default-image

‘একদা আমাদের যুক্তরাষ্ট্রে একটা সুন্দর লোকালয় ছিল, যেখানে মানুষ ছাড়া সব ধরনের জীব, পরিবেশের সঙ্গে সুর মিলিয়ে একই সঙ্গে, একই তালে চলত। সমান্তরাল উর্বর কৃষিক্ষেত্রে বেশুমার ফসল ফলতো, পাহাড়ি এলাকায় নানা মৌসুমি ফলমূল চাষ হতো। বসন্তে সবুজ খেতের ওপর দিয়ে সাদা খণ্ড খণ্ড মেঘ ভেসে যেত। শরতে পাইন গাছগুলোকে পেছনের পর্দা বানিয়ে ওক, বার্চ, মাপল গাছগুলো নিজেদের নানা রঙে সাজিয়ে রাখত। সন্ধ্যায় অদূরের পাহাড় থেকে শিয়ালের ডাক শোনা যেত। ভোরের আধো আলো-আঁধারে সেখানে হরিণদের চলাফেরা দেখা যেত।

সারা বছর ধরে পথিকেরা লোকালয়ের পথ ধরে হাঁটার সময় স্নিগ্ধ সবুজ মাঠের ওপর ফোঁটা রাশি রাশি বনফুলের নয়নাভিরাম দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হতো। শীতকালে দলে দলে পাখির ঝাঁক আসত ফল ও ঘাসের বিচি খেতে এবং ছানাদের খাওয়ানোর জন্য নিয়ে যেতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বসন্ত ও শরৎকালে লোক আসত বিচিত্র হাজারো বর্ণের পাখি দেখতে। আরও লোক আসত গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে মাছ ধরতে আর পাহাড়ে হরিণ শিকার করতে।

তারপর হঠাৎ কী যে হলো! এলাকাটির দৃশ্যপট একদিন সম্পূর্ণ পাল্টে গেল, যেন কোন শয়তান এসে সেখানে বসবাস করা শুরু করেছে। দলে দলে হাঁস মুরগি, গরু, ছাগল, ভেড়া, অসুখ হয়ে মারা যেতে লাগল। যে দিকে তাকাও, কেবল মৃত্যুর ছাপ। কৃষকরাও এই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মরা নিয়ে পরিবার–পরিজনদের মধ্যে বলাবলি শুরু করল। বড় বড় শহরে, ডাক্তাররাও হতভম্ব হয়ে এভাবে মৃত্যুর কারণ বুঝে উঠতে মাথা চুলকাতে থাকল। শুধু বড়রাই নয়, বাচ্চারাও খেলতে খেলতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে অজানা কারণে মারা পড়তে লাগল।

বিজ্ঞাপন

কোথা থেকে যে এমন উদ্ভট একটা রোগ এসে পড়ল! পাখিরা আর বীজ খেতে আসে না। এত দুর্বল যে, আর উড়তেও পারে না। তাদের কিচিরমিচির বন্ধ। মুরগিরা আর ডিম পাড়ে না। অল্প যেগুলো পাড়ে, তা থেকে আর ছানা হয় না। আপেল ফুলে আর মৌমাছি বসতে আসে না। তাই আপেল আর ফলে না। নদীতে মাছ নেই বলে কেউ আর তাদের ধরতে আসে না। যেন বসন্ত এসেছে, কিন্তু নিস্তব্ধ। দেখা গেল, বাড়ির ছাদে, মাঠে–ঘাটে, আকাশ থেকে পেঁজা বরফ পড়ার মতো সাদা সাদা পাউডারের গুঁড়ো ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে সর্বত্র। তার মানে কোন ভূত, প্রেত বা ডাইনি এসে দেশের এই বেহাল অবস্থা করেনি। মানুষই মানুষের এই ক্ষতিটা করেছে।

ওপরের দৃশ্যপটটি লিখেছেন পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে বিশেষভাবে স্মরণীয়, রেচেল কারসন নামে এক জীববিজ্ঞানী। ১৯৬২ সালে লেখা বিজ্ঞানসাহিত্যে একটি অনবদ্য বই লিখে এই নারী অমর হয়ে আছেন। বইটির বাংলায় নাম হতে পারে ‘নীরব বসন্ত’, আসল ইংরেজি নাম ‘Silent Spring’। পৃথিবীকে দূষণের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জনসাধারণকে তিনি অনুপ্রাণিত করেছেন এবং সরকারকে নাড়া দিয়েছেন এই অমূল্য বইটির মাধ্যমে। তাঁর মূল যুদ্ধ ছিল রাসায়নিক বস্তু প্রস্তুতকারকদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে যারা কীট ও জীবাণুনাশক রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। বহু সংগ্রাম করে, বহু প্রমাণাদি দিয়ে তিনি এই তথ্যটি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন—এই রাসায়নিক পদার্থগুলো ভীষণভাবে মানুষ, পশুপক্ষী, মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী, এমন কী গাছপালারও ক্ষতি সাধন করে। বিপুল বিত্তশালী ও প্রভাবশালী কেমিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারারদের সঙ্গে আজীবন যুদ্ধ করে জীবদ্দশায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলতে না পারলেও এ বিষয়ে মূল্যবান অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮১ সালে তাঁকে মৃত্যু পরবর্তীকালে মার্কিন ‘প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম’ নামের সম্মানীয় পুরস্কারটি দেওয়া হয়। আস্তে আস্তে মার্কিন জনগণ ও সরকার তাঁর যুক্তি অনুধাবন করতে সক্ষম হয় এবং তাঁর মৃত্যুর ৬ বছর পর প্রথম ‘বিশ্ব দিবস’ বা ‘আর্থ ডে’ প্রতিষ্ঠিত ও প্রতিপালিত হয়। মার্কিন কংগ্রেস ‘ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল পলিসি’ পাশ করেন।

এভাবেই ১৯৭০ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের শাসনকালে, আজকের বিশাল মহিরুহ ‘এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি’ সংক্ষেপে ইপিএর জন্ম হয়। যে সাদা সাদা পাউডার ব্যবহারের কুফল নিয়ে রেচেল গবেষণা করেছেন ও প্রস্তুত বন্ধ করার আন্দোলন করেছেন, রাসায়নিক সেই বস্তুটির সংক্ষিপ্ত নাম ‘ডিডিটি’। নতুন গঠিত সরকারি সংস্থা ইপিএ প্রথমেই নিজেদের দেশে সেই ডিডিটির ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। যদিও ১৯৭২ সালের পরেও ডিডিটি যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হতো, তবে তা কেবল রপ্তানির জন্য। আজ এ দেশে আর ডিডিটি বানানো হয় না, তাই রপ্তানিও হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তা ব্যবহৃত হয় প্রধানত মশা মেরে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য। সংক্ষিপ্ত শব্দ ডিডিটির একটা গাল ভরা নাম আছে, ডাইক্লোরো ডাই ফিনাইল ট্রাই ক্লোরো ইথেন।

দ্বিতীয় বিশ্ব মহাযুদ্ধের পর উদ্ভাবিত ডিডিটিকে আফ্রিকার ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ‘ওয়ান্ডার কেমিক্যাল’ হিসেবে গণ্য করা হলেও দেখা গেছে সেটি পুরোপুরি ঠিক নয়। বরং ডিডিটির আবহাওয়া পরিবর্তনেও একটা ভূমিকা আছে। ডিডিটি ব্যবহারে ক্ষতির তালিকায় আরও আছে মেয়েদের ব্রেস্ট ও অন্যান্য ক্যানসার, ভ্রূণ নষ্ট, রুগ্ণ শিশু প্রসব ও বেড়ে ওঠার সমস্যা, পুরুষত্বহীনতা, নার্ভ ও লিভারের জটিলতা, কাঁপুনি ও ঝাঁকুনি রোগ সমেত আরও অনেক কিছু।

রেচেল কারসন ছিলেন একজন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ ও লেখক। তাঁর জন্ম ১৯০৭ সালের ২৭ মে, পেনসিলভানিয়ার স্প্রিংডেল এলাকায়, মৃত্যু ১৯৬৪ সালে। তিনি বর্তমান চ্যাটাম কলেজ ও তারপর জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন ও ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে শিক্ষকতা করেন। ১৯৩৬ সালে তিনি ইউএস ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ড লাইফ সংস্থায় যোগ দেন। তাঁর প্রথম বই ‘আন্ডার দ্যা সী-উইন্ড’। তাঁর দ্বিতীয় বই দ্যা সী অ্যারাউন্ড আস’ বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেটি সর্বোচ্চ বিক্রিত বই হিসেবে উঠে এসেছিল।

১৯৬২ সালে ‘সাইলেন্ট স্প্রিং’ প্রকাশিত হওয়ার কিছু আগে ও পরে আলগাভাবে কিছু পরিবেশজনিত আইন থাকলেও তার তেমন প্রয়োগ ছিল না। ওই বইয়ের ডমিনো অ্যাফেক্ট একাধারে জনগণ ও সরকারের ওপর দারুণ প্রভাব ফেলে। ফলে ইপিএ একটি পরিবেশজনিত আইন ও তার প্রয়োগজনিত সংস্থা হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর একে একে অনেক পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বা রেগুলেটরি অ্যাক্ট তৈরি হয়েছে। তাদের প্রধান কয়েকটির ইংরেজি নাম করা যায়। যেমন—

১) বায়ুদূষণ প্রতিরোধের জন্য ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ ২) পরিচ্ছন্ন পানি সরবরাহের জন্য’ ক্লিন ওয়াটার অ্যাক্ট’ ৩) বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহের জন্য ‘সেফ ড্রিংকিং ওয়াটার অ্যাক্ট’ 8) জঞ্জাল নিয়ন্ত্রণ ও তা থেকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ‘আরসিআরএ বা রিসোর্স কনজারভেশান অ্যান্ড রিকভারি অ্যাক্ট’ ৫) কীটপতঙ্গ, ফাঙ্গাস ও ইঁদুর মারার জন্য ‘ফিফরা’ বা ‘ফেডারেল, ইন্সেকটিসাইড, ফাঙ্গিসাইড অ্যান্ড রোডেন্টিসাইড অ্যাক্ট’-এর মতো আরও অনেক আইন।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0