বিত্ত সুখ আর চিত্ত সুখ। কোনটা আসল সুখ, কারও কাছে বিত্ত কামনা প্রবল, বেশির ভাগ মানুষের কাছে দুটোই কাম্য। বিত্ত হলে চিত্তে সুখ আসে, আসলে চিত্ত সুখ বলে আলাদা কিছু নেই—এ রকম ধারণা অনেকের। বাউল আঙ্গিক গানের মতো কথাগুলো বাউল ঘরানার হয়ে গেল। বিত্ত আর চিত্ত অনেকটা মনোবিজ্ঞানের মন এবং দেহের সম্পর্কের মতো। মন ভালো থাকলে দেহ ভালো থাকে, আর দেহ ভালো থাকলে মন। এ কথাটির উপসংহারে আসলে মনোবিজ্ঞানীরা পৌঁছাতে পারেননি। কারণ, মন ভালো থাকলে দেহ সব সময় ভালো থাকে না। আবার দেহ ভালো থাকলে মন ভালো থাকবে এর নিশ্চয়তা নেই। বিত্ত সুখ থাকলে কী মানুষ চাঁদনি রাতে আসর বসিয়ে ‘আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে, বসন্তের এই মাতাল সমীরণে’ কিংবা ‘মনে করে সখী বাঁধিয়া রাখিয়ো, আমার হাতের-রাখী, তোমার কনক কঙ্কণে’—এমন সংগীতে হৃদয় মনকে ডুবিয়ে দিতে পারে। পারে, তবে চিত্তে সুখ না থাকলে, ডুব দেওয়া যায় না পুরোপুরি।

মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে রবি ঠাকুর নিজের জীবনের ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষে যে অভিভাষণ রচনা করেন, তার নাম দিয়েছিলেন ‘সভ্যতার সংকট’। সভ্যতার সংকটে রবীন্দ্রনাথ আসলে বিত্ত, চিত্ত, শোষণ, শাসন, খোলস, কোরক নিয়ে অনেক কথা বলে গেছেন। অনেক কথা পাওয়া যায় ‘সভ্যতার সংকটে’, যা তিনি ইঙ্গিতে বলে গেছেন। অনেকটা তার গানের কথার মতো, ‘অনেক কথা যাও যে বলে কোনো কথা না বলে’। সভ্যতার সংকটে তাঁর ভাষায় ‘জীবনের প্রথম আরম্ভে’ ইউরোপের মানুষের ঐশ্বর্য ও ঔদার্যের প্রতি তার যে সমীহ ছিল, সেই সমীহ ভাঙার কথা আছে। সমীহ ভাঙা অনেকটা স্বপ্ন ভাঙার মতো।

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথের ব্যাপক ভরসা ছিল ইংরেজের ‘ঔদার্যে’। তিনি আস্থা পোষণ করেছিলেন। পরবর্তীকালের অভিজ্ঞতায় তিনি দেখতে পান, ইংরেজ শাসনাধীন ভারতীয়দের জন্য তার প্রয়োগ নেই। ‘সভ্য নামধারী মানব-আদর্শের এত বড় নিষ্ঠুর বিকৃত রূপ কল্পনা করতেই’ পারেননি। তাঁর মানে কি? ইংরেজদের সভ্যতা, ভব্যতা সব কিছুই ছিল শোষণের কৌশল। চিত্ত তাঁদের ঔদার্যে পরিপূর্ণ ছিল না, বিত্ত লাভ করে চিত্তের পরিতৃপ্তি অর্জন করতে চেয়েছিল, ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসকেরা। এর ফলে জাতি হিসেবে তাঁদের বিশালত্বের পরিচয় ঘটেনি। আবার ভারত বর্ষের মানুষের কাছেও তাঁদের সভ্যতার আভিজাত্য ধরে রাখতে পারেনি।

গ্রিক মিথ, গ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতির নেপথ্যে আমরা দেখতে পাই ‘ট্র্যাজিক চেতনা’। আবার বাংলার আদি সাহিত্য সংস্কৃতির অন্ত মূলে আমরা দেখতে পাই ‘মায়া’। সেই মায়ার জাদু সাহিত্যকে প্রভাবিত করে। কিসের প্রতি এত মায়া? মানুষের প্রতি মায়া, পার হয়ে আসা ঢেউয়ের প্রতি মায়া, প্রকৃতির প্রতি মায়া—এমন হাজারো মায়ার টানে ভোগা মানুষ জানে, মায়ার বন্ধন কত শক্তিশালী। মৃত্যু ছাড়া তার বন্ধন নাকি ছেঁড়া যায় না। শুধু কী মায়া? মায়া ছাড়াও বাংলার মানুষ ও কবিদের অন্তর পরিপূর্ণ আছে প্রেমের টানে। প্রেমও তো মায়ার আরেক রূপ। বৈষ্ণব সাহিত্য টইটুম্বুর রাধা–কৃষ্ণের প্রেমে। রাধা–কৃষ্ণের প্রেম কখনো বা মনে হয় মানব–মানবীর প্রেম, আবার কখনোবা মনে হয় অদৃশ্য ঈশ্বরের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসার টান। বড় নিষ্কাম প্রেম। এই প্রেমে শুধু ‘কালার’ বা ‘কানাইয়ের’ প্রতি রাধার অপার টান আমরা অনুভব করি। এই যে টান, মায়া—সবকিছু জাগতিক বিত্ত, বিলাস, ক্ষমতা, কূটকৌশল, আধিপত্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে। এ রকম প্রেমে মলিনতার কোনো স্থান নেই। এ প্রেম পরিপূর্ণ অপার ভালোবাসায়। এ ভালোবাসা আসে নদী বা হাওরের প্রবল জলরাশির স্রোত থেকে, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ থেকে, বাংলার শরতের আকাশ থেকে, বসন্তের বাতাস থেকে, অপরূপ প্রকৃতি থেকে, যে প্রকৃতির সর্বাঙ্গ প্রেমে আপ্লুত।

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর তিন মাস আগে যে ভাবনা ভেবেছিলেন, যে ভাবনার কথা তিনি ‘সভ্যতার সংকটে’ বলে গেছেন, সে ভাবনায় আমাদের আস্থা আছে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মানুষের শক্তির প্রতি আস্থা রেখে বলেন,‘আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি—পেছনের ঘাটে কী দেখে এলাম, কী রেখে এলাম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।’ আমাদেরও সে বিশ্বাস রক্ষা করতে হবে, না হলে আমাদের ভবিতব্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে করার কিছুই থাকবে না।

এই অনিন্দ্য সুন্দর প্রেম মানুষকে ধর্মান্ধ করে না, উদার মানবতার শিক্ষা দেয়। জাত, পাত, বর্ণ, ধর্মের ঊর্ধ্বে সে প্রেম। এই প্রেম জাতের রূপ দেখে না, দেখে মানুষের রূপ। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির মর্ম কথা আছে যার রচনায়, সেই লালন তাই বলে, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে।’ এই হলো চিরায়ত বাংলার মানুষের মাটি থেকে উঠে আসা বাণী। এ রকম বাণী অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতাকে ত্যাগ করে ভালোবাসাকে মাথার মুকুট করে তুলে নেয়। ধর্মান্ধতা এই প্রেমকে সহ্য করতে পারে না। তাই, ধর্মান্ধতা এই চিরায়ত প্রেমকে দমন করতে চায়। এই যে নিষ্কলুষ প্রেম, নিষ্কাম প্রেম, অপার্থিব প্রেম, এ হলো বাংলার মাটি ও মানুষের অন্তমুলের স্বতঃস্ফূর্ত ভাব।

এই ভাবের শক্তিতে, এই ভালোবাসার সুদৃঢ় প্রত্যয়ে এ দেশের মানুষ স্বাধীনতার সূর্যকে হাতের মুঠোয় ভরতে পেরেছিলেন। যে স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল হৃদয়ে, সে স্বাধীনতাকে স্পর্শ করতে প্রচুর মূল্য দিতে হয়েছিল সাধারণ মানুষকে। রাজনৈতিক নেতাদের ছিল দৃঢ় প্রত্যয়, অঙ্গীকার ছিল প্রশ্নাতীত। মানুষের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা হবে অবাধ, আর স্বাধীন দেশের সম্পদ হবে সবার। ভাগ করে ভোগ করার অঙ্গীকার ছিল স্বাধীনতার শপথে। বৈষম্য থেকে স্বাধীনতার চেতনা জেগে উঠেছিল। কথা ছিল, স্বাধীন দেশে মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না।

বৈষম্যের ব্যাপ্তি ক্রমাগত বড় হচ্ছে। আর সাধারণ মানুষের স্বাধীনতাকে আমরা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে দেখছি। ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মুক্তি পেয়েছে মানুষ, কিন্তু স্বাধীনতার পর আর একদল শোষক নতুন রূপে ঔপনিবেশিক আমলের পরিবারগুলোর মতো শোষণ অব্যাহত রাখছে। স্বাধীনতার সুযোগে শোষক পরিবারের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনীতির নামাবলি পরে তারা স্বাধীন দেশে আবির্ভূত হয়েছে নানা দলের ছায়ায়, নানা মতের সাইনবোর্ড মাথায় নিয়ে। আর পুঁজি হাতে আসার সঙ্গে সঙ্গে আধিপত্যকে জোরদার করার ইচ্ছা হয়ে উঠেছে অদম্য। পরাধীন দেশে আমরা আধিপত্যকে ভিন্ন প্রকৃতিতে দেখেছি। পরাধীনকালে আধিপত্য ছিল আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রের কিংবা রাষ্ট্রগুলোর। স্বাধীন দেশের আধিপত্য হলো, ক্ষমতাবান মানুষের আধিপত্য, যে আধিপত্য দৈত্যের মতো পরাক্রমশালী।

বিজ্ঞাপন

এই আধিপত্যকে রোখা কঠিন কাজ। আধিপত্য সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে বলাও কঠিন। এই যে বলা হয়েছে স্বাধীনতার সংকোচন, আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে তাঁরা ধীরে ধীরে তাই করছেন। কারণ আধিপত্য যারা সমাজে বাড়াতে চায়, তারা ব্রিটিশ প্রভুদের তৈরি ‘রাজা’র মতো। দিল্লি থেকে বিশাল ভারত শাসন করা কঠিন কাজ ছিল। তাই তাঁরা ভারতবর্ষে তাঁদের তাঁবেদার রাজা, জমিদার তৈরি করেছিল। একমাত্র উদ্দেশ্য, চাহিদা মতো কর সংগ্রহ করা। আমাদের নব্য রাজাদের কেউ দায়িত্ব দেয়নি, তাঁরা নিজেরাই সারা দেশে দায়িত্ব ভাগ করে নিয়েছেন। তাঁদের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ালে টর্চার সেলে যেতে হয়। তাদের রাজত্বে নিজেদের পেশিশক্তি প্রয়োগকারী বাহিনী আছে। তাদের নিজস্ব টর্চার সেল আছে। আছে ওয়াকিটকি বেজ স্টেশন। তাঁরা এতই প্রভাবশালী, কখনো কখনো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ভূমিও তাদের দখলে নিতে পরোয়া করে না। ক্ষমতার দম্ভে তাঁরা বেপরোয়া। তাঁদের নিজস্ব দেহরক্ষী আছে। বিদেশ থেকে নিয়ে আসা অস্ত্র আছে। নিজেদের অফিস ও বাসা এতই সুরক্ষিত যে, অফিস ও বাসাকে তাঁরা দুর্গের মতো তৈরি করেছেন। মানুষ তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে। তাঁরা মন্ত্রীদের মতো নিজেদের এলাকায় সাইরেন বাজিয়ে চলেন। ক্ষমতাকে সীমাহীন ও দুর্দমনীয় করতে তারা নিজেদের সব রকমে সুরক্ষিত করেছেন। স্বাধীন দেশে লাগামহীন আধিপত্য বিস্তার ও সীমাহীন সম্পদ সৃষ্টি করে ভোগ করতে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই।

মানুষের ঔদার্য, মানুষের নীরবতা তাদের বল্গাহীন করে তুলেছে। তারা যেমন মানুষের স্বাধীনতা সংকোচন করেছে, একই সঙ্গে বিভাজনও তৈরি করেছে। এই সুযোগে তাঁরা মানবাধিকার কিংবা স্বাধীনতার টুটি চেপে ধরেছে। আমরা বিশ্বাস করি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, হাসন, রাধারমণের বাংলা এরকম ঘুমিয়ে থাকবে না। বঙ্গবন্ধু, ভাসানি বাংলা ও বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে এগিয়ে গেছেন। নব্য রাজাদের রাজত্বকালও শেষ হবে বলে আমরা আশা করি। ইতিমধ্যে দু–একজন রাজাকে অন্তরীণ করা শুরু হয়েছে। রাজারা এবার তাদের ক্ষমতাকে সংকুচিত করতে বাধ্য হবেন। তাদের ক্ষমতাকে সংকুচিত করে মানুষের স্বাধীনতার ব্যাপ্তিকে বাড়াতে হবে। কারণ, সাধারণ নাগরিক, সাধারণ মানুষের অগ্রাধিকার দিতে যেন আমরা ভুল না করি।

রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুর তিন মাস আগে যে ভাবনা ভেবেছিলেন, যে ভাবনার কথা তিনি ‘সভ্যতার সংকটে’ বলে গেছেন, সে ভাবনায় আমাদের আস্থা আছে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মানুষের শক্তির প্রতি আস্থা রেখে বলেন,‘আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি—পেছনের ঘাটে কী দেখে এলাম, কী রেখে এলাম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরিকীর্ণ ভগ্নস্তূপ! কিন্তু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব।’ আমাদেরও সে বিশ্বাস রক্ষা করতে হবে, না হলে আমাদের ভবিতব্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়লে করার কিছুই থাকবে না।

মন্তব্য পড়ুন 0