default-image

১৯৮৪ সালে সাংবাদিক আবু করিম ‘ডানা প্রকাশ’ থেকে ৪৬টি কবিতা নিয়ে একটি কবিতার বই প্রকাশ করেছিলেন। বইটির নাম ছিল ‘পল্টনে আবার জনসভা হবে’। বইটির শেষ কবিতা ছিল ‘পল্টনে আবার জনসভা হবে’। সেই কবিতায় মূলত পল্টনে আবার জনসভা দেখার আকুতি ছিল।

কবিতায় সেই জনসভার আমন্ত্রণ জানানো একটি উত্তপ্ত লাল চিঠির কথা বলা হয়। সেই চিঠি শহরের সব মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা লিখেছিলেন কবি আবু করিম। এই কবি এখন কোথায় আছেন, আমি জানি না। কবিতার বইটি আমার সামনে খোলা আছে।

কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন ছিল—

একটি চিঠি বুটের ভয়ংকর শব্দের মধ্যে চিড় ধরিয়ে দেয়

হেলমেটের ওপর বৃষ্টিকণার মতো ঝরতে থাকে প্রতিরোধের পাথর

অথচ সম্পূর্ণ চিঠিটাতে মাত্র একটি বাক্য লেখা ছিল...

‘পল্টনে আবার জনসভা হবে’।

পল্টনে আর জনসভা হয় না। জনসভা হয় না ঢাকার মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে, চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে, খুলনার খালিশ পার্কে, সিলেটের রেজিস্ট্রি বা আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে। বাংলাদেশের মাঠে-ময়দানে গত এক যুগ ধরে গণমানুষের কোনো জনসভা নেই। জনসভার দিন শেষ।

জনসভার প্রয়োজন কি শেষ হয়ে গেছে? গণমানুষের নেতাদের কি আর কিছুই বলার নেই?

এক যুগ আগে যে নেতারা মাঠে–ঘাটে রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে আয়োজন করা জনসভায় সাধারণ মানুষকে দিন বদলের কথা শোনাতেন। শোনাতেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা। বলতেন অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার কথা। সে সব নেতা কোথায় হারালেন?

সাধারণ মানুষ সেসব জনসভায় উপচে পড়া মিছিল নিয়ে যোগ দিত। নেতাদের কথা শুনতো। শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত একটি বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে জনতা বাড়ি ফিরে যেত। এখন সাধারণ মানুষের কাছে রোদে পুড়ে, ঘামে ভিজে এসব কথা বলতে নেতারা আর আসে না। আর যারা আসে, তাঁরা স্বপ্নহীন মানুষ। তারা জনসভা করার সাহসই রাখে না। কোনো মোড়ে যদি সমাবেশ করার মোশন নিয়ে দাঁড়ায়ও, তাঁদের কথা শোনার জন্য অফিস ফেরত কোনো কেরানি পাঁচ টাকার বাদাম কিনে জনতার একজন হওয়ার আগ্রহবোধ করে না। তাচ্ছিল্যের চাহনি দিয়ে পথচারীরা গন্তব্যে পা বাড়ায়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা—এসব এখন প্রসাধনী শব্দ। সংস্কৃতিসেবীরা এসব শব্দ সুন্দর মোড়কে নৃত্যগীতের মাধ্যমে এখন ভালো দামে বিক্রি করতে পারে। এই বিক্রি করাটা খারাপ কিছু না। মোগল আমলে, সুলতানি আমলে, নবাবি আমলেও শিল্প-সংস্কৃতি বিক্রি হতো। রাজতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় যে মাহফিল হতো, সেখানে সর্বসাধারণের প্রবেশ ছিল না। এখন এমন জৌলুশে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা হয় রাজকোষাগার খুলে দিয়ে। সেখানকার চোখ ধাঁধানো রাশ উৎসব দেখে সাধারণেরা দূরে সরে যায়। কারণ, সে জানে ওই আয়োজন তাঁকে জাগানোর জন্য নয়। ওই আয়োজন অভিজাতদের জন্য। ওই আয়োজনের একটি আমন্ত্রণপত্রের খরচ তার একবেলার খাবারের সমমূল্যের।

বিজ্ঞাপন

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে স্বপ্নময় সাজসজ্জার ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নিয়ে যে আলোচনা হয়, সে আলোচনার আলোচক নিজে যে কোন চেতনায় অচেতন, কোনো স্বপ্নে যে বুঁদ, তা আমজনতার অজানা নয়। তাই সে সব আলোচনা কাউকে আলোড়িত করে না। সবাই বিনোদন লাভ করে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সংবাদে যে ‘আহ’ বলেনি, সেও বঙ্গবন্ধুর জন্য এখন মার্সিয়া গায়। আসলে বিভিন্ন উপলক্ষে মঞ্চ আলোকিত করে বসে থাকা চেতনাই মানুষেরা গণমানুষের মজিবরের লোক না।

বিভিন্ন উপলক্ষে আনন্দ আয়োজন করতে হয়। সে সব আয়োজনে আলোচনাও রাখতে হয়। ইতিহাস থেকে কি আর বলবে? ওরা বর্তমান নিয়েই বলে। সুখে শান্তিতে দিন কাটানোর গল্প শোনায়। ওরা টাঁকশাল থেকে অনেক কিছু উজাড় করে দেওয়ার কথা বলে। ভুল করে সেখানে ঢুকে যাওয়া ব্রাত্যজন বুঝতে পারে না-এসবের মধ্যে সে কি পেয়েছে? তাকে এখনো বেঁচে থাকার যুদ্ধ করে যেতে হয়। তার মুক্তির লড়াই এখনো চলমান। চেতনার আলো এখন আর মানুষকে আলোকিত করে না। আকাশ আলোকিত হয় চেতনার আতশবাজিতে। উঁচু উঁচু দালানকোঠা আলোকসজ্জায় হয়ে ওঠে স্বপ্নের সোনার বাংলা।

মাঠে-ময়দানে সাধারণ মানুষেরা আগে যে নেতাদের মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা শুনতো, সেই মানুষেরা এখন মাঠে-ময়দানে স্বপ্ন ফেরি দিতে আসে না। কারণ, ওরা আর ফেরিওয়ালা নয়। ওরা এখন মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী। সাধারণ মানুষ এখন নতুন ফেরিওয়ালা খোঁজে। ফাঁকা মাঠে কোনো ফেরিওয়ালা নেই। স্বপ্ন বেচার মতো মাঠে-ময়দানে আর কেউ নেই। ফাঁকা মাঠ দখল হতে থাকে। জনসভা আর হয় না। বড় বড় শামিয়ানা ও তোরণ বসানো হয়। নগরের সব প্রান্তে হ্যালো মাইক্রোফোন টেস্টিং ওয়ান-টু-থ্রি শোনা যায়। হেলিকপ্টারে চড়ে বক্তা আসেন। বাহাত্তর হুরের স্বপ্ন দেখান। জনতা সেই স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ফিরে।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন