default-image

আধুনিক স্থাপত্য প্রকৌশলের এক সফল নাম আনোয়ার ইকবাল। বিশ্ব জয় করা স্থপতি এফ আর খানকে আমরা জানি। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো নগরের ঐতিহাসিক সিয়ার্স টাওয়ারের নকশা করে স্থাপত্য প্রকৌশলকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিলেন এফ আর খান। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এফ আর খনকে ভোলেনি। তাঁর নামে সড়ক হয়েছে প্রসিদ্ধ নগরীতে। সিয়ার্স টাওয়ারের নতুন নাম হয়েছে ‘উলস টাওয়ার’। সেখানে ঘুরতে যাওয়া হাজারো পর্যটক বঙ্গ সন্তান এফ আর খানের ওপর নির্মিত তথ্যচিত্র দেখেন। আমরা স্বদেশিরা আপ্লুত হই।

এফ আর খানের উত্তরসূরিদের কেউ কেউ দাপটের সঙ্গে মার্কিন স্থাপত্য প্রকৌশলকে সমৃদ্ধ করছেন। এমন এক স্বদেশি প্রকৌশলী আনোয়ার ইকবাল। স্থাপত্য কর্মের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চান বিনয়ী এ কর্মপাগল মানুষটি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। এখন নিজেই গড়ে তুলেছেন স্থাপত্য প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান। পাদপ্রদীপের আড়ালে থাকতে পছন্দ করা মানুষ আনোয়ার ইকবাল প্রকৌশলী না হলে একজন বিখ্যাত লেখকও হতে পারতেন। তাঁর ঝরঝরে গদ্য পাঠকদের টানে। পেশা আর নেশায় ব্যস্ত এ মানুষ প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার শুরু থেকে মাঝেমধ্যে লিখে আসছেন। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার পক্ষ থেকে বসেছিলেন আসিফ মোক্তাদির, যেখানে তিনি অনেক বিষয়ে অকপটে কথা বলেছেন।

আপনার ব্যক্তিগত জীবন দিয়েই শুরু করা যাক...

আনোয়ার ইকবাল: আমার জন্ম ঢাকায়, ১৯৫৮ সালে। বাবা-মা দুজনই সিলেটের। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী, আর মা গৃহিণী। তাঁদের দুই ছেলে আর দুই মেয়ের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। আমার বড় বোন একজন চিকিৎসক। আর বাকি দুই ভাইবোন প্রকৌশলী। আমি বিবাহিত, দুই সন্তানের জনক। স্ত্রী এ দেশের একটি বাণিজ্যিক বিমান সংস্থায় কর্মরত। ছেলে প্রকৌশলী, মেয়ে হিসাববিদ।

বিজ্ঞাপন

আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে পাঠকদের কিছু বলুন।

আনোয়ার ইকবাল: ১৯৭৩ সালে মাধ্যমিক ও ১৯৭৫ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করি; দুটোই সিলেট থেকে। এর পর ঢাকায়; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে থেকে স্থাপত্যে স্নাতক, ১৯৮২ সালে। পরে নগর-পরিকল্পনা ও ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে লেখাপড়া করি।

স্থাপত্যবিদ্যায় পড়ার স্বপ্ন কি ছোটবেলা থেকেই ছিল?

আনোয়ার ইকবাল: হ্যাঁ, এবং না। এটা অনেক দীর্ঘ গল্প। এত স্বল্প পরিসরে সবটুকু বলা সম্ভব নয়। এটুকু শুধু বলি, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় একজন স্থপতিকে দেখে স্থাপত্যবিদ্যা সম্পর্কে আমার প্রথম আগ্রহ জন্মে। বাবা পুরকৌশলী হলেও তিনি সরকারি পর্যায়ে ভবন পরিকল্পনা বা ভবনের নকশা করতেন। ছোটবেলা থেকে এই ডিজাইন ব্যাপারটা তাই আমাকে আকর্ষণ করত। তারপর প্রকৌশলীই হওয়ার ইচ্ছা বেশি ছিল। উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে এসে মনে হলো স্থাপত্যেও ভর্তি পরীক্ষা দিই। ভর্তি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর যখন দেখলাম মাত্র ৩০ জন উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর মধ্যে আমারও নাম আছে, তখন সেটাতেই ভর্তি হওয়ার তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নিই।

বুয়েটে পড়াকালের উল্লেখযোগ্য কোন স্মৃতির কথা বলবেন?

আনোয়ার ইকবাল: বাবার সরকারি চাকরির কারণে আসলে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই আমি তিন বছরের বেশি কাটাইনি। বুয়েটই একমাত্র জায়গা যেখানে আমার সবচেয়ে লম্বা সময় কেটেছে; পাঁচ বছর। আর সেটা ছিল বাড়ির বাইরে আমার প্রথম মুক্ত জীবন। প্রাপ্ত বয়সে ঢোকা, আর সঙ্গে সঙ্গে এমন এক স্বাধীনতা; দুটো ব্যাপার আমাকে এই সময়টায় অনেক নতুন অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচয় করিয়ে দেয়। আসলে সেখানকার প্রতিটি স্মৃতিই উল্লেখযোগ্য। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব?

রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হলেন কীভাবে?

আনোয়ার ইকবাল: প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়েছি আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর। উনসত্তরের গণ-আন্দোলন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার আমাদের প্রজন্মের কারও পক্ষেই রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরে থাকা সম্ভব ছিল না। যে জন্যে এর সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম সেই ষষ্ঠ শ্রেণিতে থাকার সময়েই। বুয়েটে থাকাকালে আমি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলাম। ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতিও ছিলাম।

বুয়েট থেকে পাস করে বের হওয়ার পরের গল্পটা শুনতে চাই।

আনোয়ার ইকবাল: ১৯৮২ সালে বুয়েট থেকে বের হওয়ার পর ঢাকার একটা স্থাপত্য পরামর্শক অফিসে যোগ দিই। সেখানে কিছুদিন কাজ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার জন্য আসি। ১৯৮৫ সালে দেশে ফিরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিই। ১৯৮৭ সালে সেটা ছেড়ে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসি। তখন থেকে শুরু করে ওয়াশিংটন ডিসি মেট্রো এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থপতি হিসেবে কাজ করছি। ১৯৯৫ সালে চাকরি জীবন থেকে বেরিয়ে নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে স্থাপত্য পরামর্শকের কাজ শুরু করি। ভার্জিনিয়ার ফেয়ারফ্যাক্সে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানের নাম জি-এইচ-এ আর্কিটেক্টস। এখানে আমরা মূলত পর্যটনের সঙ্গে সম্পর্কিত ভবনের নকশা পরিকল্পনা করি।

অবসর সময়ে কী করতে পছন্দ করেন?

আনোয়ার ইকবাল: কাজের চাপের জন্য অবসর সময় খুব একটা পাওয়া যায় না। ঘোরাঘুরি আমার নেশা। সুযোগ পেলেই দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াই। অবসরে লেখালেখি করতে পছন্দ করি।

আপনার লেখালেখির শুরুটা কীভাবে?

আনোয়ার ইকবাল: বই পড়া শুরু করি স্কুলে পা রাখার আগে থেকেই। লিখতে শুরু করি যখন, তখন খুব সম্ভবত ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। সত্তরের দশকে ঢাকার বিভিন্ন পত্রিকায় আমার লেখা নিয়মিত ছাপা হয়েছে। আশির শুরু থেকে এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত লেখালেখিটা নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতাম। তারপর ইদানীং ফেসবুকে লেখা দিতে শুরু করি। প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার আবাসিক সম্পাদক ইব্রাহীম চৌধুরীর অনুরোধে সেখানেও নতুন করে লেখা দিতে শুরু করি। বই লেখার ইচ্ছা কখনো ছিল না। আমার লেখা যারা পছন্দ করেন, তাঁদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত একটি বইও করে ফেলি। এ বছরের বইমেলায় আমার প্রথম বই ‘বুয়েটামি’ প্রকাশিত হয়। বুয়েট জীবনের স্মৃতিগুলো নিয়েই এ বই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রবাস জীবনের শুরুটা নিয়ে লেখা আরেকটি বই আগামী বইমেলায় বেরোনোর কথা আছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন দীর্ঘদিন ধরেই। এখানের বাঙালি কমিউনিটির সঙ্গে কতটুকু জড়িত আপনি?

আনোয়ার ইকবাল: সামাজিকভাবে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনেক কিছুর সঙ্গেই জড়িত। তবে সাংগঠনিকভাবে উল্লেখ করার মতো বিশেষ কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত প্রথম বইমেলার প্রধান সমন্বয়ক ছিলাম। এই এলাকার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক সংগঠন ধ্রুপদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মূল আয়োজকদের মধ্যে আমিও আছি। এ ছাড়া এখানকার কয়েকটি সাহিত্য সম্পর্কিত সংগঠনের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের সঙ্গেও জড়িত রয়েছি।

দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে নতুন আসা অভিবাসী বা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার কোনো পরামর্শ...

আনোয়ার ইকবাল: অভিবাসনের শুরুটা সবার জন্য সব সময় মসৃণ হয় না। নিজেকে যেকোনো লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করতে হলে পরিশ্রম ও ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। সদিচ্ছা ও উদ্যোগ থাকলে এ দেশে যেকোনো সেক্টরেই ভালো করা সম্ভব। আমি বলব, এই দেশে অন্তত একটা ভালো চাকরিকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য না বানানোর সুযোগটা রয়েছে। তাই যা করতে ভালো লাগে, সেটাকে নির্ভর করে একজনের ক্যারিয়ার গড়ে তোলাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0