বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ডিভি পাওয়ার পর থেকে আমিনের বাড়ির হাওয়াও বদলে গেল। ছেলে-মেয়েরা পানি খাওয়া বাদ দিয়ে কোক খাওয়া শুরু করল। কোন দুলাভাইয়ের মামার শ্যালিকার ভাশুরের মেয়ের ননদ থাকে যুক্তরাষ্ট্রে, তিনি আমিনের বউকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে টেলিফোনে তালিম দেওয়া শুরু করলেন। বাড়িতে হুলুস্থুল অবস্থা। আমিন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বিদায়ী সাক্ষাৎ শুরু করল।

আমিনের স্বল্পভাষী বাবা একদিন বললেন, ‘আমার কথা তো শুনবা না, তুমি তো যাবাই। তবে আমার একটা কথা শোনো, বউ-বাচ্চাদের এখন নিয়ো না। নিজে গিয়ে আগে দেখ, তারপর বুঝে শুনে ওদের নিয়ো।’

আমিনও ভয় পেয়ে একাই গেল। বউ-বাচ্চারা মন খারাপ করল। যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রথম কয়েক দিন বেশ ফুরফুরে লাগল আমিনের। আস্তে আস্তে ডাউন লেভেলে চলে আসল। প্রথম সমস্যা ভাষা। এদের ইংরেজি আমিন বোঝে না, আমিনের বাংরেজি ওরা বোঝে না।

এই ভাষার সমস্যা নিয়ে কত যে গল্প আছে! বাংলা সাহিত্যের একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক একবার শীতে যুক্তরাষ্ট্র এসে একটা মাফলারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। মাফলার কিনতে একাই বেরোলেন। বহু কসরত করে বিক্রেতাদের মাফলার বিষয়টি বোঝালেন। এক দোকানদার দেখিয়ে দিলেন ওই দোকানে পাওয়া যায়। পরে সাহিত্যিক গিয়ে দেখেন ওই দোকানটি গাড়ির পার্টসের দোকান। একটু বিস্মিত হলেন। এখানে কেমন করে মাফলার পাওয়া যাবে। ভাবলেন কী জানি বিলেত যুক্তরাষ্ট্র বলে কথা, হয়তো এসব দেশে গাড়ির পার্টসের দোকানেই পাওয়া যায় মাফলার। দেশে দেখেছেন বাস-ট্রাক চালকেরা মাফলার ব্যবহার করে। এখানে হয়তো চালকেরা গাড়ির পার্টসের দোকান থেকেই মাফলার কেনে। আবার বিস্তর কষ্ট করে বোঝাতে হলো তাঁর চাহিদা। ওরা আবিষ্কার করল একটা গাড়ির সাইলেন্সার। সাহিত্যিক অবাক। যত বলেন তিনি মাফলার চান। দোকানি তত বলে এটি মাফলার। বলে, তোমার গাড়ির মডেল বলো, বিলকুল সেই মডেলের দেব। এটা টয়োটা গাড়ির। লেখক হাউমাউ করে বাংলা-ইংরেজি-হিন্দির মিশেল দিয়ে বলেন তাঁর কোনো গাড়ি নেই। দোকানির তখন বাক্যহারা হয়ে যাওয়া অবস্থা। শেষে দোকানে আসা একজন ভারতীয় ক্রেতার সহায়তায় তিনি বোঝাতে সক্ষম হলেন মাফলার অর্থাৎ উলের বা পশমের গলাবেস্টনি চাইছেন। চার দেশের কর্মচারী ছিল ওই দোকানে, তাই চার কিসিমের হাসির তুফান ছুটল।

আমিনের অবস্থাও এমন হয়েছে। একবার মুদি দোকানে গিয়ে বলল, প্লিজ গিভ মি অ্যা কোক। দোকানি অল্প বয়সী, কলেজে পড়ে, বোধ হয় পার্ট টাইম কাজ করে, বলে হোয়াট? যতই রিপিট করে আমিন বোঝে না। কয়েকবার চেষ্টার পর কাউন্টারে দাঁড়ানো ছেলেটির পেছনে শেলফে রাখা কোকের বোতল আঙুল দিয়ে দেখায় আমিন। তখন খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে বলে, ‘ওহ ইউ মিন খোক?’

আমিন ছোটবেলার এক বন্ধুর বাসায় উঠেছিল। এক বেডরুমের অ্যাপার্টমেন্ট। পাঁচজন থাকে শেয়ার করে। বন্ধু ওকে বহুবার মানা করেছে যুক্তরাষ্ট্র আসতে। বলেছিল, তোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র নয়, আর এখানে আসার এটা সঠিক বয়সও নয়। এই বয়সে আসলে তোর জীবন চলে যাবে পায়ের নিচে জমিন পেতে পেতে। তাই কী কেউ শোনে তখন! যাওয়ার সাত দিন পর নিয়ে কাজে লাগিয়ে দিল। কাজ বলতে আট ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, মধ্যে আধা ঘণ্টা ব্রেক। হাঁটু, কোমর টনটন করে।

আমিন গল্পের ছলে বলছে, আমি বাংলাদেশে বেসরকারি কলেজে পড়াতাম, হেলেদুলে কলেজে যেতাম, একটা দুটো ক্লাস নিতাম। করিডরে হাঁটলে চারদিক থেকে সালাম বর্ষিত হতো। সচ্ছল ও স্বস্তির জীবন ছিল। একদিন ম্যানেজারের গালি খেয়ে কেঁদেই দিলাম।

আমিন পৌঁছানোর পরদিন ওর বন্ধু বলেছিল, দোস্ত টাকা-পয়সা কিছু লাগলে দিতে পারব। তবে টাইম চেয়ো না, এখানে ওখানে নিয়ে যেতে বলো না। সপ্তাহে ৬০ ঘণ্টা কাজ করি। দেশে তিনটি পরিবার আমার ওপর নির্ভর করে, কাজ না করলে তাঁদের চালাব কেমনে।

আমিন ভাগ্যবান, ওর ওপর কেউ নির্ভরশীল নয়। ডাল-ভাত খাইয়ে ওর নিজের পরিবার চালিয়ে নিতে পারবেন ওর বাবা। তখন যুক্তরাষ্ট্রে তার নিজেকে চালাতে পারলেই অনেক, তাও ঠিকমতো পারে না। সেখানে অনেক কাজ আছে কিন্তু সেগুলো করার যোগ্যতা বা সামর্থ্য তার নেই।

এরপর বউকে কিছু না বলে আমিন বাবাকে একদিন ফোনে জানায়, বাবা আমি দেশে ফিরে আসতে চাই। বাবা বললেন, খুশি হলাম যে, তুমি মরীচিকার বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে পেরেছ।

অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন