দহনবেলা শেষে সুন্দরের পথে যাত্রা

২০২০ সালটি ছিল ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলার বছর; প্রিয়জনদের হারানোর বছর। ২০২১ সালেও হয়তো এর ধারাবাহিকতা কিছুটা থাকবে। তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকার কেটে যাবে। প্রলয়ংকরী বন্যার পর যেমন উর্বর পলিমাটি ছড়িয়ে দিয়ে প্রকৃতি মানুষকে বলে, ‘তোমরা আবার ফসল বোনো, হরেক রকম শস্য, ফুল, ফল দিয়ে মাঠ ভরে তোলো, জীবনের জয়গান গাও।’ একই রকম প্রতিটি বিপর্যয় শেষে প্রকৃতি তার সন্তানদের বলে, ‘তোমাদের দহনকাল শেষ হলো। এবার ঘন সবুজে ভরে তোলো বসুন্ধরা। তোমাদের হাতে

স্বপ্নলোকের চাবি। হৃদয়ের ভালোবাসা দিয়ে গড়ে তোলো নতুন পৃথিবী। যে পৃথিবীতে কচি ঘাসের ওপর নির্ভয়ে খেলা করবে চঞ্চল হরিণের দল। শিকারির ধনুক থকে বের হবে না কোনো তীর। শিকারির তীরে বিদ্ধ হবে না প্রকৃতি মায়ের কোনো সন্তান। শ্যামল প্রান্তরজুড়ে সবুজের সমুদ্দুর গড়ে উঠবে। সে সবুজে কর্তৃত্ব থাকবে শুধু মানবিক মানুষের হাতে।’

একদিন নিদ্রাভঙ্গ হবে দানবিক মানুষের। যে মানুষ এস টি কোলরিজের বিখ্যাত ‘অ্যানশায়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতার বৃদ্ধ নাবিকের মতো হত্যা করেছিল সত্য, সুন্দর, মঙ্গলের বার্তাবাহক পাখি অ্যালবাট্রসকে। পাখিটি প্রকৃতি থেকে শুভ বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছিল। কুয়াশা ও মেঘের চাদরে ঘেরা জাহাজের মাস্তুলে, কখনো-বা পালের অপূর্ব নকশা করা গায়ে ক্রমাগত নয়টি সন্ধ্যা প্রহরীর মতো বসেছিল পাখিটি। শুভ শক্তির প্রতীক সেই পাখি পিশাচের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সারা রাত কুয়াশা ও মেঘের ভেলার ভেতর থেকে অমঙ্গলকে প্রতিরোধ করেছিল। পাপগ্রস্ত বৃদ্ধ নাবিক তাকে হত্যা করল। উজ্জ্বল, স্থির, রহস্যভরা চোখে বৃদ্ধ নাবিক অ্যালবাট্রসকে হত্যার বর্ণনা দিয়েছিল এভাবে—‘আমার ধনুক থেকে বেরিয়ে আসা তীরে আমি বিদ্ধ করলাম সত্য, সুন্দর ও মঙ্গলকে।’ যখনই মানুষ সত্য ও সুন্দরের প্রতি নিষ্ঠুর হয়, প্রকৃতি তাকে কবি কিটসের মতো স্মরণ করিয়ে দেয়—‘জানিয়ে দাও পৃথিবীর সকল কোণের মানুষকে, “সত্যই সুন্দর, সুন্দরই সত্য”, এ কথাটি যে সমস্ত অসুন্দরেরা জানে না, তাদের জানা খুব প্রয়োজন।’

বিজ্ঞাপন
মানবসভ্যতার ইতিহাস মানুষের সংগ্রাম ও ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। মানুষ যখনই মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখনই উঠে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মনে হয়েছিল সভ্যতা বুঝি ধ্বংস হতে চলেছে। কিন্তু তা হয়নি। মানুষ পেছন দিকে তাকিয়েছে, শিক্ষা নিয়েছে; তারপর এগিয়ে গেছে অনেক দূর। মানুষ পরাজিত হয়, কিন্তু মানুষকে ধ্বংস করা যায় না, যেমনটা বলেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।

মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ ঝরা পালকের আর্তনাদে জর্জরিত হন। তারা পৃথিবীর বুকে পা রাখার সময় সতর্ক থাকেন, যেন পৃথিবীর বুক আঘাতে কাতর না হয়। মানবিক মানুষ যখন পরাজিত হয়, দানবিক মানুষের হাতে তখন দানবেরা মানুষের রূপ ধরে কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। কর্তৃত্ববাদী মানুষেরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। তখন প্রকৃতি তা প্রতিরোধ করে। দুষ্ট মানুষের ভাবনায় প্রকৃতি তখন হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। প্রকৃতি যখন বিরূপ হয়, সুন্দর, শুভ ও মঙ্গল তখন দূরে সরে যায়।

অ্যালবাট্রসকে হত্যার পর ‘অ্যানশায়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতায় বর্ণিত জাহাজটি পাপের ভারে অজানা দ্বীপে স্থবির হয়ে পড়ে। সেই দ্বীপে সূর্য মধ্যগগনে স্থির হয়ে থাকে অহর্নিশ। স্থির সূর্য মাথার ওপর প্রখর তেজে উত্তাপ দিয়ে প্রকৃতির বিরক্তির কথা জানিয়ে দেয়। জাহাজের যাত্রীরা ধীরে ধীরে জরাগ্রস্ত, মুমূর্ষু কঙ্কালে পরিণত হয়। দিন থেকে রাত, রাত থেকে দিন হয় না। সামুদ্রিক পাখিগুলো ওড়ে না, প্রজাপতি, ফুল ছবির মতো স্থির হয়ে থাকে। জোছনার প্লাবনের সৌন্দর্য যাত্রীরা ভুলে যায়। যাত্রীদের মনোজগৎ ও বাহ্যিক জগৎ বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়ে। মানুষ কী এভাবে বাঁচতে পারে? মানুষের মানবিক বোধ কী মানুষের মতো থাকে তখন? অ্যালবাট্রসকে হত্যার পর নাবিক ও জাহাজের যাত্রীরা প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রতিরোধে পড়েছিল। অসুন্দর কাজের জন্য মানবসভ্যতাকে এভাবে দহনকাল অতিক্রম করতে হয়। প্রকৃতির নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ না থাকলে কিংবা মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে ফেললে প্রকৃতির নিয়মেই মানুষকে বিপন্ন হতে হয়। মানুষের বিপন্ন হওয়ার গল্প আমরা দেখি গ্রিক মিথ কিংবা ভারতীয় মিথে। গল্পগুলো আমাদের অনেকেরই জানা, প্রকৃতিকে ভালোবেসে, গল্পের বাণীগুলোকে আমরা বিবেচনা করতে ভুলে যাই।

কী অপূর্ব সেসব কাহিনি! ধ্রুপদ ইংরেজি সাহিত্য এমনকি বিশ্বসাহিত্য পর্যন্ত দাঁড়িয়ে আছে গ্রিক মিথের চিরন্তন গল্পগুলোর ওপর। গ্রিক মিথে ইকারুসের গল্পটিতে প্রকৃতির মাত্রাজ্ঞানের কথা বলা আছে অপূর্ব ভঙ্গিতে। ইকারুস ছিলেন ডিডেলাসের একমাত্র ছেলে। ডিডেলাস এথেন্সের বিখ্যাত এক মানুষ। তিনি একাধারে স্থপতি, ভাস্কর ও আবিষ্কারক। বলা হয়, ডিডেলাসের তৈরি ভাস্কর্যগুলো এতটাই জীবন্ত ছিল যে, তাদের সুতা দিয়ে বেঁধে রাখতে হতো, যাতে চলাচল করতে না পারে। ডিডেলাস ও তার ছেলে ইকারুসকে বন্দী করা হলো গোলক ধাঁধার মধ্যে। সেই গোলকধাঁধা থেকে বের হতেই পিতা-পুত্র দুজনেই ডানা পরলেন। পুত্র ইকারুসকে মোম ও পর্যাপ্ত পরিমাণ পালক দিয়ে ডানা তৈরি করে দিয়েছিলেন ডিডেলাস, যাতে পাখির মতো উড়ে গোলকধাঁধা থেকে বের হওয়া যায়। ডিডেলাস উড়তে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ইকারুসকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন, ইকারুস যেন সূর্যের কাছাকাছি চলে না যান। ডানা ঝাপটে পিতা-পুত্র মুক্ত হলেন। গোলকধাঁধাকে পেছনে ফেলে চলে এলেন বহু দূরে। কিন্তু হায়, মুক্ত জীবনের আনন্দে বিভোর ইকারুস বাবার সাবধানবাণী ভুলে উড়তে উড়তে সূর্যের কাছে চলে এলেন। সূর্যের উত্তাপে ডানার মোম গলে গলে পড়তে থাকল। ডানা খুলে গেল এবং ইকারুসের পতন হলো সমুদ্রের গভীর জলরাশিতে। চোখের সামনে ছেলের মৃত্যু দেখে বাবা তীব্র যন্ত্রণায় দগ্ধ হলেন। তবুও তার কিছু করার ছিল না। প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ধ হলে প্রাকৃতিকভাবেই মানুষকে শিক্ষা পেতে হয়—ইকারুসের পতন আমাদের সে কথাই বলে। মাত্রাজ্ঞান থাকায়, প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণের জন্য বাবা ডিডেলাস কিন্তু বেঁচে গিয়েছিলেন। এই মাত্রাজ্ঞান হারিয়ে যাওয়ায় ইকারুসের মতো বিপর্যয়ের সামনে পড়ছে মানুষ।

আপাতদৃষ্টিতে গত অর্ধ-শতাব্দীকে মানুষের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ বলে মনে হলেও এই সময়ের মধ্যেই কিন্তু মানুষ রোপণ করেছে তার ভবিষ্যৎ অমঙ্গলের বীজ। এক সময় মানুষসহ সমগ্র জীবজগৎই ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন। সেখান থেকে ধীরে ধীরে পরিবেশের কর্তৃত্ব হাতে তুলে নিয়েছে মানুষ। ফলে নিজের প্রয়োজনে পরিবেশকে ইচ্ছামতো পরিবর্তনের ক্ষমতাও মানুষের হাতে আসে। সেই ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে আপাতভাবে লাভবান হলেও সার্বিকভাবে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হয়েছে সীমাহীন। বিশেষ করে গত কয়েক দশকে আমরা যে কতভাবে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছি, তার হিসাব নেই। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে মানুষের লাভবান হওয়ার চিন্তা করাটা বোকামি। পৃথিবীজোড়া অগণিত মানুষের বর্তমানের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আমরা যে ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সম্পদহীন করে ফেলছি, সে কথা ভাবার সময়ও কারও নেই।

গত ৫০০ বছরে পৃথিবী নামের এই গ্রহ অনেকগুলো শ্বাসরুদ্ধকর উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে গেছে। অর্থনীতির বিকাশ হয়েছে প্রায় বিস্ফোরণের মতো। আজ সমগ্র মানবজাতির যত সম্পদ, তার পরিমাণ রূপকথাকেও হার মানিয়ে দেয়। ইতিহাসের এই সময়কালে, বিজ্ঞান ও শিল্পের বৈপ্লবিক উন্নতি মানুষকে প্রায় অতিমানবীয় ক্ষমতা এনে দিয়েছে। খোলনলচে বদলে গেছে সামাজিক কাঠামো। তার সঙ্গে বদলেছে পৃথিবীর রাজনীতি, মানুষের জীবন ও চিন্তাধারা। মানুষের বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পরবর্তী প্রায় ৭০ হাজার বছরে পৃথিবী কি আগের চেয়ে আরও একটু বেশি বাসযোগ্য হয়েছে? আমরা কী আত্মঘাতী হতে যাচ্ছি?

আমরা আত্মঘাতী হব না। আমরা পরিশুদ্ধ হব। মানুষ দুঃখের ভেতর দিয়ে যায়, কিন্তু দুঃখকে স্বীকার করে না। মানুষ শুভ ও মঙ্গলের প্রতীক অ্যালবাট্রসকে ভালোবাসে। যেমন আমাদের ভালোবাসার কবি নির্মলেন্দু গুণ ‘দুঃখ করোনা- বাঁচো’ কবিতায় বলেন—‘দুঃখকে স্বীকার করো না-সর্বনাশ হয়ে যাবে/দুঃখ করোনা, বাঁচো, প্রাণ ভরে বাঁচো/...যদি মরতেই হয়, আনন্দের হাত ধ’রে মরো/ বলো, দুঃখ নয়, আনন্দের মধ্যেই আমার জন্ম/ আনন্দের মধ্যেই আমার মৃত্যু, আমার অবসান।’ আসলেই আমরা শুদ্ধ মানুষ হয়ে ভালোবাসার প্লাবন বইয়ে দিয়ে এক নতুন মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলতে চাই।

মানবসভ্যতার ইতিহাস মানুষের সংগ্রাম ও ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস। মানুষ যখনই মুখ থুবড়ে পড়েছে, তখনই উঠে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। বিশ্বযুদ্ধ, মহামারি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মনে হয়েছিল সভ্যতা বুঝি ধ্বংস হতে চলেছে। কিন্তু তা হয়নি। মানুষ পেছন দিকে তাকিয়েছে, শিক্ষা নিয়েছে; তারপর এগিয়ে গেছে অনেক দূর। মানুষ পরাজিত হয়, কিন্তু মানুষকে ধ্বংস করা যায় না, যেমনটা বলেছেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে।

মহামারির নিষ্ঠুরতায় মানুষ কিছুটা ভীত হয়েছিল। মহামারির প্রলয়ের ভেতরে মানুষ যে বেঁচে ওঠার সংগ্রাম করেছে, সে সংগ্রাম মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ আমাদের যতটুকু ভীত করছে, ভ্যাকসিনের আবিষ্কার ও উড়োজাহাজে করে দেশে দেশে ভ্যাকসিন পৌঁছে যাওয়ার খবর আমাদের অনেক বেশি আনন্দিত করেছে। মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। তাই মানুষকে নিজের সত্তার মতো প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হয়। প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। ‘অ্যানশায়েন্ট ম্যারিনার’ কবিতার জাহাজটি স্থবির হয়ে পড়েছিল, বৃদ্ধ নাবিকের অমানবিক হত্যাকাণ্ডের জন্য। জাহাজটি কিন্তু আবার চলতে শুরু করেছিল যখন পাপগ্রস্ত নাবিক আত্মদহনে জর্জরিত হয়েছিল। আমরাও দহন বেলা শেষে ‘অ্যানশায়েন্ট ম্যারিনারের’ জাহাজের মতো সবগুলো পাল উড়িয়ে বিজয়ী বেশে এগোতে থাকব। কারণ পরিশুদ্ধ মানুষের যাত্রা হয় নিরাপদ, পথ হয় মসৃণ।

বিজ্ঞাপন
অভিমত থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন