আবজাল-কীর্তন

পর্দার পেছনের মুখগুলো দেখতে চাই

বিজ্ঞাপন
default-image

ইংরেজি সাহিত্যে শেক্সপিয়ারের পরেই শ্রেষ্ঠ লেখক, শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে যাকে গণ্য করা হয়, তিনি হলেন, জন মিলটন। সতেরো শ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া এই কবিকে যদিও সাহিত্য রসিকেরা চেনেন তার ‘প্যারাডাইজ লস্ট’ ও ‘প্যারাডাইজ রিগেইনড’ নামক দুটি মহাকাব্যের জন্য। তবে মহাকাব্য ছাড়াও অনেক সাহিত্যধারায় তাঁর অবদান রয়েছে। মহাকাব্যের কবি হিসেবে ভুবনজোড়া তাঁর খ্যাতি, মহাকাব্যের ছায়ায় তার অন্য মহান সাহিত্য কর্মগুলো আড়ালে পড়ে থাকে কখনো কখনো। যারা তাঁকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছেন, তাঁরা জানেন তাঁর বহুমুখী প্রতিভার কথা। সাহিত্যের বাইরে তিনি রাষ্ট্র কর্তৃক ধর্মের অপব্যবহার, সাধারণ মানুষের ওপর চার্চের নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখর ছিলেন। মহাকাব্যের মতো মিলটনের খ্যাতি ছিল আর একটি বিষয়ে। সেটি হলো ইংরেজি সাহিত্যে সার্থক ‘এলিজি’ কবিতার কবি হিসেবে। অতি আপনজনের মৃত্যুতে মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনাবোধ তৈরি হয়। কবিদের সংবেদনশীল মনে সেই বেদনাবোধ হয় গভীরতর। কবিরা এ রকম মৃত্যুশোক প্রকাশ করে যে কবিতা লেখেন, সে রকম কবিতা হলো ‘এলিজি’। জন মিলটন তাঁর সহপাঠী বন্ধু এডওয়ার্ড কিংয়ের মৃত্যুতে ব্যথাতুর হয়ে ‘লিসিডাস’ নামে যে এলিজি লিখেছিলেন, সেটি ইংরেজি সাহিত্যের একটি বিখ্যাত শোকগাথা, মৃত্যুবেদনার শৈল্পিক বহিঃপ্রকাশ হিসেবে গণ্য করা হয়।

ইংরেজি সাহিত্যের সবচেয়ে বিখ্যাত এলিজি হচ্ছে ‘এলিজি রিটেন ইন আ কান্ট্রি চার্চ ইয়ার্ড’। এলিজিটি লিখেছিলেন থমাস গ্রে। এই একটি এলিজি লিখেই তিনি বাজিমাত (ক্ষমা করবেন গ্রে) করে গেছেন। পৃথিবীতে মৃত্যুশোক নিয়ে লেখা তাঁর এলিজি তাঁকে বিশ্ব সাহিত্যে অমর করে রেখেছে। থমাস গ্রে এলিজিটি কবি রিচার্ড ওয়েস্টের মৃত্যুশোকে কাতর হয়ে রচনা করেছিলেন। ১৭৫১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল। এ ছাড়া ইংরেজি সাহিত্যে টেনিসন, শেলিসহ অনেকেই এলিজি লিখে এর ধারা ও ধরনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এলিজি বা অন্ত্যেষ্টিগাথা লিখতে হয় মৃত্যুবেদনা থেকে উৎসারিত গভীর বেদনা বোধ থেকে এবং এলিজি হতে হবে কবিতা। গদ্যাকারে ও জীবিত প্রিয় মানুষকে নিয়ে এলিজি লেখা হয়েছে বলে এখনো জানা যায়নি। আর যদি কেউ এই অপকর্ম করতে যান, প্রকৃত কবিরা নিশ্চয়ই এলিজির সম্মান রক্ষার্থে প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠবেন। এসব তথ্য জানি বলে গদ্যাকারে দুঃখ–বেদনাগাথা একটি এলিজি লেখার প্রবল ইচ্ছা অবদমিত করে রেখেছি। এদিকে এলিজির মতো উচ্চমার্গের কবিতা লেখার সক্ষমতা থেকে বিধাতা আমাকে বঞ্চিত করেছেন। সবকিছু বিবেচনা করে তাই এলিজি কবিতা নয়, কিংবা গদ্যাকারে এলিজি নয়, গভীর বেদনাবোধ থেকে একটি বেদনা আখ্যান লেখার পণ করেছি, বলতে পারেন। লেখাটি সম্পূর্ণভাবে লেখকের অন্তর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেরিয়ে আসা বেদনাবোধের বহিঃপ্রকাশ—এ কথা হলফ করে বলতে পারি।

যাঁকে নিয়ে এই বেদনাগাথা লেখার ইচ্ছা পোষণ করেছি, তিনি আমার বাসা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে বসবাস করেন। তাঁর মতো মান্যগণ্য লোক যে আমার কুটিরের এত কাছে বসবাস করেন, তা জানতাম না বলে বিনয়ের সঙ্গে লজ্জা প্রকাশ করে নিচ্ছি প্রথমেই। এক অর্থে তিনি আমার অপরিচিত প্রতিবেশী বা কিংবা এলাকাবাসী। এলাকাবাসীর দুঃখে বেদনার উদ্রেক হওয়া খুব বেশি মাত্রার অনৈতিক কোন কর্ম নয় বলে আমি মনে করি। আমাকে এ ব্যাপারে কেউ অভিযুক্ত করতে হলে নিম্ন ডিগ্রির অভিযোগ নিয়ে আসতে হবে। জন মিলটন যাকে নিয়ে এলিজি লিখেছিলেন, সেই এডওয়ার্ড কিং আইরিশ সাগর পার হতে গিয়ে তার সলিলসমাধি হয়েছিল। আর আমার প্রিয় ব্যক্তি, আমি যার ফ্যান (পাখা নই) বা ভক্ত তিনি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে আশির দশকে বৈঠক কক্ষে রক্ষিত বোকার বাক্সের হার্টথ্রব নায়কের নামের সাদৃশ্য আছে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আশির দশকে যখন বঙ্গদেশে শুধু বিটিভি নামক একটি স্টেশন বা চ্যানেল ছিল, তখন আমাদের মতো মফস্বলীয় খাদ্য ধরনের মানুষেরা চোখের পলক না ফেলে একজন নায়কের নাটক দেখতে উদ্গ্রীব থাকতাম; তিনি হলেন আফজাল হোসেন। তাকে পর্দায় দেখলে তখনকার যুগের তরুণীদের হৃৎকম্প শুরু হতো বলে পত্রপত্রিকায় লেখা হতো। সেই আফজাল হোসেনের নামের সঙ্গে হুবহু মিল রেখে তিনি তাকে ছোট করতে চাননি, তাই তার নামে একটু ব্যতিক্রম আছে, ব্যতিক্রমী মানুষটির নাম আবজাল হোসেন। আফজাল হোসেন যেমন তার রূপ ও অভিনয়ের ক্যারিশমা দেখিয়ে তরুণীদের হৃদয় জয় করেছিলেন, আমাদের প্রিয় আবজাল হোসেনও তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা, সাহস দেখিয়ে সারা দেশে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছেন।

অত্যন্ত বেদনাক্রান্ত হৃদয়ে পাঠকদের জানাতে চাই, আমাদের অনেকের প্রিয় আবজাল ভাই সম্প্রতি দয়া পরবশ হয়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে যে মামলা হয়েছিল, সেই মামলার জের ধরে পুলিশ তাকে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে খুঁজে পায়নি। তার দয়ার শরীর, পনিরের মতো কোমল মন। করোনা-পূর্ব বাংলাদেশে ইচ্ছা করলেই অস্ট্রেলিয়াতে তার নিজের বাড়িতে উড়ে চলে যেতে পারতেন কিংবা তার মধ্যে কিছু লজ্জা বা ভীরুতা থাকলে তিনি নিদেনপক্ষে এ জগতের উঠতি একজন তারকার মতো বোরকা পরে ভারতের দিকে চলে যেতে পারতেন। এই বেদনাবোধের মধ্যেও আমার বুক গর্বে কিছুটা উঁচু হয়ে আসছে এই কথা ভেবে যে, আমাদের আবজাল ভাই পলয়ানবাদী ভীরু, কাপুরুষ নন। তিনি সত্যের মুখোমুখি হতে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন। এমন একসময় আত্মসমর্পণ করেছেন যখন গণমাধ্যম, সরকার, নাগরিক সমাজ একের পর এক ভোজবাজি, ভেলকিবাজি অবলোকন করে তার নাম পর্যন্ত প্রায় ভুলে বসেছিল।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
আমাদের মতো আমজনতা শুধু একবার দেখতে চায় পেছনের কুশীলবদের, যারা চিরকাল পেছন থেকে কলকাঠি নাড়িয়ে যায়, তারা সব নাগরিকের মতো জবাবদিহির আওতায় এসেছেন।

আবজাল মাত্র ২৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন বাংলাদেশের সবচেয়ে স্মার্ট একটি সরকারি অধিদপ্তরে। পাঠকেরা ইতিমধ্যে তার পরিচয় জেনে গেছেন গণমাধ্যমের কল্যাণে, তারপরও এ রকম তারকার পরিচয় বারবার উপস্থাপন করতে গর্ববোধ হয়। তাই পুরোনো কাসুন্দিটা আবার একটু ঘাটতে চাই। তার পরিচয়? তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেন। তার স্ত্রীও একই অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার রুবিনা খানম। দুদকের অনুসন্ধানে তাদের শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।

দুদক অনুসন্ধান থেকে উঠে আসে আবজাল ভাইয়ের কেরামতির ভয়াবহ চিত্র। আবজাল হোসেন ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীর একটি অভিজাত সরকারি আবাসন এলাকায় চারটি পাঁচতলা বিলাসবহুল বাড়ির খোঁজ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এই আবাসিক এলাকায় তাঁর দুটি মূল্যবান প্লটও রয়েছে। এসবের বাইরে সিটি ব্যাংক ও আরব বাংলাদেশ ব্যাংকে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ও ফরিদপুরের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের অঢেল সম্পদ। অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে বাড়ি। আবজাল ভাই সরকারি স্কেলে যৎসামান্য বেতন পেলেও মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিলাসবহুল বাড়ি কিনেছেন। তিনি গত এক বছরে বিভিন্ন দেশে ২৮ বারের বেশি সপরিবারে সফর করেছেন। প্রাডো, পাজেরো, হ্যারিয়ারের মতো দামি গাড়ির মালিক আবজাল দম্পতি। এ রকম জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় বাংলাদেশে আরও অনেকেই রাজত্ব গড়তে পেরেছেন। দুঃখ আবজাল ভাইয়ের জন্য, তার মতো দুর্ভাগা আজ কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রিয় আবজাল ভাই যখন জাল বিছিয়ে এত সম্পদের মালিক হয়েছেন, তিনি কি জাল একাই ছুড়েছিলেন জলাধারে? হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, যখন দেখি যারা তার কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ না করে তার থেকেও বেশি অর্থ উপার্জন করেছেন, তারা আবজাল ভাইয়ের বিরুদ্ধে টেলিভিশনে এসে বড় বড় কথা বলে যাচ্ছেন। মেধাবী আবজাল ভাই আজ একাই কারাগারে নির্জনে–নিরালায় বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দিনাতিপাত করছেন। আমাদের বঙ্গদেশে কোন ঘটনা ঘটলেই অকুস্থলে যাকে পাওয়া যায়, তাকেই অভিযুক্ত করা হয়। যারা ঘটনাস্থলের বাইরে কিংবা পর্দার পেছনে থাকেন, তাঁরা সদর্পে সমাজের আইকন সেজে ঘুরে বেড়ান। আমার দুঃখ, বেদনা, হাহাকার যাই বলেন, শুধু আবজাল ভাইকে একা কারাগারে দেখে। পুতুল নাচের সুতা যাদের হাতে, আমরা দর্শকেরা তাদের কোনোভাবেই দেখতে পাই না। গভীর অন্তর্জ্বালা, বেদনাবোধ থাকলেও বলব, আমরা এবার পর্দার পেছনের মুখগুলো দেখতে চাই, আবজাল ভাইদের সঙ্গে কিংবা পাশের প্রকোষ্ঠে।

আমাদের সরকারের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি আছে, সব ধরনের অস্বচ্ছতা, অসততার বিরুদ্ধে। আমরা প্রায়ই শুনতে পাই, যারাই জনগণের অর্থ অন্যায়ভাবে লুণ্ঠন করে নিচ্ছে, তাঁরা কেউ ছাড় পাবে না। আমাদের মতো আমজনতা শুধু একবার দেখতে চায় পেছনের কুশীলবদের, যারা চিরকাল পেছন থেকে কলকাঠি নাড়িয়ে যায়, তারা সব নাগরিকের মতো জবাবদিহির আওতায় এসেছেন। তাহলে সরকারের কাজে জনগণের স্বস্তি আসবে, জনগণের শান্তি, স্বস্তির দুটোরই বড় প্রয়োজন।

আমদের দেশের সাধারণ মানুষেরা বড়ই অসাধারণ, তাদের চাওয়া খুবই সীমিত। এই সীমিত চাওয়া, ন্যায়বিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সহজেই দেওয়া যায়। এই আশ্বাস সাধারণ মানুষেরা দীর্ঘদিন থেকে পেয়ে আসছে। এবার কি সৎ প্রচেষ্টা দেখে আশ্বাসের প্রতি জনগণের বিশ্বাস আসবে? আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী, এ কথাটি মনে রাখতে হবে সব পক্ষের।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন