জগতে দুধরনের লোক আছে। এক দল পরিশ্রম করে উপার্জন করে। আরেক দল আছে, যারা এই প্রথম দলের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টায় থাকে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে উন্নত জীবনের খোঁজ করা। আগের চেয়ে সচ্ছল হয়ে কে না বাঁচতে চায়। নিজের পরবর্তী প্রজন্মের জীবনকে আরেকটু সহজ করে দিতে কে না চায়। এই চাওয়া থেকেই মানুষ তার উপার্জন, তথা জীবনধারণের উপায়কে আরও উন্নত করতে চায়। এ ক্ষেত্রে প্রথম দলের লোকেরা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমের ওপর আস্থা রাখেন। আর দ্বিতীয় দলটি এসব কিছুই করতে চায় না। পারলে বিনা পরিশ্রমেই উন্নতির শিখরে চড়ে বসতে চায় তারা। আর এ ক্ষেত্রে তাদের মূল নির্ভরতা প্রতারণায়।

দ্বিতীয় দলে থাকা এই প্রতারক চক্র মূলত প্রথম দলের পরিশ্রমী মানুষের পকেট কাটায় ব্যস্ত থাকে। সব দেশে সব সময়ই এ ধরনের লোক ছিল ও আছে। এই দলটির দৌরাত্ম্যে বাঁধ দিতেই রাষ্ট্র নানা প্রতিষ্ঠান ও আইনকে ব্যবহার করে। নানা ধরনের প্রতারণার হাত থেকে মানুষকে রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই পালন করতে হয়। তবে এই দায়িত্ব পালনের জন্য রাষ্ট্রের কাছে প্রতারণার খবরটি ঠিকঠাক পৌঁছানোও জরুরি। এই খবর যেন যথাযথভাবে পৌঁছায়, সে জন্য রাষ্ট্রের দিক থেকে কিছু ব্যবস্থাও থাকে। এই ব্যবস্থাগুলোকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার খবরটি রাষ্ট্রের কানে পৌঁছে দেওয়া এবং এর প্রতিকার চাওয়ার দায়িত্বটি পালন করতে হয় সাধারণ মানুষকেই।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান পণ্যের পৃথিবীতে অর্থনীতির মূল জ্বালানি আদতে ভোগ। এই ভোগ ও এর সঙ্গে যুক্ত বিষয়াদিই এখন প্রতারকদের মূল লক্ষ্য। ফলে বর্তমানে প্রতারকেরা এই ভোগকে কেন্দ্র করেই তাদের প্রতারণা কৌশলটি তৈরি করে। এতে মূলত আক্রান্ত হয় সাধারণ মানুষ। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের কিছু গ্রোসারিতে পদ্মার ইলিশ বলে মিয়ানমার বা থাইল্যান্ডের মাছ বিক্রির ঘটনা, এ ধরনের প্রতারণার কথা মনে করিয়ে দেয়। শুধু পদ্মার ইলিশ নয়, অন্য মাছের ক্ষেত্রেও এমন প্রতারণা করা হচ্ছে।

বাঙালি মাত্রই মাছে-ভাতে স্বচ্ছন্দ। আর দেশের মাছের কথা শুনলে দরকারে একটু বেশি দাম দিতেও তার কুণ্ঠিত হয় না। দীর্ঘদিন ধরে যে মানুষটি দেশ থেকে দূরে আছেন, তাঁর কাছে দেশের যেকোনো কিছু ভীষণ আকর্ষণীয়। মাছের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই। আর যদি শোনে পদ্মার ইলিশ, তবে দেশে থাকা মানুষই লোভ সামলাতে পারে না। বিদেশে তবে পরিস্থিতি কী হবে, তা সহজেই অনুমেয়। দেশি মাছ, বিশেষত পদ্মার ইলিশের প্রতি বাংলাদেশিদের এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগাচ্ছে এক দল প্রতারক ব্যবসায়ী। দুঃখজনক হলো, এই ব্যবসায়ীরাও আবার বাংলাদেশি মার্কিন। তারা মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড থেকে আনা মাছ বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশ লেখা প্যাকেটে ভরে বিক্রি করছে। কিন্তু সেই মাছে নেই ইলিশের চিরচেনা স্বাদ ও গন্ধ।

খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) চোখ ফাঁকি দিয়ে এসব ডিলার ও সুপার শপগুলো দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। সম্প্রতি একটি বাংলাদেশি মার্কিন মালিকানাধীন ডিস্ট্রিবিউটরের কয়েক প্রজাতির মাছ বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এফডিএ। পরে লেবেল পাল্টে এসব মাছ আবার বাজারে সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু গ্রাহকেরা ঠিকই বুঝতে পারছেন তাঁদের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি। আর এ কারণেই এখন দায়িত্বটি ভোক্তা বা গ্রাহকদের ওপর বর্তাচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করে এবং এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বর্জন করে এই প্রতারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট প্রতারক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্জন করলে, এ ধরনের প্রতারণার দায় পুরো কমিউনিটির ওপর পড়ার আশঙ্কা থাকবে না। একই সঙ্গে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানও এ ধরনের প্রতারণার পথে এগোবে না। সবাইকে সম্মিলিতভাবেই এই প্রতারক চক্রকে প্রতিরোধ করতে হবে।

মন্তব্য পড়ুন 0