default-image

পৃথিবীর বাকি অংশের সঙ্গে সংগতি রেখে বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে নারীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দিবসও পালিত হয়। বিভিন্ন মঞ্চে বক্তারা নারীদের অধিকার, অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখেন। দেশ ও সমাজ গঠনে নারীর গুরুত্ব নিয়ে তাঁদের মূল্যবান কথা শোনা যায়। অনেকে আবার নারীদের বর্তমান অবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে মারাত্মকভাবে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান তুলে ধরে সমস্যা সমাধানে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন। অতি পরিচিত চিত্র এটা। এখানে আপত্তিকর কিছু নেই, বরং এটাই তো হওয়া উচিত। কিন্তু সমস্যা হল, এ দিন বিশেষেই সমস্যাগুলোর কথা আমাদের মনে পড়ে, দেশের নীতি পরিচালকদের মনে পড়ে, তথাকথিত সমাজপতিদের মনে পড়ে।

দিনটি চলে গেলে সমস্যা সেই একই জায়গায় থাকলেও তা নিয়ে চিন্তা করার মানুষ ও তাঁদের চিন্তা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগটা কোথায় যেন অদৃশ্য হয়ে যায়। বাস্তবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল কতই না ভেদ এই পৃথিবীর মানুষের মধ্যে। মানুষ এই ভেদ নিয়ে ব্যস্ত, এই প্রভেদ নিয়ে কোথাও দ্বন্দ্বরত, কোথাও মিলনমেলার আয়োজনে নিয়োজিত।

কিন্তু বাস্তবতা হল, এসব ভেদ–প্রভেদই কিন্তু মানবসৃষ্ট। প্রকৃতি এই ভেদ, বিভাজনের জন্ম দেয়নি। প্রকৃতি প্রাণী সৃষ্টি করেছে, সেই প্রাণীগুলো শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী পুরুষ বা নারী হয়েছে।

মানুষও যেমন প্রকৃতিসৃষ্ট একটি প্রাণী, স্বাভাবিকভাবেই মানুষ নারী ও পুরুষ এই দুই দলে বিভাজিত। শারীরিক বৈশিষ্ট্যের জন্য সভ্যতার শুরু থেকেই নারী-পুরুষের জীবনযাত্রায় কিছুটা হলেও পার্থক্য ছিল। বলা হয়, সভ্যতার শুরুর দিকে চাষবাস মেয়েরাই শুরু করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে শারীরিক সক্ষমতার কারণে সেখানে পুরুষেরা এগিয়ে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সামাজিক দিক থেকে এই প্রভেদ বাড়তে থাকে, মেয়েরা একসময় সেখানে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারত। পরবর্তীতে তাঁদের ঘরকুনো করা হতে থাকে। ধীরে ধীরে এই সীমাবদ্ধতা আরও বাড়তে থাকে।

সমাজ মোড়লদের সৌজন্যে মেয়েরা ক্রমশ সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে শুরু করে। তাঁদের পড়াশোনার অধিকার পর্যন্ত দেওয়া হতো না। শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটেছে এভাবেই। শুধু এ দেশে নয়, অবস্থা বিশ্বজুড়ে একই ছিল। পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষকে সুদীর্ঘকাল এ রকম অন্ধকার করেই রাখা হয়েছিল। আজ আমরা নিজেদের সভ্যতা নিয়ে গর্ব করি, অহংকার করে চাঁদে পৌঁছে যাই। অথচ রূঢ় বাস্তব হল এ দেশেও নারীদের সব রকম অধিকার থেকেই বঞ্চিত করে রাখা হতো। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত মেয়েদের স্বাধীনভাবে পড়তে দেওয়া হতো না, বরং তাদের পুরুষদের সম্পত্তি হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। সতীদাহ প্রথার মতো অমানবিক, চরম লজ্জাজনক রীতি বছরের পর বছর এই সমাজকে বহন করতে হয়েছে।

অনেকেই হয়তো বলবেন, এখন দেশে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়েছে। শিক্ষা বাড়ছে, মেয়েরা ছেলেদের থেকে বেশি পড়াশোনা করছে, সুযোগ-সুবিধা স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে, বিভিন্ন দপ্তরের শীর্ষপদে আজ মেয়েরা আসীন ও নিজেদের দক্ষতার ছাপ রেখে কাজ করে যাচ্ছেন। সমাজ তথা দেশকে এগিয়ে বর্তমান বিদেশ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ প্রায় অফিস-আদালতেই মেয়েরা কর্মরত আছেন উচ্চ পদে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পরিচিতিটা অনেকটা সমুদ্রে ভাসমান বরফের চাঙরের ওপরের অংশের মতো, নিচের বাস্তবতা দূর থেকে অনুধাবন করা যায় না। অপ্রিয় বাস্তব হল—দেশে, সমাজে এখনো নারী-পুরুষ বৈষম্য কমেনি। প্রতিটি স্তরে সে সবলে অবস্থান করছে। বলতে বাধা নেই, চকচকে করপোরেট অফিসের বাইরের পৃথিবীতে এখনো পুরুষের তুলনায় নারীরা প্রায় সবদিকে পিছিয়ে, নানাভাবে লাঞ্ছিত, শোষিত। এমনকি, সমান শ্রমের বিনিময়ে সমান পারিশ্রমিক পর্যন্ত তাঁদের জোটে না। চকচকে করপোরেট কার্যালয়কে এখানে বাদ রাখা হয়েছে। সেখানকার শোষণের রূপ যে সময় বিশেষে কতটুকু ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে সেটা হয়তো সাধারণ মানুষের কল্পনারও বাইরে। এটাই সত্য, নগ্ন বাস্তবতা।

আমরা নিজেদের অতীত নিয়ে গর্ব করি, সভ্যতম সমাজের কথা বুক ফুলিয়ে প্রচার করি। অথচ, এ সমাজ ব্যবস্থা কিনা অর্ধেক জনসংখ্যাকে ঘরের চার দেয়ালে যুগের পর যুগ আবদ্ধ করে রেখেছিল, এই কঠিন বাস্তবতা ভুলে যাই বা হয়তো বিস্মৃত হয়ে যাওয়ার ভান করি। এতে লাভের লাভ কিছুই হয় না, নিজেদের অক্ষমতা লুকানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টাই হয়। বাস্তবে আমরা এখনো সভ্য ও সংবেদনশীল সমাজ গড়ে তোলার প্রাথমিক শর্তই পূরণ করতে পারিনি।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেস ঠিকই বলেছেন, নারীর প্রতি ঘটতে থাকা হিংসা, বৈষম্য আসলে আমাদের সমাজেরই ‘কলঙ্ক’। সেই কলঙ্ক ঘোচাতে বহু রাষ্ট্রেরই তেমন বিশ্বাসযোগ্য তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় না। আর এ ব্যাপারে বাংলাদেশের অবস্থা বোধ হয় সবচেয়ে করুণ। তা না-হলে যুদ্ধ বিধ্বস্ত আফগানিস্তান, সিরিয়া, সোমালিয়া বা সৌদি আরব থেকেও মেয়েদের জন্য বাংলাদেশ ‘বিপজ্জনক’ দেশ বলে চিহ্নিত হবে কেন? ‘টমসন রয়টার্স ফাউন্ডেশন’–এর সমীক্ষায় তেমনটাই উঠে এসেছে। সমীক্ষাটি প্রথমে করা হয়েছিল ২০১১ সালে। তখন চতুর্থ স্থানে থাকা বাংলাদেশ নিজের রেকর্ড নিজেই ভেঙে ২০১৮ সালে সবাইকে পেছনে ফেলে শীর্ষে উঠে এসেছে।

অবশ্যই এই ‘সুনাম’ অর্জনে বাংলাদেশকে তেমন বেগ পেতে হয়নি। কারণ, সমীক্ষায় বলে দিচ্ছে, ২০০৭ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশে নারীদের প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। দেখা যাচ্ছে, প্রতি ঘণ্টায় অন্তত একটি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, তাও নথিভুক্ত ধর্ষণ বা নারীর ওপর সংগঠিত অত্যাচারের সিংহভাগ তো ঘরের চার কোণেই সীমাবদ্ধ থাকে। বলা বাহুল্য, ওই নথির বাইরে থেকে যাচ্ছে অসংখ্য সংগঠিত

অপরাধ। ভ্রূণহত্যা এখানে অত্যন্ত সুলভ। সরকার এর বিরুদ্ধে প্রচার যে করছে না তা নয়, কিন্তু সামাজিক চেতনা জাগরণ ভিন্ন সামাজিক রীতি পরিবর্তন সম্ভব নয়।

মনে হয়, এই পৃথিবীতে বুঝি এমন কোনো জায়গাই নেই, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ! কি ঘরের মধ্যে, রাস্তাঘাটে, কি স্কুল-কলেজে, কাজের জায়গায়, কি বাসে, ট্রেনে বা বিমানে।

এমনকি হাসপাতালেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। এখন এমন একটি সকালও তো আসে না, প্রভাতি সংবাদপত্রে একই দিনে পাতায় পাতায় পুড়িয়ে মারাসহ নানাভাবে মেয়েদের ওপর নির্যাতন এবং যৌন অত্যাচারের বিবিধ ঘটনা চোখে পড়ে না, যেখানে শিশু থেকে প্রবীণ কেউই বাদ যাচ্ছে না এবং যাতনার অধিকাংশ ঘটনাই হয় ঘরের ভেতরে, নিকটাত্মীয়দের দ্বারা, অতি ‘পরিচিত’, ‘বিশ্বস্ত’দের হাতে।

জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন মেয়ের একজন শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয় ঘরের ভেতর। যেমন, ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর প্রতিবেদনই বলছে, গত এক দশক সময়ের মধ্যে দেশে ঘণ্টায় ১৯টি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। দেখা গেছে, সে সব অপরাধের মধ্যে ২০ শতাংশই হল স্বামী ও তার স্বজনদের দ্বারা সংঘটিত। আর নথিভুক্ত ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৮৮ শতাংশ। অথচ, গত এক দশকে নারীদের প্রতি অপরাধের সাজা হয়েছে সব থেকে কম। এই একটি ব্যাপারে কোনো পরিবর্তনই যেন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। যেন যুগের পর যুগ ধরে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের জিনবাহিত এই হিংসা প্রবণতা পরিবারে, সমাজে বিরাজ করে চলেছে। সামাজিক সচেতনতার অভাবে আজ এই অত্যাচার আমাদের মধ্যে প্রায় মান্যতাপ্রাপ্ত। আসলে জন্ম–মূহুর্ত থেকেই মেয়েদের যেন এক অদৃশ্য যুদ্ধের দিকে ক্রমাগত ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। যখন সে নিতান্ত শৈশবে সে ‘হিংসা’, নিরাপত্তা শব্দগুলোর সঙ্গে কোনোভাবেই পরিচিত নয়, তখনই সেই যুদ্ধে ভয়ংকর নৃশংসতায় আমাদেরই অসহায় শিশু কন্যারা প্রতিদিন বলি হচ্ছে।

অসহায় যে আমরাও। কেউ প্রতিবাদ করি না। পারিবারিক সম্মান, বংশের সুনাম কত কিছুই না তখন সামনে আসে এসব অপরাধ ঢাকতে। কিন্তু একবারের জন্যও সেই মানুষটির ব্যাপারে ভাবা যায় না। সে থেকে যায় অবহেলিত, অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত। কেন সেই মেয়েটি প্রতিবাদী হয় না, প্রশ্ন উঠতেই পারে। প্রশ্নটা সোজা ও স্বাভাবিক। উত্তর কিন্তু ততটুকুই জটিল এবং মেয়েটির তখনকার পরিস্থিতি হয়ে উঠে মারাত্মক, দুষ্কর, দুঃসহ। কোনো জনসচেতনতা, কোনো প্রচারণা কর্মসূচি যেন তাকে স্পর্শ করে না।

পরিবার, প্রতিবেশী, সমাজের চিন্তা ছাড়া তখন দেশের আইনও তার পায়ের শৃঙ্খল হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে আইনের প্রয়োগে সরকারের ব্যর্থতা প্রায় আকাশচুম্বী। কারণ, দোষী সাব্যস্ত করতে পারলে তবে তো সাজা। সেই পথে সে পাহাড়প্রমাণ বাধা।

একই সমস্যা সর্বত্র। তৃতীয় বিশ্বের দেশ মাত্রই এ অবস্থা, তা সে আফ্রিকার হোক আর এশিয়ার হোক। চাইলেও আমরা তাদের রক্ষা করতে পারছি না। আমরা বেশির ভাগই মনে করি, ওই ঝোপে-জঙ্গলে পড়ে থাকা ধর্ষিত, ক্ষতবিক্ষত, নিহত শিশুকন্যাটি আমার কেউ না। কারণ আমরা মনে করি, আগুনে বা অ্যাসিডে পুড়ে যাওয়া মেয়ে বা বউটি আমার ঘরের কেউ নয়। আমরা মনে করি, এটা আমাদের দায় নয়, রাষ্ট্রের দায়। আমরা আসলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এক সংবেদনহীন সমাজের নাগরিক, তা না-হলে বিভিন্ন স্তরের অন্তত ৫ কোটি ১০ লাখ নারী মনে করত না, গার্হস্থ্য হিংসা কোনো অপরাধই নয়। তা না-হলে আমাদের জানতে হতো না, গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে লাখ লাখ কন্যাভ্রূণ হারিয়ে যাচ্ছে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ৬ কোটি নাবালিকাকেও বসতে হতো না বিয়ের পিঁড়িতে। বিভিন্ন দেশের সীমান্ত দিয়ে বছরে যে লাখ লাখ মানবপাচার হচ্ছে, তার মধ্যে ৮০ শতাংশই হতো না নারী ও বালিকা।

এসব তথ্য, পরিসংখ্যানে মন ভারাক্রান্ত হয়ে উঠে। কিন্তু বাস্তববিমুখ হয়ে থাকাটা তো আর মেনে নেওয়া যায় না। বাস্তব বিমুখতার জন্য আমরা অতীতে ও বর্তমানে কি কম ক্ষতি, অবক্ষয় সহ্য করেছি? এ অব্যবস্থা আর চলতে পারে না। পরিবর্তন চাই, পরিবর্তন চাই আমাদের নিজেদের মন, মনোবৃত্তি, মানসিকতার। আর রাষ্ট্র? তাতে থাকা ক্ষমতাসীনরা তো মনে করে, এটা তত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই নয়। কারণ আর যাই হোক, মেয়েদের প্রতি ক্রমবর্ধমান হিংসা, অত্যাচার তাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারবে না। এ চিন্তাই বোধ হয় অপরাধ ঘটলেও কেন অপরাধীরা সাজা পায় না, তা নিয়ে ক্ষমতাসীনদের ভ্রুক্ষেপহীন অসীম উদাসীনতা। কিন্তু এ রকম চলতে পারে না।

পৃথিবীর রূপ, এদের বাসিন্দাদের মানসিকতা পরিবর্তন হয়েছে, রাষ্ট্রব্যবস্থার এ পরিবর্তনের দাবি মেনে নিয়ে আপন নীতির পরিবর্তন করা প্রয়োজন। তা না-হলে ভবিষ্যতে কিন্তু সমূহ বিপদ অপেক্ষা করছে।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন