default-image

আজ প্রায় নয় মাস হয়ে গেল, পৃথিবী একটা কঠিন সমস্যার সম্মুখীন। এই শুনি এ দেশ ভালো তো আবার শুনি অন্য দেশ আক্রান্ত। খারাপ ভালোর এই ফ্রিকোয়েন্সিটাই আমাদের আনন্দিত করছে আবার বেদনাও জানাচ্ছে। সামাজিক মাধ্যমে নিজের দেশের খবরটা জানা হয়। নিজের প্রিয়জন ছাড়াও যে কিছু একটা আমাদের নাড়া দেয়, সেটাই বোধ করি দেশ প্রেম। দেশের কিছু হলে আমাদের হৃদয় জ্বলে। কলিজা পুড়ে। এ জন্যই রবি ঠাকুর লিখেছেন–

‘তোর বদন খানি মলিন হলে, আমি নয়ন জলে ভাসি... সোনার বাংলা’

নতুবা কেন মন পুড়বে? বিশ্বের উন্নত দেশে আরাম, আয়েশ নিরাপত্তা—সব নিয়ে তো আমরা প্রবাসীরা ভালো আছি। তবু প্রাণ জ্বলে, ব্যথা লাগে। নিজের শহর হোক আর চাকমা গারো, যেই হোক সে সব মেয়ের মানহানি হলে আমারও হয়। মেয়েরা ফুলের মতো। ফুলের পাপড়িতে নখের আঁচড় লাগলে যেমন দাগ পড়ে, তেমনি মেয়েদের মনে আঁচড় লাগলেই রক্ত ঝরে। অনেক রক্ত দেখা যায় না। আমরা নিজের মাঝে ভাঙাচোরার যে চর গড়ি, তা কেউ জানে না। মনে হয়, আলাদিনের জাদুর চেরাগটা যদি থাকত, আমি সবাইকে ভালো করে দিতাম। কিছুই করা হয় না। পৃথিবীর খবর আমাদের যতটা না বিচলিত করে, নিজের দেশের সামান্য খবর অনেক বেশি বিচলিত করে।

দেশের কোথাও সমস্যা হলে কোথায় মানুষ এক হবে, কিন্তু না। সবার আগে এরা বিভক্ত হয় রাজনৈতিক দলে। সরকার পার্টি বা বিরোধী দল। নতুবা তুমি হিন্দু আমি মুসলমান! আমরা মানুষ, মানবতা আমাদের বড় ধর্ম।

বিজ্ঞাপন

এই মহামারি কারও কাছে জীবনমরণ সমস্যা, তো কারও কাছে কিছু না। মেজো আপা বললেন, আমার সেজো দুলাভাই বলেছেন, কুমিল্লায় তাঁদের গ্রামে কেউ এসব বিশ্বাস করছে না। কেউ–ই মাস্ক পরে না। আল্লাহ ভরসা। সৃষ্টিকর্তার ওপর এই যে ভরসা, এটিও কিন্তু একটা ইতিবাচক ভাবনা। যা আমাদের বাঁচতে সাহায্য করে। বলা যায়, অশিক্ষিত মানুষের এই অবুঝ পজিটিভিটির মূল্য অনেক বেশি। তা অবশ্যই একটা নীতির ব্যাখ্যায় মানুষকে রক্ষা করছে। ডাক্তারের আওতায় থেকেও তো অনেকে মারা যাচ্ছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেকের কাছে সিস্টেম উন্নত তো, চিন্তা–ভাবনা বেশ নিম্নস্তরের। সুবিধা পেলেও জীবন রক্ষা হচ্ছে না। তারপর তো সোজা আঙুল আমাদের স্রষ্টার প্রতি। অথচ তিনি মানব জাতিকে কর্তৃত্বের সব যোগ্যতাই দিয়ে রেখেছেন। সেটা হচ্ছে জ্ঞান। সেটাই তো আমরা নিচ্ছি না। আমরা যা নিচ্ছি, তা হচ্ছে অন্ধত্ব।

মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটির অভাব, তা হলো জ্ঞান। জ্ঞান নেই বলেই মানুষ বড় অবুঝ, এক রোখা, অসভ্য। আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হলেও সরলতায় ভরা। কিন্তু আমরা চাই, সবাই আমার জ্ঞান অনুসারে চলুক। আমি যেভাবে ভাবছি, তারাও সেভাবে ভাবুক। অনেক নেতিবাচক বিষয়ে মাথা নষ্ট হয় অথচ জ্ঞান খাটালেই মানুষকে ক্ষমা করা যায়।

মনোবিজ্ঞান, স্পিরিচুয়াল ভাবনার মোটিভেশন আমাদের শেখায় আস্থা। নিজের ওপর আস্থা রাখার ক্ষমতা মানুষ যখন হারিয়ে ফেলে, তখনই আর কিছু ভাবতে পারে না। মানুষের আবেগই আত্মহনন করে। তাদের দুঃখ সইতে না পারার ক্ষমতা আমাকে ভাবিয়ে তোলে। অনেককেই দেখলাম, স্ট্যাটাস লিখে পোস্ট করতে করতে জীবন থেকে বিদায় নেয়। মানবিক হওয়াটা জরুরি। জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষ মানুষকে পথ দেখাবে। তাই, যখনই কোনো ছেলে–মেয়ে, নারী-পুরুষকে দেখি তাঁদের জীবনের বিষাদ বর্ণনা করছে, আমি স্বেচ্ছায় কথা বলে তাঁদের মনকে বিশুদ্ধ করার পরামর্শ দিই। ব্যথার সমুদ্রে নারী যেমন ভাসে, তেমনি পুরুষও। উদাহরণ স্বরূপ, একজন পুরুষ নিচের মেসেজটা পাঠালেন—

বিজ্ঞাপন

‘আমার জীবনের অনেক কষ্ট, আমি কাউকে শেয়ার করতে পারছি না। এই অবস্থায় আমি কি করতে পারি?’

–‘একটি মেয়ের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হয় আমার। কাবিনের কথা আসলে মেয়ে বলে, আমাকে দুই বছর সময় দাও। গত জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়েছে। সে আরও টাকা চায়। দিলে ভালো ব্যবহার, না দিলে দুর্ব্যবহার। আমার বাবা অসুস্থ ছিল, পরে মারা গেছে, সে দেখতে আসেনি। এখন মা অসুস্থ দুই মাস, কোনো দিন ফোন দিয়ে খোঁজও নেয়নি।’

মেয়েদের কথা কী বলব? প্রতি ১০ জনের ৭ জনই বিয়ের পর সমস্যায় জীবনযাপন করছেন। একটা মেয়ের বর্ণনা শুনে শুধু বলেছিলাম, এটিতো ‘রেপ’! হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছে। আমরা পথে কারা ধর্ষণের শিকার হলো, তা নিয়ে ভাবছি। মেয়েরা শ্বশুর বাড়ি নির্যাতিত হয়, কিন্তু ফেরত আসতে পারে না। সমাজ কী মুখ দেখাবে?

পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কথা না ভেবে নিজে বদলে যান। নিজে বদলে যাওয়াই সহজ ও সমাধানযোগ্য। কয়েক দিন আগে গানের এক অনুষ্ঠানে দেখলাম, ভারতের জয়পুরে এক ভদ্রলোক ছোট বেলা থেকে মেয়েদের চুল ছোট করে প্যান্ট–শার্ট পরিয়ে বড় করেছেন। যাতে তাদের কেউ মেয়ে বলে কোনো অপমান না করে।

গত বছর খুব কাছের এক মেয়ে বিয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রে এসে ভেসে বেড়াচ্ছে। ফেরত নেওয়ার কথা বললে, তাঁর বাবা না করে দিলেন। এই মেয়েটাও একই সমস্যায় ভুগছে। তাঁর ফেরত যাওয়ার জায়গা নেই। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এখনো গবেষণা করেন, যুদ্ধ বিধ্বস্ত বীরাঙ্গনারা বাড়ি ফিরতে পারেনি। সমাজে ঠাঁই পায়নি। অথচ প্রতিদিন কোনো না কোনো বীরাঙ্গনার জন্ম এ সমাজ দিচ্ছে। বাবার বাড়ি ফেরত এলে প্রতিবেশী ভাবিরা বলেন না, ঠিক আছে, ওকে আমরা দেখব। উল্টো প্রশ্ন কেন? মেয়ের সমস্যা আছে? কত রকম ভাবনার লেভেল তাঁরা জুড়ে দেন।

নারীদের জন্য কয়টা শেল্টার হোম আছে কিনা, জানি না। অথচ এখানকার প্রবাসী শতকরা ৯৯ জনের নিজের বাড়ি শূন্য পড়ে আছে দেশে। অন্য জেলার কথা না জানলেও সিলেটের কথা বলতে পারি, যেখানে অসংখ্য আধুনিক দালান গ্রামে, শহরে পড়ে আছে। কোনো জনমানব নেই। অথচ যদি কেউ একটা শেল্টার হোম বানাতো যদি, যাঁর যাওয়ার জায়গা নেই, সে এখানে থাকবে! মানবতা তো আমরাই ঘুম পাড়িয়ে শো কেসে রেখেছি।

বিজ্ঞাপন

আমরা বাইরের সমস্যা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু ভেতরে যে কত সমস্যা, সেগুলো তত দিন সমাধান হবে না, যত দিন প্রতিটি মানুষের আত্মা জ্ঞান আর মানবতায় পূর্ণ না হয়। একজন পুরুষ একজন নারীকে মানবিক মনোভাব নিয়ে দেখবে না। এ জন্য দরকার শিক্ষা, জ্ঞান। কিন্তু প্রযুক্তি বাড়লেও আসল জ্ঞান কম।

আমাদের কিছু সমাধান খুঁজতে হবে। ছেলেরাই কেন নারী শরীরের প্রতি আসক্ত? পর্দা প্রথার নামে নারীর দেহকে লোভনীয় বস্তু হিসেবে কে উপস্থাপন করেছে?

মা–বোনদের নজরে সবার আগে আসে, সে ঘরের ছেলে বা পুরুষটি কী রকম? সমাধান মা–বোনই তৈরি করতে পারে। আজ থেকে বহু বছর আগে হাসন রাজার মা যদি ছেলে পথে আনার জন্য নর্তকীর বেশে বজরা নৌকায় বসে ছেলেকে পথে আনতে পারেন। আমরা কেন পারব না? এসব ছেলের একবার শিক্ষা দেওয়ার জন্য মা–বোনেরা পদক্ষেপ নেন। দেখবেন এ সমাজ ঠিক হয়ে গেছে। তাঁদেরকে খোলা অধিকার দেন নারীদেহ দেখার। তারপর বিবস্ত্র নারী দেখলেও চোখ তুলে তাকাবে না।

আর মনে রাখার জন্য মন্ত্রের মতো জপ করান, ‘আমি নারীদের সম্মান করি। কোনো নারী দেখে মনে কোন পাপ চিন্তা আনব না। নারী-পুরুষ সব আত্মা পবিত্র।’ সমাজ, দেশ আপনা–আপনি বদলে যাবে।

যেখানে সমাজের অসুস্থ অংশ, তাঁদের চিকিৎসা প্রয়োজন। যে অসুস্থ তাঁকে শাস্তি না, মহাশাস্তি দিলেও কাজ হয় না। ছোট বাচ্চাদের প্রতি যখন মা–বাবা এমন কঠিন ব্যবহার করেন, তাঁরাই এক সময় বড় ধরনের হিংস্র, নৃশংস হয়ে ওঠে। আপনারা চোখ বন্ধ করে নিজের পরিবারের মানুষকে পর্যবেক্ষণ করলে এ উত্তর পাবেন। সন্তানদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। শাসনের নামে মা-বাবাই মারধর শেখান। যে সন্তান ঘরে মাকে ধর্ষণের শিকার হওয়ার দৃশ্য দেখে, বড় হয় সে বাইরের মেয়েদের এমন অবস্থায় দেখতে পছন্দ করবে।

বিজ্ঞাপন

পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার কথা না ভেবে নিজে বদলে যান। নিজে বদলে যাওয়াই সহজ ও সমাধানযোগ্য। কয়েক দিন আগে গানের এক অনুষ্ঠানে দেখলাম, ভারতের জয়পুরে এক ভদ্রলোক ছোট বেলা থেকে মেয়েদের চুল ছোট করে প্যান্ট–শার্ট পরিয়ে বড় করেছেন। যাতে তাদের কেউ মেয়ে বলে কোনো অপমান না করে। কল্পনা করুন, এ পৃথিবীর সব মানুষের দেহ–পোশাক এক রকম!

আমি চোখ বন্ধ করে নিজের ছোট বেলা ভাবলাম। একজন মেয়ে হিসেবে পথে–ঘাটে কত কথা শুনেছি। দেশে অনেক মহাপুরুষকেও দেখতাম, আমাকে সবার আগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিতেন।

আমি শুধু লেখায় নয়, মন থেকে পবিত্রতা ছড়াই, যেন মানুষগুলো ভালো থাকে। এই পৃথিবীতে চলছে এনার্জি বা শক্তির খেলা। যার একটা পজিটিভ এনার্জি, আরেকটি নেগেটিভ এনার্জি। আমরা নাম দিয়েছি বেহেশত–দোজখ, স্বর্গ–নরক, সুখ–দুঃখ। সবকিছুই চলছে এ হিসেবে। জীবন যখন নেতিবাচক, তখন তা যন্ত্রণার। নেতিবাচক তখনই হয়, যখন সবাই আমার অনুসারে ‘না’। এখন সবাইকে নিজের অনুসারে ‘না’ চালিয়ে একবার দেখি না, আমি সবার অনুসারে চলে বা মেনে নিয়ে। বুঝতে পারলে, মানতে পারলে সহজ হতে যেতো অনেক কিছু। কিন্তু মনই তো মানে না। আমরা লেভেল করে দিয়েছি, জীবন মানে যন্ত্রণা নয়, জীবন সুন্দর।

মন্তব্য পড়ুন 0