ব্যবস্থা করে আমরা জাফলংয়ের পথে বের হই ১২টার দিকে। পথে দেখি জান্তা রাজার বাড়ির ভগ্নাবশেষ। রাস্তা সুন্দর মসৃণ।

মালিনীছড়া চা বাগান, ক্যান্টনমেন্ট, শিলংয়ের মতন বোর্ডিং স্কুল। পথের দুপাশেই পরিবর্তন দেখি। জেসমিন ফোনে নির্দেশ দিয়েছে শিবেন দাসকে। উনি পিয়াইন নদীর তীরে মোটরবাইক নিয়ে অপেক্ষায়। আমাদের যাতে বেশি হাঁটতে না হয়, সে জন্য যতটা স্পটের কাছাকাছি যাওয়া যায় নিয়ে গেলেন। তারপর সেই ডাউকি ব্রিজ আর পাথুরে নদীর কাছাকাছি চলে গেলাম।

চোখে আমার তৃষ্ণা

ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষজুড়ে।

জেসমিনের আনা পেয়ারা খেতে খেতে নেমে যাই ধুলো মাখা পথ আর পাথুরে পথ পার হতে। পিয়াইন রিভার লেখা সাইনবোর্ডসহ ছবি তোলা হলো। কারণ, রুনার প্রথম বই পিয়াইন অ্যাডভেঞ্চার। তার দুই চরিত্র রূপকথা আর ত্রিস্তান আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা জল–পাথরের কাব্য দেখতে যত কাছে যাই, ততই অবাক। তবে কুয়াশামাখা বলে ছবি তত পরিষ্কার হলো না। দেশভাগের এই বিষয়টা আমাকে সব সময় ব্যথিত করে। নদীর একভাগ ভারত আর একভাগ বাংলাদেশ। উত্তেজনায় আমরা ভারত সীমান্ত পর্যন্ত চলে যাই। বিজিবি সদস্যরা আমাদের সতর্ক করে দেয়। সব সময়ের মতো মনে হয় নদীর ওই পারে সব সুখ। ওই পারই বেশি সুন্দর।

আমরা জলে ভেজা পাথরে পিছলে পড়ার ভয়ে জলে নামি না। না, আমি নামিনি। জেসমিন আর রূপকথা ঝটপট নেমে ছবি তুলে ফেলে।

সাখাওয়াত ভাই মাত্রই কক্সবাজার সেন্টমার্টিন ঘুরে এসেছেন। কিছুটা ক্লান্ত। তবে বোঝার সুযোগ দিচ্ছিলেন না। আমার বন্ধুর উপহার দেওয়া ফোনে ক্রমাগত ছবি তুলেছেন। তবে শ্যালিকার ছবি তোলার আগ্রহ কেন ছিল, তা গবেষণার বিষয়। হতে পারে রুনার ফেস ফটোজেনিক তাই। রুনার কিনে আনা হাওয়াই মিঠাই খেয়ে আমরা যেন শিশু বয়সে ফিরে গেলাম। আমাদের ভালো লাগা নদীর কুলকুল ধ্বনির মতো বয়ে যাচ্ছে।

পার্বত্য আসাম থেকে জন্মে উমগট নদী দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়ে সিলেট জেলার শনগ্রাম বর্ডার পোস্টের কাছ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। পিয়াইন বাংলাদেশ ও ভারতের একটি আন্তসীমান্ত নদী। আসামের উমগট নদী থেকেই এর উৎপত্তি। প্রবেশ পথে উমগট দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রধান শাখাটি পিয়াইন নামে এবং অন্য শাখাটি ডাউকি বা জাফলং নামে প্রবাহিত হয়। সুরমা নদীর এই উপনদীটি বাংলাদেশে প্রবেশের পর আন্তর্জাতিক সীমানা বরাবর পশ্চিম দিকে প্রায় ৭ কিলোমিটার প্রবাহিত হয়ে প্রতাপপুর বর্ডার আউটপোস্টের কাছে গতি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে ছাতকের কাছে সুরমা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। প্রতাপপুর বর্ডার আউটপোস্ট বা রত্নের ভাঙা-এর কাছে নদীটি তিন শাখায় বিভক্ত। শাখাগুলো হচ্ছে—পুরোনো পিয়াইন, পবিত্র ডালা ও নয়াডালা।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে পিয়াইন নদীর মূল প্রবাহ নয়াডালার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভাটিতে সারি ও গোয়াইনের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। পুরোনো পিয়াইন ও পবিত্র ডালা শুধু বর্ষা মৌসুমে জলপ্রবাহ পেয়ে থাকে। পিয়াইন নদীটির বাংলাদেশ অংশের দৈর্ঘ্য ৫১ কিলোমিটার এবং মোট দৈর্ঘ্য ১৪৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ১১৫ মিটার, প্রকৃতি সর্পিল। নদীটি বাংলাদেশের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও ছাতক উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবহমান। এই নদীতীরের শহর হলো সংগ্রামপুঞ্জি এবং প্রতাপপুর বিজিবি ক্যাম্প। পিয়াইন নদীর তীরে স্তরে স্তরে বিছানো পাথরের স্তূপই জাফলংকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। ওই পাড়ে উঁচু পাহাড়। পিয়াইন নদীর স্বচ্ছ হিমহিম পানি, উঁচু পাহাড়ে গহিন অরণ্য ও সুনসান নীরবতার কারণে এলাকাটি পর্যটকদের দারুণভাবে মোহাবিষ্ট করে।

নদী তীরবর্তী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় আমাদের দুপুরে খাবারের আয়োজন। দুই রুমে আমরা ফ্রেশ হয়ে নিই। বিকেল তিনটায় দুই পদের ভর্তা আর দেশি মুরগির ঝাল ভুনা দিয়ে লাঞ্চ সারি। ডাইনিং টেবিলে বসেই জানালা দিয়ে দেখি, নদী তীরের সূর্যালোক সোনালি থেকে লাল আলো ছড়ায়। পাশেই চারতলা ওয়াচ টাওয়ার। শিবেন দাস যিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার ও কবি এবং পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক মোহাম্মদ খানের সহায়তায় আমাদের জাফলং ভ্রমণ বেশ আনন্দদায়ক হয়েছিল।

জিরো পয়েন্ট ভ্রমণের পর নাজিমগড় রিসোর্টে যাই। আলো আঁধারের সঙ্গে চাঁদের লুকোচুরি। নামটি এমন, যেন ইতিহাসের কোনো নীরব সাক্ষী। ঈসা খাঁর আমলের কথা মনে পড়ে। ছায়া ছায়া আলোর ব্যবস্থার কারণে মনে হয় বাইজির নাচ ঝুম ঝুম আওয়াজ ভেসে আসবে কোনো কোণ থেকে। সুইমিং পুল, স্পা বাথটব। ক্ষণিকের জন্য ভুলেই গেলাম কোথায় আমি। শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক আর মশার উৎপাত মনে করিয়ে দেয় এ আমার দেশ। চমৎকার সব স্মৃতি সাজিয়ে ফিরে এসেছি জেসমিনের বাসায়। রাতে রুনা ফিরে গেল ত্রিস্তান আর রূপকথাসহ সুনামগঞ্জে। আর আমরা পরদিন ঢাকায়। তারপর উড়াল দিয়ে চলে এসেছি নিউইয়র্ক। স্মৃতি নরম পলিমাটির মতো বুকের গভীরে দাগ কেটে রইল। থাকবে।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন