default-image

গত তিন দশক ধরে ব্রিটেনে বসবাস করছি। সাংবাদিকতা পেশায় থাকার কারণে ছোট-বড় অনেক ইভেন্ট কভার করেছি। সেই সুবাদে কিছু কিছু ইভেন্ট আমার মনে এখনো জাগরুক রয়েছে। এমন একটি ইভেন্ট ছিল লন্ডনে ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের জামদানির ওপর ‘ওভেন এয়ার’ নামের আন্তর্জাতিক ইভেন্টটি। সেই ইভেন্ট নিয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করছি এই কারণে যে, বাংলাদেশে বর্তমানে তাঁত ও জামদানি শিল্পে প্রযুক্তির ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা এই আন্দোলনে নেমেছেন, তাঁদের অতীতের এই যোগসূত্র উৎসাহ দিতে পারে।

বিলুপ্ত মসলিন, জামদানি ও আমাদের সিলেটের মণিপুরি তাঁত বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত দুর্বলতা রয়েছে। বলে রাখি, আমার জন্ম ছড়ার পারে। বড় হয়েছি সিলেট শহরের শেখঘাট এলাকায়। আমার জন্মস্থান ও আমাদের পাড়ার আশপাশের বসতি লালা দিঘির পার, লামাবাজারে মণিপুরিদের বাস। পুরো সিলেট নগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মণিপুরি জনগোষ্ঠী। এর মধ্যে মাছিমপুর, শিবগঞ্জ, মণিপুরি রাজবাড়িসহ অনেক এলাকার কথা উল্লেখ করা যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেট ভ্রমণের সময় মাছিমপুর গিয়েছিলেন। সংস্কৃতির অঙ্গনে মণিপুরি নাচ এখন বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। মণিপুরি খাবার; যেমন—তিলুয়া, খই, ভেটের খই, চিড়া-মুড়ির গুড়ের লাড্ডু আজও বৃহত্তর সিলেটের ঘরে ঘরে নিত্যদিনের খাবার হিসেবে আদৃত। সিলেটের বন্দর বাজারসহ হাটবাজারে মণিপুরি খই, গুড়মুড়ির লাড্ডু এখনো পাওয়ার কথা।

ছোটবেলায় ছড়ার পারে থাকতে দেখেছি বিকেলের দিকে মাছিমপুর থেকে মণিপুরিরা গামছা, খই, মুড়ি ইত্যাদি নিয়ে বন্দরবাজারের দিকে ছুটছেন। একটু বড় হলে লামাবাজারে দেখেছি অনেকের বাসায় তাঁত যন্ত্র। এসব দেখে দেখে আমার বড় হওয়া। আমাদের শিক্ষক ছিলেন মণিপুরি; অনেক সহপাঠী বন্ধুও ছিল তা-ই। কালের আবর্তে সেই বন্ধুরা হারিয়ে গেছে। আমার ঠাঁই হয় লন্ডনে। কয়েক বছর পর লন্ডন থেকে সিলেট গিয়ে দেখলাম লামাবাজারে মণিপুরি বস্ত্রের একটি পল্লিও গড়ে উঠেছে। দেশ-বিদেশের শৌখিন মানুষের কাছে মণিপুরি পণ্য জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রবাসীরা উপহার হিসেবে মণিপুরি জামদানি, তাঁতের শাড়ি, শাল, নকশিকাঁথা, অলংকার ইত্যাদি কেনেন। এভাবে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে দেশীয় পণ্যের কদর বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

এই লেখার শুরুতেই বলেছিলাম, মসলিন ও জামদানি নিয়ে ব্রিটেনের ফ্যাশন জগতে আগ্রহ ছিল বেশ আগে থেকেই। সেই আগ্রহ থেকেই ১৯৮৮ সালে লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল আর্ট গ্যালারিতে ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামের উদ্যোগে জামদানি নিয়ে এক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ থেকে তাঁত ও তাঁতজাত পণ্য আনা হয়। ভিঅ্যান্ডএম-এর শিক্ষা কর্মকর্তা প্রয়াত শিরীন আকবর ছিলেন এই প্রদর্শনীর উদ্যোক্তা। লন্ডনের সোহো এলাকার (আমীন আলীর) রেডফোর্ট রেস্টুরেন্ট তখন ভোজনরসিক তারকাদের পদভারে মুখরিত থাকত। সেখানেই আয়োজন করা হলো সংবাদ সম্মেলন। আমি তখন লন্ডনের সাপ্তাহিক সুরমা পত্রিকায় কাজ করতাম। ‘ওভেন এয়ার’ আয়োজিত জামদানি প্রদর্শনী নিয়ে রিপোর্টিং করতে গিয়ে আমি অভিভূত হয়েছিলাম এই কারণে যে, লুপ্তপ্রায় এই মসলিন/ জামদানি ব্রিটিশ ফ্যাশন জগতে এখনো দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে। জামদানি প্রদর্শনী ব্রিটেনের বাংলা মিডিয়া ছাড়াও মূল স্রোতের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল।

এই ইভেন্টের পর বাংলাদেশের হাইকমিশনের কমার্শিয়াল সেকশন যদি সংশ্লিষ্ট বিজনেস হাউসগুলোকে সংযুক্ত করতে পারত, তাহলে লন্ডন ফ্যাশন ও ডিজাইন জগতে জামদানি একটি স্থান করে নিতে পারত। লন্ডনের ওয়েস্টফিল্ড শপিং সেন্টারে খাদি পণ্যের দোকান আছে; আমাদের জামদানির দোকানও হতে পারত। যা হোক ওভেন এয়ার ইভেন্ট গত হওয়ার অনেক বছর কেটে যাওয়ার পর, হঠাৎ একদিন দেখলাম লন্ডনের স্টেপনি কমিউনিটি ট্রাস্টের উদ্যোগে হেরিটেজ প্রোজেক্ট মসলিনের ওপর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। জামদানি ব্যবহার করে মসলিনের ঐতিহ্য পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় তারা। এতে লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন ও লন্ডনের ফ্যাশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থা জড়িত ছিলেন। লন্ডনের ডিজাইনাররা ঢাকার জামদানি থেকে ৩০০ বছর আগের অভিজাত মসলিন রিক্রিয়েট করেছেন।

ব্রিটেনের মূল স্রোতের ফ্যাশন ও ডিজাইন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের কারিগরদের যোগসূত্র স্থাপনের এক শুভ উদ্যোগ নিয়েছিল এই প্রকল্প। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শেষ হয়। তাদের পক্ষ থেকে তথ্যবহুল একটি ইংরেজি প্রকাশনা বের করা হয়। সচিত্র প্রকাশনাটি ভবিষ্যতে রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগবে। লন্ডনের হেরিটেজ প্রকল্পটির জামদানি পর্বটি শেষ হলেও মনে আশার সঞ্চার হলো যখন দেখলাম, টানা তৃতীয়বারের মতো ঢাকার এসএমই ফাউন্ডেশন ও অ্যাসোসিয়েশন অব ফ্যাশন ডিজাইনারস বাংলাদেশের (এএফডিবি) যৌথ উদ্যোগে ‘হেরিটেজ হ্যান্ডলুম ফেস্টিভ্যাল ২০২০’ আয়োজন করা হলো অনলাইনে। আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এই অনলাইন আয়োজনে ৪০টি স্টল থাকবে। আরেকটি খবরে দেখলাম, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে এম আবদুল মোমেনের সঙ্গে সিলেট উইমেন চেয়ারস অ্যাসোসিয়েশনসহ কয়েকটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা সাক্ষাৎ করে বিদেশে মণিপুরি তাঁত-পণ্য, শীতল পাটিসহ নানা পণ্য রপ্তানি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের ইনস্টাগ্রামে দেখলাম, ‘টেকনোলজি ফর প্রিজার্ভিং হেরিটেজ’ শীর্ষক সেমিনারের বিজ্ঞাপন। এই ভার্চুয়াল সেমিনারে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন লন্ডনে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইয়েদা মুনা তাসনিম, এএফডিবির প্রেসিডেন্ট এম এস মানতাসা আহমেদ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ডিজাইনার বিবি রাসেল।

অনলাইনে সেমিনারটি দেখার পর সংবাদকর্মী হিসেবে উপরিউক্ত তিনজনের সঙ্গেই ই-মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করি। সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে দীর্ঘ ৩৫ বছর থাকার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিদেশে বিবি রাসেলের যে ভাবমূর্তি, তা বাংলাদেশ ব্যবহার করতে পারলে দেশ লাভবান হবে। ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট আন্দোলনের মাধ্যমে বিবি রাসেল শুধু প্রাচ্য-পাশ্চাত্য উভয় জগতে খ্যাতি পেয়েছেন। এ কথা জানা যে, বিবি রাসেল ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কভার গার্ল হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তিনি পশ্চিমা জগতের রঙিন বিলাসী জীবন ছেড়ে বাংলার শীতলক্ষার পারে চলে এসেছিলেন। কারণ, তিনি তাঁর নিজের দেশের জন্য কাজ করতে চান। এখন বাংলার লুপ্তপ্রায় তাঁত শিল্পকে নতুন প্রাণ দিতে বিবি রাসেলের ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তিনি অনুপ্রাণিত করছেন গ্রামবাংলার তাঁতিদের। বিবি রাসেলের এই উদ্যোগের কারণে দেশে-বিদেশে শিক্ষিত তরুণ সমাজের মধ্যেও তাঁর একটা সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। বিবি রাসেল তরুণদের উদ্দীপ্ত করতে বক্তব্য রাখছেন। ইউটিউবে তাঁর এসব বক্তৃতা অনেক উদীয়মান ডিজাইনারকে উৎসাহিত করছে। শুধু বাংলাদেশেই নয় ভারতসহ অন্য দেশগুলোতেও ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে নারীদের প্রশিক্ষণ দিতে আমন্ত্রণ পান তিনি। কয়েক মাস আগে ভারতে গিয়ে এ ধরনের প্রকল্পে কাজ করে এসেছেন।

বছর তিনেক আগে লন্ডনে আমি বিবি রাসেলের একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। বৃহত্তর সিলেটের মণিপুরি বস্ত্র শিল্পকে বিশ্ববাজারে নিয়ে আসতে বিবি রাসেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। বিষয়টিতে তিনি খুবই আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কথায় কথায় তিনি আমাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ঢাকাতে এএফডিবির প্রেসিডেন্ট এম এস মানতাশা আহমদ লন্ডনে হাইকমিশনার সাইয়েদা মুনা তাসনিমের মতো ব্যক্তিরা, যারা তাঁত শিল্পের পুনরুজ্জীবন নিয়ে কাজ করেন, তাঁদের কাছে বিষয়টি তুলে ধরতে। নিশ্চয়ই তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেবেন। এ ব্যাপারে আমি মনে করি দেশের পণ্য বিদেশে বিপণন করতে হলে দূতাবাসগুলোর কমার্শিয়াল সেকশনকে আধুনিক করে ঢেলে সাজাতে হবে। সরকারি অফিসার দিয়ে বিপণন কাজ সফল হওয়ার নজির খুব একটা দেখা যায় না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে উদ্যোক্তারা যারা পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের যে চেইন সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের সংযুক্ত করতে হবে। বিবি রাসেলের ‘ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট’, এম এস মুনতাসা আহমেদের ‘দেশি ভালোবাসি’, ‘জাস্ট হেল্প ইউকে’ ও ‘বিবি ফাউন্ডেশন লন্ডন’ নামের সংগঠনের সহযোগিতায় ঊর্মি ও দিবাকরের ‘সিলেটের ঐতিহ্যের তাঁত’ নামের সংগঠন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা হ্যান্ডলুম ও হেরিটেজের ফ্যাশন জগৎকে উদ্ভাসিত করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী বাংলাদেশিরাও বাংলাদেশি বস্ত্র ব্যবহারের এই আন্দোলনে শরিক হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0