default-image

দেশ ও সমাজ উন্নয়নে যুব শক্তির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারুণ্যের স্বপ্ন কেবল একটি জাতিকেই প্রভাবিত করতে পারে তা নয়, এটি পুরো বিশ্বে বিপ্লবও আনতে পারে। একটি পরিবার, সমাজ ও দেশের উন্নয়নে তারুণ্যের মতামত ও অংশগ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, যুক্তরাষ্ট্রে তারুণ্যের সেই উদ্দাম, গতিশীলতা দিন দিন শিথিল হয়ে আসছে। আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে। ২০১৩ সালের ন্যাশনাল ভাইটাল স্ট্যাটেস্টিক রিপোর্টে দেখা যায়, মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের কারণেই এই আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে, আত্মহত্যা এখন কিশোর-তরুণদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িযেছে। সিডিসির তথ্য অনুসারে, বিগত ২০০৭ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে ১০ থেকে ২৪ বছরের কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার এই সংখ্যা ৫৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিগত কয়েক মাসে নিউইয়র্ক নগরে বিশেষ করে বাঙালি কমিউনিটিতেও তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। বেশ কিছু তরুণের আত্মহত্যা ছিল হৃদয়বিদারক। হুটহাট করে রাগ-অভিমানের বশে কেন আমাদের তরুণ মেধাবী সন্তানেরা বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার এই নির্মম পথ? এই প্রশ্ন আমাদের সবার।

সুইসাইডোলজি, মনস্তাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক অসুস্থতা আত্মহত্যার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞ মাইকেল মোসকোস, জেনিফার অ্যাকিলিস ও ডগ গ্রের মতে, আত্মহত্যার কারণগুলোর মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক, পরিবেশগত ও সামাজিক কারণ রয়েছে। ২০১৬ সালের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ মেন্টাল হেলথের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আত্মহত্যার ঝুঁকির কারণগুলোর মধ্যে হতাশা এবং অন্যান্য মানসিক ব্যাধি ও সাবস্ট্যান্স অ্যাবিউজ ব্যাধি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আমরা যারা আমেরিকা বসবাস করছি, আমাদের প্রায় সবারই সন্তানদের সঙ্গে একটা বিশাল ‘জেনারেশন গ্যাপ’ রয়েছে। আগের সময় ও বর্তমান সময়ের মধ্যে ব্যবধান ‌রয়েছে অনেক। আমরা বাবা-মায়ের ধমক-পিটুনি খেয়ে বেড়ে উঠেছি। তারা যা বলেছেন বা চেয়েছেন, আমরা তাই করেছি। সেখানে নিজেদের কোনো মতামত বা ইচ্ছে প্রকাশ করার সুযোগ ছিল না। পছন্দমতো ঈদের কাপড় কেনার ব্যবস্থা ছিল না, প্রযুক্তির এত উন্নয়ন ছিল না, পৃথিবীকে উপভোগ করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল না। ভাতের মাড় ছিল সে সময়ে অরগানিক স্যুপ। উঠানে পাতা একটা টিভি ছিল পুরো এলাকার বিনোদন। আর নদীর পাড় থেকে পিছলে নিচে নামা ছিল আজকের স্লাইড। নিজের মেধা বিকাশের কোনো অবকাশ ছিল না। আর তাই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হওয়ার মতো মেধাবী আমরা আজ হয় আমেরিকার ক্যাব ড্রাইভার, নয়তো ডানকিনের কর্মচারী।

বিজ্ঞাপন

আজ দিন বদলেছে। পরিবেশ, পরিস্থিতি, প্রযুক্তির ব্যবহার, নাগরিক অধিকার, সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আজকের এই জেনারেশন গ্যাপটা ঠিক এখানেই। সবকিছু বদলে গেলেও বদলাতে পারছি না আমরা। আমরা নিজেদের মত করে সন্তানদের ওপর সব ধর্ম, কর্ম, সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে চাচ্ছি। ছোটবেলায় আমরা কখনো বাবা–মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলিনি। তাদের ইচ্ছা, মতাদর্শেই আমরা চলেছি। আজ আমরা ভাবি, আমাদের সন্তানেরাও তাই করবে। সমস্যা এখানেই।

আমরা নিজেদের মত সন্তানদের গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি। সন্তানেরা কী পরবে, কী করবে, কার সঙ্গে চলবে, কোথায় যাবে, এমনকি পড়াশোনা করে তারা কী হবে—সেটাও আমরা নির্ধারণ করার চেষ্টা করছি। আর এতে আমাদের সন্তানেরা মানসিকভাবে বিধ্বস্ত হচ্ছে। হতাশায় ভুগছে।

আমরা জানি, কিশোর বয়ষ মূলত একটি মানসিক চাপের সময়। এ সময় তাদের দেহের, চিন্তার ও অনুভূতির পরিবর্তন হয়। এ সময়ে পরিবার, বন্ধুমহল, স্কুল বা স্বজনদের কাছ থেকে যেকোনো ধরনের মানসিক চাপ, কলহ, সম্পর্ক ভাঙন, তিরস্কার, বিভ্রান্তি, ভয় ও সন্দেহমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুভূতি যেকোনো কিশোর-কিশোরীর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু আমরা সে বিষয়গুলোকে একেবারেই প্রাধান্য দিচ্ছি না।

এমনকি প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানটিকেও আমরা একটি নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতায় রাখতে চাচ্ছি। পড়াশোনা, চাকরির সুবাদে আমাদের সন্তানরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও আমরা আবেগী হয়ে পড়ছি, যেটা তাদের অগ্রগতির পথে অন্তরায়। এতে তারা বিরাট মানসিক সমস্যায় পড়ছে। তৈরি হচ্ছে বাবা–মায়ের প্রতি অসন্তোষ, ক্ষোভ, বিরক্তি ও হতাশা। কেউ কেউ এর সমাধানে বেছে নিচ্ছে আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর পথ।

সংস্কৃতি একটি উল্লেখ্যযোগ্য বিষয়। সামাজিক আচরণ, মিথস্ক্রিয়ার ধরন, জ্ঞানীয় গঠন ও সামাজিককরণের মধ্য দিয়ে যে বোঝাপড়া অর্জিত হয়, সেটাই সংস্কৃতি। আমরা জন্মসূত্রে বাঙালি হলেও পরিবার নিয়ে বাস করছি আমেরিকায়। কাজেই নিজ সংস্কৃতি হৃদয়ে ধারণ করে হলেও ভিন্ন এই নতুন সামাজিক গড়নকে গ্রহণ করতে হবে এবং নতুন জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সামষ্টিক আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে হবে। তা না হলে আমরা সন্তানদের জন্য উন্মুক্ত পথ খোঁজে পাব না। জেনারেশন গ্যাপে আমরা কেবল বিভ্রান্তই হব এবং আমাদের সন্তানেরা ক্ষতিকারক পথটি বেছে নিবে, যার মধ্যে আত্মহত্যা একটি।

কিশোর-তরুণেরা আমাদের আগামীর ভবিষ্যৎ। মা–বাবার সঙ্গে সামান্য দ্বিমত হলেই কেন তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেবে? এত বড় সিদ্ধান্ত তারা হুট করে নেয় না। বহু সময় ধরে হতাশা, বিদ্বেষ, মানসিক নানা চাপে থাকার পরই তারা সমাধানের খোঁজে এমন সিদ্ধান্ত নেয়।

কাজেই আমাদের সন্তানদের প্রতি যত্নশীল হতে হবে। সন্তানদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে। তাদের চাহিদা, তাদের ইচ্ছে, শখ, কষ্ট, মেধা সবকিছু জানার চেষ্টা করতে হবে। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে হবে, যেন সবকিছু খোলা মনে শেয়ার করতে পারে। মন্দ কিছু করলে সেটা বিরূপ ভাবে নয়, গালি বা চিৎকার করে নয়, বরং সহনশীলতার সঙ্গে সন্তানদের বোঝাতে হবে। ভালো–মন্দ, ন্যায়–অন্যায়, নৈতিকতার সঠিক শিক্ষায় একটা অবকাঠামো সেই শিশু বয়স থেকে গড়ে তুলতে হবে, যেন আগামীর পথে তারা নিজেরাই সঠিক পথ বেছে নিতে সক্ষম হয়।

সন্তানদের ওপর নিজ সংস্কৃতি চাপিয়ে দিলে হবে না। মনে রাখতে হবে, তারা সম্পূর্ণ একটা ভিন্ন সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠছে। এখন এটাই তাদের সংস্কৃতি, যেমনটা আপনার আমার শিশুকাল থেকে হৃদয়ে ধারণ করা। কেউ কারও সংস্কৃতি বদলাতে পারে না, বদলানো ঠিক নয়।

সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে হবে, কথা রাখতে হবে। মুখে নয়, আচরণে তাদের জানাতে হবে, আমরাই তাদের সর্বোত্তম ভালোবাসা ও নিরাপদ মানুষ।

আরও একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আজকের কিশোর-তরুণেরা বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার। কাজেই কখনোই তাদের ‘কাইল্লাদের সঙ্গে মিশবিনা’ কথাটা বলা যাবে না। এতে তারা মারাত্মক আহত হয় এবং বাবা–মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নিয়ে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক কথাই তাদের সঙ্গে বলা যাবে না। মূলকথা, আপনাকে সন্তানের উত্তম ভবিষ্যতের জন্য রোল মডেল হতে হবে। মনে রাখবেন, নিজে মারিজুয়ানা টেনে কখনোই সন্তানকে ‘নো স্মোকিং’ জোনে ফেলতে পারবেন না।

আপনার সন্তানের মধ্যে কিছু লক্ষণ যেমন—পর্যাপ্ত না ঘুমানো, ক্ষুধামন্দা, ওজন হ্রাস, নিজের ক্ষতি সম্পর্কিত কোনো কথা বলা, আত্মবিশ্বাস, আত্মমর্যাদাবোধ হারানো, বন্ধু–বান্ধবের প্রতি আগ্রহ হ্রাস, খিটখিটে মেজাজ, উদ্বিগ্ন বা ক্লান্তি ভাব, সিদ্ধান্তহীনতা, উদাসীন আচরণ, স্কুল বা কাজে মনোনিবেশ না করা, অসহায় বোধ করা, নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা, অপরাধবোধ, নিজেকে মূল্যহীন ভাবা, সামাজিক ঘনিষ্ঠতা এড়ানো...ইত্যাদি দেখলে অবশ্যই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। প্রয়োজনে সন্তানকে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করবেন কিংবা মেন্টাল হেলথ সার্ভিসের ব্যবস্থা নিতে চিকিৎসককে অনুরোধ জানাবেন। ন্যাশনাল সুইসাইড প্রিভেনশন লাইফলাইনে যোগাযোগ করতে পারেন।

আপনার সন্তান, আপনার সম্পদ। আপনাকেই যত্নের সঙ্গে সে সম্পদের দায়িত্ব নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0