default-image

এক বছর। দীর্ঘ জীবনের হিসাব–নিকাশ খুব দ্রুতই চলে যায়। হয়তো ক্যালেন্ডারের পাতায় জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর ভালোভাবে খেয়াল করার আগেই বিলীন হয়ে যায় জীবনের ৩৬৫ দিন। জেসমিনের জীবনে এক বছর মানে অনেক সময়। গত বছরের ৫ এপ্রিল থেকে এখন মার্চ মাস চলছে। এক বছর হতে এখনো বাকি বেশ কিছুদিন। কিন্তু প্রতিটা সেকেন্ড যেন অনেক দীর্ঘ মনে হয় তার কাছে।

স্বপ্নের আমেরিকায় পাড়ি জমান আলম ছয় বছর আগে। সবকিছু গুছিয়ে আড়াই বছর পর আনেন স্ত্রী জেসমিন ও সন্তানদের। সবকিছু নিয়ম মাফিকেই চলছিল। বিমানবন্দরে কাজ করতেন। ভালো আয়। সেই সঙ্গে আছে হিসাবের বাইরেও আয়। ছয়, আট, আর ১৬ বছরের যেহেতু তিন সন্তান, তাই স্ত্রীকে কাজ করার উৎসাহও দেননি কখনো। বরং ঘর সামলানো, সন্তানদের মানুষ করার দায়িত্বও দিয়ে রেখেছিলেন স্ত্রীর কাঁধে। সারা দিন পরিশ্রম, ওভারটাইম সবকিছু মিলিয়ে খারাপ যাচ্ছিল না স্বপ্নের এই দেশটিতে। দুই বেডরুমের বাসায় থাকতেন। তবে জীবনের সবকিছু ছন্দ মিলিয়ে চলে? ছন্দে পতন ঘটে করোনা মহামারির সময়ে। বিমানবন্দরে ২০ মার্চ শেষ কাজ করতে পেরেছিলেন আলম। সেদিনেই মধ্যরাতে আসে জ্বর। জেসমিনের বুকটা আঁতকে ওঠে। তারপরও শক্ত মনে স্বামীকে আলাদা রুমে রেখে বাচ্চাদের ঘরে থাকা শুরু করেন। বাচ্চাদের মানা করেন বাবার রুমে যেতে। শুরু হয় অন্যরকম এক লড়াই।

করোনা শব্দটি ভয়ংকর এক শব্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন সবার কাছে। তাই জেসমিন নিজেকে বোঝান, স্বামীকে বোঝান, এটি করোনা নয়। এমনি জ্বর এসেছে। পাঁচ দিন। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। সহায়তা করার কেউ নেই। মানবিক নিউইয়র্ক শহর তখন সবাই ঘরবন্দী নিজেকে রক্ষার লড়াইয়ে। তাই, আলম সাহেবেই ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করে নেভুলাইজার কিনে আনেন নিজে গিয়ে।। কিন্তু কাজ হয়নি। শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে। মেয়েকে দিয়েই ইমারজেন্সি কল করে অ্যাম্বুলেন্স ডেকে আনেন।

বিজ্ঞাপন

বিদায় বেলায় নেই কোনো প্রতিশ্রুতি। কারণ, হাসপাতাল থেকে হয়তো ফিরে আসবেন, হয়তো ফিরবেন না। তাই নীরবেই অ্যাম্বুলেন্স গিয়ে ওঠেন আলম।

জেসমিন আশায় বুক বাঁধেন। বিশ্বের সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা ব্যবস্থার এই দেশটিতে করোনা হয়তো কেড়ে নিতে পারবেন না তার একমাত্র অবলম্বনকে। সকাল–বিকেল ভিডিও কলে কথা বলেন। তবে ২৯ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার চার দিন পরেই অবস্থার অবনতি ঘটে। কোনোভাবে আর যোগাযোগ করতে পারেননি স্বামীর সঙ্গে। ৫ এপ্রিল আসে সব হারানোর বার্তা। তখনো বিশ্বাস করতে পারছিলেন না জেসমিন। স্বামীর বয়স মাত্র ৪৯ বছর। ভালো স্বাস্থ্যের অধিকারী। আগে কোনো ধরনের অসুখও ছিল না। এত সহজে হার মানবেন আলম?

এরপর নিষ্ঠুর করোনার কাছে সব আবেগ বিসর্জন দিতে হয় জেসমিনকে। স্বামীর লাশটিও শেষবারের মতো দেখা হয়নি তার। দূর থেকে চোখের জল ফেলা। একজন মানুষের বিদায়। এক বছরে জেসমিনের জীবনের সব রং পাল্টে গেছে। করোনায় লাখো মানুষের মৃত্যুর মিছিলে তার হিসাব করা একটি মৃত্যু। পাল্টে দিয়েছে চারটি জীবনের সব হিসাব–নিকেশ।

জেসমিন আজ দুই বেডের বাসায় নেই। তিন সন্তান নিয়ে চলে এসেছে স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টে। ১৬ বছরের মেয়ের জন্য আলাদা কোনো রুম নেই। স্বপ্নের এই দেশটিতে নতুন করে স্বপ্ন বোনার চেষ্টা করছে। এ দেশের রাস্তা–ঘাট সাবওয়ে ব্যবহার এক বছর আগে না জানলেও এখন শিখে গেছে। কাজ করছে এক ডানকিন ডোনাটে। শুধু সন্তান লালন–পালনের দায়িত্ব আজ তার কাঁধে নেই, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই কাজ করে চলেছে রাত দিন। আগে যেহেতু কখনো কাজ করেনি, বেকার ভাতার সুবিধাটিও তার কাছে নেই। আশা করে না কোনো আর্থিক সহায়তারও। কারণ, সাময়িক সহায়তা পারবে কি সারা জীবন যে দায়িত্ব নিত, সেই অবলম্বন হারানোকে পুষিয়ে দিতে!

তাই জেসমিন আজ কাঁদে না। প্রতিদিন সাবওয়েতে যখন উঠে, শত শত ব্যস্ত মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখে! বাঁচার লড়াই। করোনা তার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে! জীবনের রং পাল্টে দিয়েছে। কিন্তু জেসমিন আর পরাজিত হতে চায় না। বাঁচার লড়াই চালিয়ে যেতে চায় তিন সন্তান নিয়ে।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন