default-image

রাত তখন ১০টা ৫৩ মিনিট। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। ইস্ট এল্মহার্স্টের ৮৮ স্ট্রিটের কর্নারে তখন রেড লাইটে গাড়িটা থামিয়েছি। হঠাৎ সাইডওয়াকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি তরুণীকে চোখে পড়ল। পিঠে তার বেবি ক্যারিয়ারে ছোট একটি শিশু। পাশে একটি শপিং কার্টে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্যান ও সংগৃহীত বোতলের বড় বড় প্লাস্টিক ব্যাগগুলো ঝোলানো। গাড়ির জানালা খুলে জানতে চাইলাম, এমন বৃষ্টির দিনে ছোট বাচ্চাটিকে নিয়ে কেন ক্যান-বোতল টোকাচ্ছেন? তিনি কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন। বুঝতে পারলাম, ভাষাগত সমস্যা। তারপর আকার-ইঙ্গিতে অনেকটা সময় নিয়ে ভাঙা ভাঙা শব্দে সামান্য কিছু জানার সুযোগ পেলাম।

স্প্যানিশ তরুণীটির নাম পেরেজ, সিঙ্গেল মাদার। সম্পূর্ণ নাম জানা হয়নি। ১১ মাসের শিশুটিকে পিঠে বেঁধে এভাবেই পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্যান ও বোতল সংগ্রহ করেন রোজ। প্রতিবার কার্ট পূর্ণ হলে, কোন এক রিডেম্পশন কেন্দ্রে গিয়ে জমা করেন। দৈনিক ৮/৯ ঘণ্টা সময় ব্যয় করে খুব বেশি কিছু অর্জন না হলেও মোটামুটি সংসার চলে যায়। জানালেন, ৩ বছর যাবত পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্যান-বোতল সংগ্রহ করে ক্যানিং করছেন তিনি। বাচ্চাটিকে দেখার মতো কেউ নেই, তাই পিঠে করেই কাজ করেন।

চোখে ভেসে উঠল ফ্লাশিংয়ের নিত্য দৃশ্যপট। বিশেষ করে মেইন স্ট্রিটে এমন বহু মানুষকে রোজ প্লাস্টিক ব্যাগ হাতে কিংবা কোনো সুপার মার্কেটের এক চাকার শপিং কার্টটা ঠেলে, সাইডওয়াকে থাকা গার্বেজ ব্যাগ থেকে ক্যান-বোতল খুঁজতে দেখি। বছর দুয়েক আগে কথা হয়েছিল ফ্লাশিংয়ের এক দম্পতির সঙ্গে। থাকেন বার্ক্লি অ্যাভিনিউয়ে। তারা নিজেদের গাড়ি চালিয়ে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্যান ও বোতল সংগ্রহ করেন। শপিং কার্ট পূর্ণ হলে রোজ সময় ব্যয় করে পুনর্নির্মাণ কেন্দ্রে না গিয়ে, নিজ বাড়িতে জমা করে রাখেন সামগ্রীগুলো। তারপর এক সঙ্গে সেগুলো কেন্দ্রে নিয়ে যান। দৈনিক ৮/৯ ঘণ্টা গাড়িতে করে জুটি ক্যানার হিসেবে কাজ করায় বছরে মোটামুটি ৩০ হাজার ডলারের মতো রোজগার করেন বলে জানান সেই দম্পতি।

তবে, বেশির ভাগ ক্যানাররা কেবল তাদের নিজের পায়ে নির্ভর করেই কাজ করেন। পেরেজের ক্ষেত্রে এটিই ঘটেছে, যাকে দিনে অন্তত দুই/তিন বার রিডেম্পশন কেন্দ্রে উপচে পড়া শপিং কার্টটি ঠেলে নিয়ে যেতে হয়। এভাবেই তিনি ক্যানিং দিয়ে জীবিকা নির্বাহের পথটি ধরে রেখেছেন। তার কাজের আরও একটি কৌশল হলো, ইস্ট এল্মহার্স্টে কনডো পরিচালনা করে এমন দু/একটি বিল্ডিং সুপারিন্টেন্ডেন্টের সঙ্গে সুন্দর সম্পর্ক রাখা। বিল্ডিং সুপার সপ্তাহের পূর্ব নির্ধারিত দিন এবং সময়ে পেরেজকে তাদের বেসমেন্টগুলোতে যেতে দেন। সেখান থেকে সব পুনর্ব্যবহারযোগ্য আইটেমগুলো পেরেজ সংগ্রহ করতে পারেন। বিনিময়ে পেরেজ তাদের জন্য আবর্জনা বাছাই করে জায়গাটি পরিষ্কার করে দেন।

বিজ্ঞাপন

নিউইয়র্কের বিভিন্ন জায়গায় আমরা রোজ দেখতে পাই, এমন সব ক্যানারের যারা রোজ পথের পাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিক ব্যাগ থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্যান-বোতলগুলো সংগ্রহ করে থাকেন। দু/একজন বাবা–মায়ের সঙ্গে কথা বলেও জেনেছি, তারা বাচ্চাদের কলেজ শিক্ষার জন্য অর্থ দিতে ক্যানিংয়ের কাজটি করছেন। আবার অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে রাস্তায় পড়ে থেকে সামান্য খাদ্য ও সিগারেটের খরচ জোগাতে ক্যানিং করে থাকেন।

গত বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি করা সিএনএন একটি প্রতিবেদন করেছিল। ২০১২ সাল থেকে ক্যানার হিসেবে কাজ করা শিকাগো ক্রসবি সিএনএনকে বলেন, প্রতিদিন তিনি ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা ক্যান এবং বোতল সংগ্রহ করেন, সম্পূর্ণ কার্টটি পূর্ণ করতে পারলে প্রায় ৬০ ডলার চলে আসে। দারিদ্র্য, বেকারত্বে থাকা মানুষগুলোর জন্য ক্যানিং হচ্ছে বেঁচে থাকায় অর্থ উপার্জনের একটি সম্মানজনক মাধ্যম। ব্রুকলিন রিডেম্পশন কেন্দ্রের ‘শিওর উই ক্যান’–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যানা মার্টেনেজ ডি লুসোর মতে, ক্যানাররা মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেকেরই আবার সঙ্গে অবসরপ্রাপ্ত বা প্রতিবন্ধী বেনিফিট রয়েছে।

২০০৫ সালে ম্যানহাটনের ৫২তম স্ট্রিট ও ১৩তম অ্যাভিনিউয়ের মধ্যে রিডেম্পশন কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেওয়া হলে ওয়েস্ট সাইড ক্যানারদের মানুষ তখন তাদের পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিসগুলো ফেলার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাটি খুঁজে পেতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। সুপার মার্কেটের বাইরের রিভার্স ভেন্ডিং মেশিনগুলো তখন প্রচুর পরিমাণে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ফেলার জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। তা ছাড়া রিভার্স ভেন্ডিং মেশিনগুলো আকারে ছোট হয় বিধায় বেশি সামগ্রী ঠাসা হলে জ্যাম হয়ে যায়। সে সময় অ্যানা মার্টিনেজ ডি লুকো এক বছরের বেশি সময় ধরে এটির ওপর কাজ করছিলেন। তিনি ইউএন ও অন্যান্য এনজিওতে কর্মরত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং শেষ পর্যন্ত একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করতে পর্যাপ্ত অনুদান সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তিনি দক্ষিণ ক্যারোলাইনার গৃহহীন ইউজিন গ্যাডসেনের সঙ্গে ম্যানহাটনে একটি নতুন রিডেম্পশন কেন্দ্র খোলার চেষ্টা করেন, যার নাম ছিল, ‘সিউর উই ক্যান।‘ শুরুতে এটি ২৯তম স্ট্রিটের স্টোরেজের জায়গায় ছিল। তবে তিন বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটিকে পাঁচবার বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তর করা হয়। সবশেষে সংগঠনটি বুশউইকের একটি ফাঁকালটে মাসিক ৫ হাজার ৩০০ ডলারে স্থানান্তরিত করা হয়।

এখন পর্যন্ত ম্যানহাটনে আর কোনো রিডেম্পশন কেন্দ্র নেই। অন্যান্য বোরোতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ৪০ থেকে ৫০টি রেডিম্পশন সেন্টারের কয়েকটি শহরে ট্রাক পাঠিয়ে মোবাইল রিডেম্পশন হটস্পট হিসেবে কাজ করে।

এই জীবনযাপন অবশ্যই ক্যানারদের শারীরিকভাবে চাপ তৈরি করে। প্রায়শই ভারী গাড়িগুলোকে দীর্ঘ দূরত্ব পথে টেনে নিতে হয়, এমনকি প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও। এটি করতে নিরাপত্তার ঝুঁকিও রয়েছে, কারণ আবর্জনা থেকে বাছাই করা ভাঙা কাচ থেকে আঘাত বা বিপজ্জনক বর্জ্যের সংস্পর্শে আসতে পারে ক্যানাররা।

নিউইয়র্কসহ ১০টি রাজ্যে ‘বোতল বিল’ রয়েছে যার জন্য ক্যান এবং বোতলগুলোতে ফেরতযোগ্য অর্থ জমা দিতে হয়। লক্ষ্য করবেন, আমরা যখন পানির বোতল কেইস কিনতে যাই, আমাদের বাড়তি কিছু পয়সা কেইস প্রতি দিতে হয়। কাউন্টার থেকে বলে দেওয়া হয়, যদি আমরা পানির বোতলগুলো ফেরত পাঠাই দোকানে, তবে সে বাড়তি পয়সা আমাদের ফেরত দেওয়া হবে। এগুলো পুনর্ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক উৎসাহ হিসেবে করা হয়েছে।

এই জাতীয় আইনের অধীনে গ্রাহক বোতল বা দোকানে অতিরিক্ত শুল্ক দেন। ক্যানাররা তখন ফেলে দেওয়া ক্যান-বোতলগুলো তুলে নেয় এবং সেগুলো একটি রিডেম্পশন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। রিডেম্পশন কেন্দ্রটি আবার সেগুলো মূল বিতরণকারীর কাছে বিক্রি করেন এবং হ্যান্ডেলিং ফিসহ সেই করটি ফেরত নেন।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ব্যয়বহুল শহর হিসেবে বিবেচিত নিউইয়র্ক সিটিতে যে কেউ ক্যান সংগ্রহ করতে পারেন। সব ধরণের কাজের সুযোগ রয়েছে এখানে। একটি ক্যানের আমানত মূল্য ১৯৮২ সাল থেকে ৫ সেন্ট অবধি রয়ে গেছে।

প্লাস্টিক বর্জ্য সংকট মোকাবিলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফেডারেল আইনে দেশজুড়ে ফেরতযোগ্য ক্যানের মূল্য ১০ সেন্ট হিসাবে বাড়ানো হবে বলে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সেন টম উদাল (ডি-এন এম) ও ইউএস রেপ অ্যালান লোয়েথাল (ডি-ক্যালিফোর্নিয়া) ঘোষণা করেছিলেন। তবে ‘বোতল বিল’ ব্যয় উদ্বেগের কারণে পানীয় শিল্পের বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছে এটি। ১৯৮৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত মাত্র একটি জাতীয় আইন পাস করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন