default-image

শিশুর জন্য তার পরিবার প্রথম স্কুল এবং বাবা-মা প্রথম শিক্ষক। তারপর আসে পেশাগত শিক্ষকদের দায়-দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকের হৃদয়ের বন্ধন, আন্তরিকতা, ভাবনা, উদ্বেগ—একজন সফল শিক্ষকের চিরকালীন বৈশিষ্ট্য। তাই হয়তো আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘সৃজনশীল প্রকাশ ও জ্ঞানে আনন্দ জাগানোই শিক্ষকের সর্বোচ্চ শিল্প।’

আমরা সবাই চাই, আমাদের সন্তানেরা ভালো স্কুলে লেখাপড়া করবে। মন মতো আমাদের সন্তানদের উন্নত কোনো স্কুলে ভর্তি করতে পারলেই বাবা–মা হিসেবে আমরা আনন্দিত হই, গর্বিত হই। আমাদের চেষ্টা সব সময়ই সন্তানের উচ্চশিক্ষা ও সাফল্য। কিন্তু একটি শিশু সন্তানের সঠিক জ্ঞান বিকাশ ও পরিচর্যায় আমরা কতটা জ্ঞাত বা সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর পর স্কুল সংক্রান্ত নানাবিধ বিষয়ের ওপর আমরা কতটা গুরুত্ব আরোপ করছি, সেটাই আলোচ্য বিষয়।

হাটহাজারী মারকাযুল কোরআন ইসলামিক একাডেমিতে ৯ই মার্চ বিকেলে মায়ের পিছু ছোটা শিশুটিকে নির্মমভাবে পিটানোর ঘটনাটি ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়ার পর গণমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। যদিও মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক হাফেজ মো. ইয়াহইয়াকে ওই দিন রাতেই আটক করে পুলিশ। কিন্তু নির্যাতনের শিকার ওই ছাত্রের মা–বাবার লিখিত অনুরোধে তাকে আবার ছেড়েও দেওয়া হয়। পরে ১০ মার্চ হাটহাজারী পৌরসভার কামালপাড়া পশু হাসপাতালের পাশ থেকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় ওই শিক্ষককে।

মাদ্রাসার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলে কারও আবেগ-অনুভূতিকে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি কেবল একটি শিশুর মানসিক জ্ঞান বৃদ্ধি ও পতন নিয়ে কথা বলব।

যুক্তরাষ্ট্রের আইন অনুযায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কেবল শিক্ষার্থীকে পেটানো আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এমনকি কোনো শিক্ষক যদি ভুলক্রমে শিক্ষার্থীকে মৌখিকভাবেও সহিংস কোনো কথা বলেন, সেটাকেও কর্পোরাল পানিশমেন্টে ফেলা হয়। অঙ্গরাজ্য অনুযায়ী এই শাস্তিতে ভিন্নতা রয়েছে।

জোর করে, পিটিয়ে, হাত-পা ভেঙে সহিংসতা কখনোই শিক্ষার বিকাশ ঘটায় না, বরং জ্ঞান বৃদ্ধিকে দুর্বল কখনো অকেজো করে দেয়। সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক পিটিয়ে শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য না করে বরং সন্তানদের বিশেষত্ব কোথায় বা কোনো বিষয়ে, তা নির্ণয় করে সঠিক শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করাই হবে দায়িত্বশীল বাবা–মায়ের করণীয়।
বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগীয় আইন সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। তবে শিক্ষাক্ষেত্রে কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীকে শারীরিক, মানসিকভাবে আঘাত করেন, সে ক্ষেত্রে বেশির ভাগ বাবা–-মা–ই যে সেটা সমর্থন করেন, তা অনেকটা সত্য। এর উৎকৃষ্ট প্রমাণটি হলো, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া মাদ্রাসার শিশু নির্যাতনের ঘটনাটি। ৮ বছরের শিশুটিকে জন্মদিনের দিন মায়ের পেছনে ছোটার অপরাধে পিটিয়ে পা ভেঙে শরীর জখম করার ঘটনাটির পরও তার মা-বাবা প্রথম দিকে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষকের পক্ষে লিখিত চিঠি দিয়ে তাকে বের করে আনেন।

এটি কতটা যুক্তিগত তা কেবল শিশুটির বাবা–মা–ই বলতে পারবেন। কারণ, নির্যাতিত শিশুটি তাদের। তবে, এতটুকু বলতে পারি, নিজ সন্তানকে শিক্ষালয়ে পিটিয়ে জখম করে শিক্ষাদান পদ্ধতিতে যেসব বাবা–মা সমর্থন করেন, তাদের নিজেদেরও শিক্ষার অভাব রয়েছে।

এ ব্যাপারে চারজন তিরিশোর্ধ্ব লোকের সঙ্গে কথা হয়। দুজন জানান, তারাও এক সময় বাধ্য হয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছিলেন এবং পেটানোর ভয়ে পালিয়ে চলে আসেন। একজন জানান, মারধর খেয়েই তিনি মোটামুটি কয়েক বছর মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে বেরিয়ে আসেন এবং আর পড়াশোনা–ই করেননি তিনি। শেষের জন বলেন, ‘এভাবেই আমরা পড়েছি। কী আর করা।’

বর্তমান আধুনিক যুগে আমরা সবাই মোটামুটি ‘চাইল্ড অ্যাবিউজ’ শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। চাইল্ড অ্যাবিউজ বা শিশু নির্যাতন হলো—সব সময় কোনো শিশুকে অপব্যবহার করা। এই নির্যাতনেরও আবার প্রকারভেদ রয়েছে। যেমন—শারীরিক নির্যাতন (physical abuse), মানসিক নির্যাতন (emotional/psycological abuse), অবহেলাজনিত নির্যাতন (neglect abuse) ও যৌন নির্যাতন (sexual abuse)।

কোনো শিশু সন্তানের গায়ে হাত তোলা, থাপ্পড় বা পেটানো, চামড়া পুড়িয়ে দেওয়া, ঝাঁকুনি দেওয়া, শিশুকে পানিতে চুবানো, শিশুর দিকে কোনো বস্তু ছুড়ে ফেলা, শিশুকে ধাক্কা দেওয়া বা ছুড়ে ফেলা...ইত্যাদি সব উপসর্গকে শারীরিক নির্যাতন বা দৈহিক নির্যাতন বলে গণ্য করা হয়।

শিশু সন্তানকে সামনে রেখে পরিবারের অন্য কাউকে গালি দেওয়া, কটু কথা বলা, গায়ে হাত তোলা বা অন্যের সমালোচনা করা, সন্তানকে ভালোবাসা ও স্নেহ প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হওয়া, সন্তানকে উপেক্ষা করে মানসিক সমর্থন ও নির্দেশনা না দেওয়া, বিভ্রতকর সমালোচনার মাধ্যমে সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে ছোট করা, হুমকি দেওয়া, অন্যের সঙ্গে তুলনা করা...ইত্যাদি বিষয়গুলোকে চাইল্ড ইমোশনাল অ্যাবিউজ বা মানসিক নির্যাতন বলে গণ্য করা হয়।

শিশু বয়সে নির্যাতন ভবিষ্যতে শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন—উদ্বেগ, আচরণগত সমস্যা, অপরাধমূলক আচরণ বৃদ্ধি, বিষণ্নতা, ড্রাগ ও অ্যালকোহল সমস্যা, খাওয়ার রোগ, আগ্রাসী আচরণ করা, শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা, স্থূলত্ব ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণ, আত্মঘাতী চিন্তাভাবনা অথবা চেষ্টা, স্বল্প আত্মবিশ্বাস, মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাধি, বিশ্বাসের অক্ষমতা বা সম্পর্ক গঠনে ব্যর্থতা, অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থতা, উন্নয়নমূলক বিলম্ব, ঘুমের ব্যাধি, অনুভূতি প্রকাশে ব্যর্থতা ইত্যাদি।

শিশু নির্যাতনের ওপর প্রচুর গবেষণা রয়েছে যা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অপব্যবহারের ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে। যে শিশুটি শৈশবে অপব্যবহারের মধ্যে বেড়ে উঠে, সে শিশুটি পরবর্তীতে আত্মবিশ্বাসের অভাব নিয়ে পথ চলবে, এটাই স্বাভাবিক।

আমাদের সমাজে একজন শিক্ষকের ভূমিকা কি?

কোনো বাগানের একটি চারাগাছকে রোদ, পানি, বাতাসে যত্নের সঙ্গে সতেজ করে বৃদ্ধি করা মালিটি হলেন আমাদের শিক্ষক। একজন শিক্ষক হলেন জ্ঞান ও প্রজ্ঞার উৎস, সমাজ বিনির্মাণের হাতিয়ার। সমাজের প্রতি শিক্ষকের বেশ কিছু আদর্শ নীতি ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে হয়। একজন প্রতিভাবান শিক্ষক কেবল শিক্ষার্থীদের আজকের প্রয়োজন মেটাতে প্রস্তুত থাকেন না, বরং তাদের ভবিষ্যতের আশা ও স্বপ্নের বাস্তবায়নে সব উপকরণের জোগান দেন। একজন শিক্ষকের সফল হওয়ার পেছনে একটিই কারণ, তা হলো শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মজবুত সম্পর্ক গড়া এবং তাদের বোঝানো যে ‘আই ডু কেয়ার ফর ইউ।’

সেটা না করে যখন একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে শিক্ষাদানে অভ্যস্ত হন, তখন বুঝতে হবে, শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সব উপকরণ তার মধ্যে নেই। তিনি শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না।

জোর করে, পিটিয়ে, হাত-পা ভেঙে সহিংসতা কখনোই শিক্ষার বিকাশ ঘটায় না, বরং জ্ঞান বৃদ্ধিকে দুর্বল কখনো অকেজো করে দেয়। সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক পিটিয়ে শিক্ষাগ্রহণে বাধ্য না করে বরং সন্তানদের বিশেষত্ব কোথায় বা কোনো বিষয়ে, তা নির্ণয় করে সঠিক শিক্ষাগ্রহণের ব্যবস্থা করাই হবে দায়িত্বশীল বাবা–মায়ের করণীয়।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন