default-image

আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি, আমাদের অবস্থা হলো না ঘরকা, না ঘাটকা। আমরা দেশে প্রবাসী, বিদেশে অভিবাসী! আমাদের মধ্যে আরেকটি গ্রুপ আছেন, তাঁরা নিজেদের দাবি করেন বোহেমিয়ান হিসেবে। তাঁরা অবশ্য ঘর বা ঘাট কোনোটা নিয়েই চিন্তিত নন। তাঁরা সৃষ্টিকর্তার তৈরি এই প্রকাণ্ড বিশ্বকে নিজের চারণভূমি মনে করে সানন্দে আজ এখানে, তো কাল ওখানে ঘুরে বেড়ান।

মুশকিল হল এই ‘না ঘরকা, না ঘাটকা’ শ্রেণির। তাদের কথায় কথায় দেশের জন্য পেট পোড়ে। আবার বিদেশের মোহও ত্যাগ করতে পারে না। অনেকে আবার বিদেশের আরাম আয়াসে থেকে সতেজ হয়ে, দেশের নানা ইস্যু নিয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে ভালোবাসেন। কেউ কেউ দেশের কথায় ক্ষণে ক্ষণে নস্টালজিক হয়ে ওঠেন। তাদের চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। তবু তারা ফিরে যাওয়ার নামটি করে না। আরেকটি দল বছরে অন্তত একবার হলেও দেশে যান। জল-কাদা দিয়ে দেশে রেখে আসা শেকড়টির পরিচর্যা করেন এবং বুড়ো বয়সে আবারও শেকড়ের কাছে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসেন। যাদের জন্ম হয়েছে বিদেশের মাটিতে, তারাও কদাচিৎ আগ্রহভরে তাদের পূর্বপুরুষের শেকড়ের সন্ধানে দেশে গিয়ে উপস্থিত হন। এই টানাপোড়েন চলতেই থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

কিন্তু যেই জন্মভূমিকে আমরা পেছনে রেখে আসি, সেই দেশটিও আমাদেরই দেশ। তাকে আমরা হৃদয়ে লালন করি। আমরা যারা দেশের বাইরে আছি, তারা একদিন পুরো দেশটিকেই বুকের খাঁচার ভেতর পুরে নিয়ে দেশ থেকে বের হয়েছিলাম। দেশের নানা সুখ-দুঃখের স্মৃতি আমরা বুকের গভীরে জমিয়ে রাখি। সুখে-দুঃখে পুরোনো স্মৃতিগুলো বারবার উল্টে পাল্টে দেখি। সেসব হারানো দিন নিয়ে আমাদের বিলাসিতার শেষ নেই। তাই দেশটির অসুখ হলে, দেশে অশান্তির আগুন জ্বললে, আমাদের বুকের ভেতরে আমরা সেই উত্তাপ অনুভব করি।

বিজ্ঞাপন

আমরা জন্মভূমিকে কখনো ভুলে যাই না। শুধু ভৌগোলিকভাবে দেশ থেকে দূরে থাকি মাত্র। তাই দেশপ্রেম নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুললে আমরা কষ্ট পাই। বিধাতা মানুষের হৃদয়কে বিপুল পরিমাণ ধারণক্ষমতা দিয়েছেন। তাই একজন ক্ষুদ্র মানুষ তার হৃদয়ের ভান্ডারে পাহাড়, সাগর ও আকাশ সমান ভালোবাসা ধারণ করতে পারে। দেশের মানুষ বা স্বদেশকে ভালোবাসলে অন্য মানুষ বা অন্য দেশকে ভালোবাসা যাবে না, তা তো নয়। মহৎ ভালোবাসার কাছে দেশ, কাল, জাত-পাত সবই ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ!

আমি ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে দেশ, কাল, ধর্ম, বর্ণের গণ্ডির ভেতরে আবদ্ধ রাখতে চাই না। নিজেকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবেই ভাবতে বা দাবি করতে চাই। তাই একটা সময়ে এসে মনে মনে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে হাত তুলে এই বিশ্বকে নিজের দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছি। তাই মানুষ মাত্রই আমার কাছে স্বজাতি। তাদের ধর্ম, বর্ণ, জাতি আমার মনে বিভেদের দেয়াল তুলতে পারে না। এসব নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথাও নেই।

প্রতিটি মৃত্যু আমাকে আপনজন মৃত্যুর মতোই কষ্ট দেয়। বিধর্মী বলে কারও মৃত্যুতে উল্লাস করতে আমি পারি না। মানুষের মৃত্যুতে আমার বুকে সত্যিই রক্তক্ষরণ হয়। সে হোক হিন্দু, খ্রিষ্টান, ইহুদি বা মুসলিম। সে হোক কালো, বাদামি বা সাদা! যেখানে একটি পশুর মৃত্যুও আমাদের কষ্ট দেয়, কাঁদায়, সেখানে মানুষ মেরে আমরা কীভাবে উল্লাস করি? তার পাপের, তার কৃতকর্মের বিচারের দায়িত্ব কি কেউ আমাদের হাতে দিয়েছে? এই অধিকার আমরা কোথায়, কার কাছ থেকে পেয়েছি?

একজন মানুষের জীবন কী এতই তুচ্ছ? এতই মূল্যহীন? ধর্মের নামে আমরা আগেও অজস্র মানুষ মেরেছি; আজও মারছি! মানব সভ্যতার কি আদৌ কোনো উত্তরণ নেই? হাজার বছর ধরে আমরা সেই একই চক্রে আটকে আছি। ধর্ম আগে, না মানুষ আগে? ধর্মের জন্য মানুষ, না মানুষের জন্য ধর্ম? এই বিতর্কের শেষ কবে হবে? কবে আমরা ধার্মিক নয়, শুধুই মানুষ হব? পৃথিবীতে প্রচলিত প্রতিটি ধর্মই শান্তির কথা বলে। বলে মানবতার কথা। মনুষ্যসমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্যই ধর্মের আবির্ভাব হয়েছিল। যুগে যুগে নবী, রাসুল, ধর্মীয় অবতারদের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাঁরা নিজেরা কষ্ট করেছেন, কষ্ট পেয়েছেন। কিন্তু মানুষ হত্যা, রক্তপাত ও হানাহানিকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কোন ধর্ম আগে, কোন ধর্ম পরে, কোন ধর্ম ভালো, কোন ধর্ম খারাপ—এসব প্রশ্ন না তুলে যার যার বিশ্বাস নিয়ে কেন আমরা শান্তিতে কাটাতে পারছি না? কেন আমার বিশ্বাস আমি অন্যের ওপর চাপাতে চাই? কেন অন্যের বিশ্বাস নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করি?

আরও কত হাজার বছর লাগবে আমাদের পরিপূর্ণ মানুষ হতে? আর কত রক্তপাত প্রয়োজন আমাদের শুদ্ধ হতে? তবে কি এই বিশ্ব ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত আমরা এভাবেই চালিয়ে যাব? তবে কি এভাবেই একদিন এই পৃথিবী নামের গ্রহটি ধ্বংস হয়ে যাবে? যেহেতু ধর্ম ও হানাহানি—দুটিরই সূত্রপাত হয়েছে মানুষের হাত ধরে, তাই পৃথিবী নামের গ্রহটি ও মানবসভ্যতা বাঁচাতে হলে এর যবনিকা টানতে হবে মানুষকেই।

যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছি ১৮ বছর ধরে। এই দেশের নাগরিকত্ব নেওয়ার সময় হাত তুলে, ঈশ্বরের নামে শপথ নিয়েছিলাম—এই দেশকে নিজের দেশ মনে করব। এই দেশের বিপদ-আপদে পাশে দাঁড়াব। এই দেশ আমাকে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান দিয়েছে; আমার সন্তানেরা বড় হয়ে উঠেছে এই দেশের জলহাওয়ায়। তাই এই দেশটা আমাদের দেশ!

গতকাল ভয়েস অব আমেরিকার ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘বাংলা স্ট্রিম’ এ কথা বলছিলাম মার্কিন নির্বাচন নিয়ে। রোকেয়া হায়দারের এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম, ‘আমরা যারা এই দেশটাকে এখন নিজের দেশ বলে মানি, তারা এমন একজন কমান্ডার ইন চিফ চাই, যিনি কালো, বাদামি, সাদা যে বর্ণেরই হোক সবার জীবনের নিরাপত্তা দেবেন। ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্যমূলক কথা বলে জনগণের মনে উসকানি দেবে না। অনবরত মিথ্যা কথা বলবে না এবং নারীদের প্রতি অসম্মান দেখাবে না।’

আমরা যে যেখানে, যেই দেশেই বসবাস করি না কেন, যেই দেশেরই নাগরিক হই না কেন, আমাদের উচিত এমন একজন নেতা বা শাসককে সমর্থন করা, যারা শুধু নিজের, দলের বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির পূজা করবেন না। যারা দেশ ও মানবতার স্বার্থে কাজ করবেন। ধর্ম, বর্ণ ও গোত্রের নামে বিভেদ বা বিভক্তি তৈরি বা উসকানিমূলক কাজ বা বক্তব্য রাখবেন না। আমরা যদি ব্যর্থ হই, ব্যর্থ হবে মানবতা। ব্যর্থ হবে রাষ্ট্র।

পৃথিবীজুড়ে নানা দেশে উগ্র ধর্মীয়বাদ, জাতীয়তাবাদ, একনায়কতন্ত্রের উত্থান আজ বিবেকবানদের, সচেতন মানুষদের সত্যিই ভাবিয়ে তুলেছে। উগ্র রাষ্ট্রনেতাদের জঙ্গি মনোভাবে দেশে দেশে তৈরি হচ্ছে একটি উগ্র, ধর্মান্ধ, বর্ণবিদ্বেষী জঙ্গি শ্রেণির। এই অশনিসংকেত রীতিমতো ভীতি ছড়াচ্ছে সাধারণ নিরীহ জনগোষ্ঠীর মনে।

পৃথিবীর আজ সত্যিই বড় দুঃসময়। এখনই সময় এদের রুখে দেওয়ার। দেশের সীমারেখা নিয়ে নয়, ভাবতে হবে সীমানা ছাড়িয়ে। আসুন সবাই মিলে পৃথিবী বাঁচাই। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ সুন্দর বাসস্থান রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার করি।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0